১২:১৮ এম
বাংলাদেশ আজ শুধু একটি জনবহুল রাষ্ট্র নয়; এটি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূ-কৌশলগত রাষ্ট্র। বঙ্গোপসাগর, আঞ্চলিক বাণিজ্যপথ, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ এবং পরিবর্তিত বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির কারণে বাংলাদেশকে ঘিরে বিদেশি ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন স্বার্থগোষ্ঠীর আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। এই বাস্তবতায় জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিদেশি নাগরিকদের উপস্থিতি, অবস্থান ও কার্যক্রম সম্পর্কে রাষ্ট্রের একটি হালনাগাদ, নির্ভুল এবং সমন্বিত তথ্যভাণ্ডার থাকা বিলাসিতা নয়—এটি রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক প্রয়োজন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন সময়ে বিদেশি নাগরিকদের জড়িয়ে অপরাধ, সাইবার জালিয়াতি, আর্থিক প্রতারণা, অবৈধ ব্যবসা কিংবা ভিসার শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগ সামনে এসেছে। প্রতিটি অভিযোগ অবশ্যই আইন অনুযায়ী নিরপেক্ষভাবে তদন্ত হওয়া উচিত; কোনো ব্যক্তি বা জাতীয়তাকে শুধু পরিচয়ের ভিত্তিতে অপরাধী হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও সত্য যে, রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো—বাংলাদেশে অবস্থানরত প্রত্যেক বিদেশি নাগরিক বৈধভাবে অবস্থান করছেন কি না, কোথায় বসবাস করছেন, কী ধরনের কাজে নিয়োজিত, তাদের ভিসা ও কর্ম-অনুমতির অবস্থা কী—এসব তথ্য সবসময় হালনাগাদ রাখা।
বিশেষ উদ্বেগের আরেকটি দিক হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মোবাইল ফোন বা ইন্টারনেটভিত্তিক পরিচয়ের মাধ্যমে আন্তঃদেশীয় সম্পর্ক গড়ে তুলে বিবাহ বা পারিবারিক সম্পর্কের আড়ালে বাংলাদেশে প্রবেশের ঘটনা। অধিকাংশ ক্ষেত্রই বৈধ ও স্বাভাবিক হতে পারে, তবে যদি কেউ এই প্রক্রিয়াকে পরিচয় গোপন, প্রতারণা, মানবপাচার, অর্থপাচার কিংবা রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের আড়াল হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করে, তবে সেটি জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকির কারণ হতে পারে। তাই এ ধরনের ক্ষেত্রে আইনসম্মত যাচাই-বাছাই, প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা পরীক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময় আরও কার্যকর করা জরুরি।
একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র কখনোই তার ভূখণ্ডে কে প্রবেশ করছে, কে কাজ করছে, কে ব্যবসা করছে এবং কে কোন পরিচয়ে অবস্থান করছে—এসব বিষয়ে অন্ধ থাকতে পারে না। কারণ নিরাপত্তা ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা সৃষ্টি হয় তখনই, যখন রাষ্ট্রের কাছে তথ্য থাকে না অথবা তথ্য থাকলেও তা সমন্বিত ও হালনাগাদ থাকে না।
একইভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন ও সমাজসেবা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর উচিত পরিচয়বিহীন, দীর্ঘদিন ধরে ভবঘুরে বা মানসিক ভারসাম্যহীন পরিচয়ে বসবাসকারী ব্যক্তিদের মানবিক মর্যাদা অক্ষুণ্ন রেখে পরিচয় যাচাই করা। কারণ তাদের মধ্যে কেউ যদি প্রকৃত বাংলাদেশি না হন, অথবা ভিন্ন পরিচয়ে অবৈধভাবে অবস্থান করে থাকেন, তবে আইন অনুযায়ী তাদের পরিচয় নিশ্চিত করে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এই প্রক্রিয়া অবশ্যই মানবাধিকার, চিকিৎসা সহায়তা এবং প্রচলিত আইন অনুসরণ করেই সম্পন্ন হওয়া উচিত।
বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি নাগরিকদের ক্ষেত্রে বৈধ কর্ম-অনুমতি, কর পরিশোধ, ভিসার শর্ত মেনে চলা এবং সংশ্লিষ্ট আইন অনুসরণ নিশ্চিত করা জরুরি। কেউ যদি আইন ভঙ্গ করে, তবে তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত; আবার যারা আইন মেনে বাংলাদেশে কাজ করছেন, তাদের অধিকারও সমানভাবে সুরক্ষিত থাকতে হবে। আইনের শাসনই এখানে একমাত্র মানদণ্ড হওয়া উচিত।
এখন সময় এসেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, অভিবাসন কর্তৃপক্ষ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট দেশের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে তৎপরতার পাশাপাশি সমন্বিত একটি ডিজিটাল বিদেশি নাগরিক ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তোলার। দেশে প্রবেশের মুহূর্ত থেকে প্রস্থান পর্যন্ত একজন বিদেশি নাগরিকের বৈধ অবস্থান, কর্মস্থল, ঠিকানা এবং অনুমোদিত কার্যক্রম একটি সমন্বিত ডাটাবেজে সংরক্ষিত ও নিয়মিত হালনাগাদ থাকা প্রয়োজন। প্রয়োজন হলে এ বিষয়ে বিশেষায়িত নজরদারি ও সমন্বয় সেল গঠন করে দক্ষ জনবল নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে।
বাংলাদেশের উন্নয়ন, বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জন্য বৈধ বিদেশি অংশগ্রহণ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে উন্নয়নের দরজা খোলা রাখা এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা—দুই লক্ষ্য পরস্পরবিরোধী নয়। বরং একটি শক্তিশালী, তথ্যনির্ভর ও আইনসম্মত তদারকি ব্যবস্থা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছেও আস্থা তৈরি করে যে বাংলাদেশ একটি সুশাসিত ও দায়িত্বশীল রাষ্ট্র।
জাতীয় নিরাপত্তা কখনো কোনো ঘটনার পর প্রতিক্রিয়া দেখানোর বিষয় নয়; এটি আগাম প্রস্তুতি, তথ্যভিত্তিক নজরদারি এবং আইনের কার্যকর প্রয়োগের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। বাংলাদেশের মতো কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রের জন্য বিদেশি নাগরিকদের একটি আধুনিক, সমন্বিত ও সর্বদা হালনাগাদ ডাটাবেজ গড়ে তোলা এখন আর বিকল্প নয়—এটি সময়ের অপরিহার্য দাবি। কারণ একটি রাষ্ট্র তার সীমান্ত যতটা শক্তভাবে রক্ষা করে, তার চেয়েও বেশি শক্তভাবে রক্ষা করতে হয় তথ্য, আইন এবং প্রশাসনিক সক্ষমতাকে। রাষ্ট্র যদি এই জায়গায় এক ধাপ এগিয়ে থাকতে পারে, তবে বহিরাগত যেকোনো অবৈধ প্রভাব, সংগঠিত অপরাধ বা নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতাও বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে তা না হলে ভৌগোলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এ রাষ্ট্রকে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার মাধ্যমে রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়তে পারে এমন আশঙ্কা করা অমূলক নয়।
লেখকঃ সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন