০১:৫৬ পি.এম
ঢাকা, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬ : বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে চলমান টানাপোড়েনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে কৌশলগত অংশীদার হিসেবে আরও শক্তিশালী করতে আগ্রহী। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও চলতি বছরে দ্বিতীয়বারের মতো ভারত সফরের পরিকল্পনা করছেন। এই সফরে দুই দেশের দীর্ঘপ্রতীক্ষিত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
নয়াদিল্লি থেকে এএফপি জানায়, রুবিও ভারতের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। তবে তার এই সফরে নয়াদিল্লি বাদ পড়ছে। পরিবর্তে, তিনি ভারতের বাণিজ্যিক কেন্দ্র মুম্বাই এবং জ্বালানি খাতের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র জামনগর সফর করবেন। জামনগরে রয়েছে ধনকুবের মুকেশ আম্বানির মালিকানাধীন বিশ্বের বৃহত্তম তেল পরিশোধন কমপ্লেক্স।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সফরের আলোচনার মূল বিষয় হয়ে উঠবে দুই দেশের দীর্ঘপ্রতীক্ষিত বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত করতে না পারার বিষয়টি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ব্যাপক শুল্ক আরোপ, জ্বালানি আমদানি নিয়ে মতবিরোধ এবং ভারতের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের উষ্ণতর সম্পর্কসহ বেশ কয়েকটি কারণে আলোচকদের জন্য চুক্তিতে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
আরও পড়ুন: ইসরাইলের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ৭৭.৭ শতাংশ, ১৯৯৯ সালের পর সর্বোচ্চ
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, রুবিও শনিবার ছয় দিনের বিদেশ সফর শুরু করবেন। প্রথমে তিনি উজবেকিস্তান যাবেন, এরপর ভারত সফর করবেন।
দুই দেশের বাণিজ্য চুক্তির পথে প্রধান বাধা এবং সামনে কী সম্ভাবনা রয়েছে, তা নিয়ে এএফপির প্রতিবেদনে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে।
শুল্ক নিয়ে আইনি অনিশ্চয়তা
ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত একটি অন্তর্বর্তী বাণিজ্য চুক্তির কাঠামোতে সম্মত হয়েছিল। এর আওতায় ওয়াশিংটন ভারতের ওপর পাল্টা শুল্কের হার ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৮ শতাংশ করার এবং ভারত বিভিন্ন শিল্পপণ্য ও কৃষিপণ্যের ওপর শুল্ক কমানোর কথা ছিল।
আরও পড়ুন: কোনো দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে পেলে কতদিন ক্ষমতায় থাকবেন নেতানিয়াহু?
তবে কয়েক মাস ধরে আলোচনা চললেও চুক্তিটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি এবং স্বাক্ষরিতও হয়নি। এর একটি কারণ হলো, ট্রাম্পের শুল্ক পরিকল্পনা নিয়ে আইনি অনিশ্চয়তা। আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পাল্টা শুল্কের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ায় প্রস্তাবিত চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
বাণিজ্যবিষয়ক বিশেষজ্ঞ অজয় শ্রীবাস্তব এক নোটে বলেন, ‘ফেব্রুয়ারির কাঠামোতে ভারতের জন্য পাল্টা শুল্ক কমানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, যার বিনিময়ে ভারতকে উল্লেখযোগ্য ছাড় দিতে হতো। কিন্তু ওই শুল্কব্যবস্থা আদালতে বাতিল হয়ে যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবের মূল্য কতটা, তা অস্পষ্ট হয়ে পড়ে।’
এ ছাড়া ওয়াশিংটনের নতুন কিছু বাণিজ্যিক পদক্ষেপ নিয়েও ভারতের উদ্বেগ রয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি দেশে কথিত অন্যায্য বাণিজ্যচর্চা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের তদন্ত এবং রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনা দেশগুলোর ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের সুযোগ রেখে প্রণীত একটি নতুন আইন রয়েছে।
তবে শুক্রবার ট্রাম্প এক নির্বাহী আদেশে ওই হুমকির মুখে থাকা নিষেধাজ্ঞাগুলো কার্যকর না করার নির্দেশ দেন।
আরও পড়ুন: ‘নেতানিয়াহু সরকারের প্রতি আস্থার অভাব’, বুথফেরত জরিপে মন্তব্য আইজেনকোটের
আলোচনায় অগ্রগতি থমকে গেছে
চলতি বছরের বেশির ভাগ সময় দুই দেশের সরকারই অন্তর্বর্তী বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত করার সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী বক্তব্য দিয়েছে। জুনে ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর বলেছিলেন, আলোচকেরা চুক্তির ‘শেষ এক শতাংশ’ নিয়ে কাজ করছেন।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে সতর্কতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ভারতের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন গত সপ্তাহে বলেন, আলোচনা ‘একটি পর্যায়ে এসে থেমে গেছে’ এবং আরও ছাড় দেওয়ার সুযোগ খুবই সীমিত।
এর কয়েক দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ারও বলেছিলেন, চুক্তি নিয়ে ঘোষণা ‘অবিলম্বে’ আসছে না।
আরও পড়ুন: বোম্বে হাইকোর্ট ইমরান খানের ভারত ছাড়ার নোটিশ স্থগিত করেছে
কৃষি ও জ্বালানি নিয়ে মতপার্থক্য
ভারতের জন্য কৃষি এখনো অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি বিষয়। বিদেশি পণ্যের সঙ্গে বাড়তি প্রতিযোগিতার মুখে দেশের কৃষকদের ফেলতে চায় না নয়াদিল্লি। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র চায় ভারত আরও বেশি মার্কিন জ্বালানি কিনুক।
এ ছাড়া ভিয়েতনামের মতো আঞ্চলিক উৎপাদন প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় ভারতের শুল্কহার প্রতিযোগিতামূলক রাখার ওপর জোর দিচ্ছে নয়াদিল্লি।
ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল চলতি সপ্তাহে বলেন, চুক্তির প্রথম পর্যায় চূড়ান্ত করার কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। তবে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থান নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত চুক্তিটি কার্যকর করা হবে না।
আরও পড়ুন: সুদানে স্বর্ণের খোঁজে শ্রমিকেরা জীবন ঝুঁকিতে, খনিতে প্রাণ হারাচ্ছেন
তিনি বলেন, ‘চুক্তিটি এখন চূড়ান্ত কাঠামো নির্ধারণ ও আইনি খসড়া তৈরির পর্যায়ে রয়েছে। আমরা আশা করছি, শিগগিরই এটি চূড়ান্ত করতে পারব। তবে সমপর্যায়ের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর তুলনায় প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা নিশ্চিত হওয়ার পরই এটি কার্যকর করা হবে।’
রপ্তানি বাড়লেও শুল্ক নিয়ে উদ্বেগ
যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের পণ্য রপ্তানি গত বছরের একই মাসের তুলনায় আগস্টে ২১ শতাংশ বেড়ে ৮৩০ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। গত বছরের আগস্টে ভারতকে ৫০ শতাংশ শুল্কের মুখে পড়তে হয়েছিল।
রপ্তানি বৃদ্ধিকে ভারতের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখা হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জ্বালানির উচ্চমূল্যে দেশটির অর্থনীতি যখন চাপের মুখে, তখন রপ্তানির এ প্রবৃদ্ধি কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে।
আরও পড়ুন: জার্মান ভাইস মিনিস্টার ড. বারবেল কোফলারের আবুল খায়ের স্টীল মেল্টিং লিমিটেড পরিদর্শন
তবে উচ্চ শুল্ক আবার কার্যকর হলে ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে অর্থনীতিবিদেরা সতর্ক করেছেন। এতে বাজারের আস্থা কমতে পারে এবং আগে থেকেই দুর্বল রুপির ওপর আরও চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন