০৩:৫৯ পি.এম
তিস্তা নদীর তীব্র স্রোতের কারণে রংপুরের গঙ্গাচড়া ও লালমনিরহাট সদর উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকার নতুন তীর সংরক্ষণ কাজের প্রায় ১৩০ মিটার অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এর ফলে পানি বন্দি হয়ে পড়েছে প্রায় দুই হাজার পরিবার এবং বিস্তীর্ণ এলাকার আমন ধানের বীজতলা তলিয়ে গিয়েছে।
ভেঙে গেছে কিছু বসতবাড়ি, নতুন করে ঘরবাড়ি এবং ফসলি জমি হারানোর আতঙ্ক নিয়ে দিন কাটাচ্ছে তিস্তাপাড়ের মানুষ।
স্থানীয় সূত্রগুলোর থেকে জানা গেছে, গত কয়েক বছর ধরে তিস্তার ভয়াবহ ভাঙনে রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার মর্ণেয়া ইউনিয়নের নরশিং ও তালপট্টি এবং লালমনিরহাট সদর উপজেলার খুনিয়াগাছ ইউনিয়নের উত্তর হাজীপাড়া, পশ্চিম হাজীপাড়া, পূর্ব হাজীপাড়া ও হরিণচড়া এলাকার হাজার হাজার মানুষ তাঁদের বসতভিটা, ফসলি জমি এবং জীবিকার শেষ সম্বল হারিয়ে ফেলেছেন। দীর্ঘদিনের দাবির পর চলতি বছর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলুর উদ্যোগে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকায় তীর সংরক্ষণ কাজ বাস্তবায়ন করেছিল। নতুন বাঁধ নির্মাণ হওয়াতে নদীপাড়ের মানুষের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরলে, সেই স্বস্তি স্থায়ী হয়নি।
আরও পড়ুন: টেকনাফে বিজিবির পৃথক অভিযানে সাড়ে ৪ লাখ ইয়াবা উদ্ধার
সোমবার (১৩ জুলাই) রাতে যখন ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি বিপৎসীমার ১০ সেন্টিমিটার উপরে প্রবাহিত হচ্ছিল, তখন নদীর তীব্র স্রোতে নতুন নির্মিত তীর সংরক্ষণ কাজের প্রায় ১৩০ মিটার অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। একযোগে, কয়েকটি বসতবাড়ি ভেঙে পড়ে, এবং এক হাজারের বেশি বাড়িতে বন্যার পানি প্রবাহিত হয়ে পড়ে, সেই সঙ্গে বিস্তীর্ণ এলাকার আমন ধানের বীজতলা তলিয়ে যায়।
বুধবার (১৫ জুলাই) সরেজমিনে দেখা যায়, লালমনিরহাটের আদর্শপাড়া থেকে গঙ্গাচড়ার তালপট্টি হয়ে নরশিং পর্যন্ত নির্মিত তীর সংরক্ষণ বাঁধের বিভিন্ন অংশে বড় বড় ফাটল এবং ধস দেখা দিয়েছে। প্রতিদিন নতুন নতুন স্থানে ভাঙনের সৃষ্টি হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক এবং উদ্বেগ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
স্থানীয়রা জানান, গত কয়েক দিন ধরে তিস্তার পানি দ্রুত ওঠানামা করছে। আকস্মিক বন্যা, তীব্র স্রোত এবং হঠাৎ পানি নেমে যাওয়ার কারণে নদীর তীরজুড়ে ভয়াবহ ভাঙন শুরু হয়েছে। এই ঘটনায় প্রায় দুই হাজার পরিবারের বসতভিটা, বিস্তীর্ণ ফসলি জমি, দুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক হুমকির সম্মুখীন হয়েছে।
তালপট্টি গ্রামের বাসিন্দা আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘অনেক আশা নিয়ে বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছিল। ভেবেছিলাম এবার আর ভাঙন হবে না। কিন্তু কয়েক মাসও টিকল না। চোখের সামনে নতুন বাঁধ নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এখন আবার আগের মতো ঘরবাড়ি হারানোর ভয় ফিরে এসেছে।’
আরও পড়ুন: ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার’-আলফাডাঙ্গা সদর ইউনিয়নে পূজামণ্ডপ পরিদর্শন ও আর্থিক সহায়তা প্রদান কামরুল ইসলাম দাউদের
নরশিং এলাকার কৃষক খয়বর আলী বলেন, ‘আগে বাঁধ ছিল না, তখনও ভয় ছিল। এখন বাঁধ থাকার পরেও ভয় হচ্ছে। সরকারের এত টাকার বাঁধ যদি স্বল্প মেয়াদের বন্যাতেই ভেঙে যায়, তাহলে আমাদের কী লাভ হলো? শুধুমাত্র জিও ব্যাগ ফেললে হবে না, আমাদের স্থায়ী এবং টেকসই ব্যবস্থা নিতে হবে।’
হরিণচড়া গ্রামের সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘কয়েক দিনের ভাঙনে এখন দেখি বাঁধও বিলীন হতে চলেছে। রাতে ঘুমাতে পারি না। মনে হয় কখন ঘরটাও নদীতে চলে যাবে। শুরুতেই দ্রুত ব্যবস্থা নিলে হয়তো এত ক্ষতি হতো না। এখন জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ এবং কংক্রিট ব্লক না ফেললে পুরো বাঁধ নদীতে চলে যাবে।’
রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম জানিয়েছেন, ‘নদীতে পানির ওঠানামার কারণে ভাঙন দেখা দিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত স্থানে জরুরি ভিত্তিতে ছয় হাজার জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন প্রতিরোধের কাজ চলছে। পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। প্রয়োজন হলে আরো জিও ব্যাগ এবং অন্যান্য প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
পানি উন্নয়ন বোর্ডের সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সন্ধ্যা ৬টায় তিস্তা ব্যারাজের ডালিয়া পয়েন্টে পানিপ্রবাহ রেকর্ড করা হয় ৫২ দশমিক ০৫ মিটার, যা বিপৎসীমার ১০ সেন্টিমিটার নিচে। একই সময়ে কাউনিয়ার তিস্তা সেতু পয়েন্টে পানিপ্রবাহ ছিল বিপৎসীমার ১ সেন্টিমিটার নিচে। তবে পানি কিছুটা কমলেও তীব্র স্রোত এবং অব্যাহত ভাঙনের কারণে নদীপাড়ের মানুষের উদ্বেগ তথা উৎকণ্ঠা কাটেনি। স্থানীয়দের দাবি হলো, শুধুমাত্র জিও ব্যাগের সাময়িক ব্যবস্থা নয়, তিস্তার তীর রক্ষায় দ্রুত স্থায়ী ও টেকসই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা উচিত, যাতে প্রতি বর্ষায় ঘরবাড়ি হারানোর শঙ্কায় তাদের জীবন কাটাতে না হয়।
আরও পড়ুন: টেকনাফে সুপারি বাগান থেকে অস্ত্রের মুখে অপহরণ, এলাকায় আতঙ্ক
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন