০১:৪৪ পি.এম
ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান শুক্রবার মন্তব্য করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ শেষ করার এখনই সঠিক সময় এসেছে। কারণ, বর্তমানে তেহরান সামরিক ও কৌশলগত দিক থেকে ওয়াশিংটনের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। দীর্ঘকাল ধরে দুই শত্রুর মধ্যে আলোচনা থমকে রয়েছে এবং গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কর্তৃক শুরু হওয়া যুদ্ধটি এখন অচল অবস্থায় পরিণত হয়েছে। তেহরান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীকে আংশিকভাবে অবরুদ্ধ রেখেছে, অন্যদিকে ওয়াশিংটন ইরানের বিরুদ্ধে নৌ-অবরোধ বজায় রেখেছে। দেশটির চিকিৎসকদের এক অনুষ্ঠানে পেজেশকিয়ান বলেছিলেন, ‘আমরা যেহেতু এখন শক্তি ও মর্যাদার অবস্থানে আছি, তাই, যুদ্ধ শেষ করার উপযুক্ত সময় এখনই।’ তিনি আরো বলেছেন, ‘সারাবিশ্ব আমাদের জয় স্বীকার করছে এবং তারা জোর দিয়ে বলছে যে, আমেরিকা আইন লঙ্ঘন করে আমাদের স্কুল, হাসপাতাল ও অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে এবং তারা বর্তমানে বৈশ্বিকভাবে ঘৃণিত।’ জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধ শেষের লক্ষ্যে যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল, পেজেশকিয়ান সেখানেও যুক্তি দিয়েছেন যে, এটি তেহরানের জন্য কোনো পরাজয়ের বার্তা নয়। তিনি উল্লেখ করেন, ‘তারা এই চুক্তিতে একটি অনুচ্ছেদও খুঁজে পাবে না যা আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেয়। চুক্তির সকল প্রতিশ্রুতি অপর পক্ষের (যুক্তরাষ্ট্র) ওপর রয়েছে।’ ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি ‘কিছু ভিন্ন মত’ থাকা সত্ত্বেও যুদ্ধ শেষ করতে এই চুক্তির অনুমোদন দেওয়ার কথা জানানোর কিছুদিন পর প্রেসিডেন্টের এই মন্তব্য এসেছে। ইরানের পার্লামেন্টের কট্টরপন্থী আইনপ্রণেতারা সরকারকে এই চুক্তির জন্য কঠোর সমালোচনা করেছেন এবং বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত করার বিষয়টিতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নতিস্বীকারের অভিযোগ তুলেছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন নৌবাহিনী প্রণালীর দক্ষিণ দিক দিয়ে গোপনে ট্যাঙ্কার ট্রানজিট পরিচালনা এবং সুরক্ষা দিয়ে যাচ্ছে, যার ফলে সেখান দিয়ে দৈনিক ৫ থেকে ১০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল রপ্তানি করা সম্ভব হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে বড় ধরনের নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দেওয়ার পরেই তেহরানের পক্ষ থেকে শক্তিশালী অবস্থানে থাকার এই দাবি করা হয়েছে। মার্কিন পরিকল্পনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ‘অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদের’ জন্য অভিযুক্ত এবং যোগ করেছে যে, ‘এই নিষেধাজ্ঞার উস্কানিদাতারা বিচার ও শাস্তির যোগ্য।’ মার্কিন অর্থমন্ত্রী (ট্রেজারি সেক্রেটারি) স্কট বেসেন্ট বৃহস্পতিবার অঙ্গীকার করেছেন যে, নতুন নিষেধাজ্ঞা প্রচারণার মাধ্যমে ওয়াশিংটন ইরানি শাসনব্যবস্থাকে ‘ধ্বংস’ করবে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই অপ্রিয় যুদ্ধটি ছয় মাসের কাছাকাছি পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসন যে তেহরানের ওপর সামরিক চাপের চেয়ে বেশি অর্থনৈতিক চাপে জোর দিচ্ছে, এই মন্তব্যের মাধ্যমে তা স্পষ্ট হয়েছে। নজিরবিহীন সর্বাত্মক অর্থনৈতিক অবরোধ ও যুদ্ধের হুমকি অথবা ‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’: ইরানের অর্থনীতিকে একঘরে করার প্রচেষ্টায় অন্যান্য দেশের সহযোগিতার আহ্বান জানানো হয়েছে, চীনও ট্রাম্প প্রশাসনের অর্থনৈতিক পরিকল্পনার সমালোচনা করেছে। শুক্রবার চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘নিষেধাজ্ঞা ও চাপ সৃষ্টি করে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।’ তিনি আরো বলেন, ‘চীন সব পক্ষকে দায়িত্বশীল পদক্ষেপ গ্রহণ করতে এবং রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উপায়ে সমস্যার সমাধানের আহ্বান জানাচ্ছে।’ আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের হোয়াইট হাউস সফরের কথা রয়েছে, যেখানে ট্রাম্পের গত মে মাসের বেইজিং সফরের মতো এবারও ইরান ইস্যুটি গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসবে। বেসেন্ট জানান, ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বাড়ানোর অর্থ হলো ওয়াশিংটনকে নতুন করে বড় সামরিক অভিযানে নামতে হবে না। তবে তিনি আগামী সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে এই ব্যবস্থার বিস্তারিত তুলে ধরবেন বলে জানান। তবে অন্যান্য উচ্চপদস্থ ইরানি কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রের এই পরিকল্পনাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ এক পোস্টে লিখেছেন, তথাকথিত ‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’ মূলত আমেরিকান সংকটের—অনিয়ন্ত্রিত ঋণ এবং ক্রমবর্ধমান সুদের খরচের—থেকে দৃষ্টি সরানোর একটি কৌশল মাত্র। বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্র লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যে দাবি করেছে, এটি ‘ইরানের ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) অধীনে ইরানি শাসনব্যবস্থার স্বার্থের জন্য’ কার্যকর। তেহরান সমর্থিত ও অর্থায়িত হিজবুল্লাহ শুক্রবার এক বিবৃতিতে জানায়, ‘এই অন্যায় নিষেধাজ্ঞা এবং একঘরে করে রাখার মাধ্যমে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আমাদের প্রতিরোধের পথ থেকে সরানো সম্ভব নয়।’ যুক্তরাষ্ট্র যখন সরাসরি ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে সীমান্ত সংঘাত বন্ধে মধ্যস্থতা করছে, তখন এই নতুন নিষেধাজ্ঞার পদক্ষেপ নেওয়া হলো। মূল যুদ্ধ শুরুর পর হিজবুল্লাহ ইরানের সমর্থনে ইসরায়েলে রকেট হামলা চালানোর পর এই সংঘাত নতুন করে ছড়িয়ে পড়ে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন