০৯:৩৭ পি.এম
মির্জাপুরে দেশীয় শিল্প ও পণ্য মেলার উদ্বোধন, নাগরপুরে তাঁতবস্ত্র মেলার প্রস্তুতি; প্রজ্ঞাপন ও হাইকোর্টের নির্দেশনার কপি পাঠানোর পরও কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ার অভিযোগ, হাইকোর্টে যাওয়ার প্রস্তুতি নাগরিক আইনগত সহায়তা কল্যাণ সোসাইটির।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠে মেলা আয়োজন না করার বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সরকারি প্রজ্ঞাপন রয়েছে। বরিশালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠে মেলা আয়োজন-সংক্রান্ত হাইকোর্টের অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশনার বিষয়টিও টাঙ্গাইলের সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের নজরে আনা হয়েছিল বলে দাবি করেছে নাগরিক আইনগত সহায়তা কল্যাণ সোসাইটি। এরপরও টাঙ্গাইলের মির্জাপুর ও নাগরপুরে দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠে মেলা আয়োজন ও প্রস্তুতি চলায় প্রশাসনের ভূমিকা, অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং সরকারি বিধিবিধান বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সংগঠনটির অভিযোগ, সরকারি প্রজ্ঞাপন ও আদালতের নির্দেশনার কপি পাঠিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবগত করার পরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এ ঘটনায় মেলা আয়োজনের অনুমোদন, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের ভূমিকা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার এসকে পাইলট সরকারি উচ্চবিদ্যালয় মাঠে ‘মির্জাপুর দেশীয় শিল্প ও পণ্য মেলা-২০২৬’ গত ৯ অক্টোবর উদ্বোধন করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
নাগরিক আইনগত সহায়তা কল্যাণ সোসাইটির দাবি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠে মেলা আয়োজনের বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন এবং বরিশালের মেলা-সংক্রান্ত হাইকোর্টের নির্দেশনার কপি টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসককে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে পাঠানো হয়েছিল।
সংগঠনটির প্রশ্ন, সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পাঠানোর পরও মির্জাপুরে মেলার আয়োজন কীভাবে এগিয়েছে? মেলার অনুমোদন কে দিয়েছেন, কোন বিধানের ভিত্তিতে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে এবং বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আসার পর কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল—এসব প্রশ্নের জবাব চাওয়া হচ্ছে।
আরও পড়ুন: ভৈরবে চাঁদা না পেয়ে কারখানা মালিকদের পিটিয়ে জখম, ১৬ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের অভিযোগ
সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাদের কাছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন এবং বরিশালের মেলা-সংক্রান্ত হাইকোর্টের নির্দেশনার কপি রয়েছে। জেলা প্রশাসককে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে নথি পাঠানোর কথাও তারা জানিয়েছে।
এ ছাড়া মেলার অনুমোদনপত্র, মাঠ ব্যবহারের অনুমতি এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক নথি যাচাই করা প্রয়োজন। এসব নথি থেকে অনুমোদনদাতা কর্তৃপক্ষ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
টাঙ্গাইলের নাগরপুর সরকারি কলেজ মাঠে ‘তাঁত বস্ত্র পণ্য প্রদর্শনী মেলা-২০২৬’ আয়োজনের লক্ষ্যে অবকাঠামোগত কাজ চলছে বলে জানা গেছে।
স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতা কলেজ মাঠে মাসব্যাপী মেলার আয়োজনের উদ্যোগ নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ক্ষেত্রে মাঠ ব্যবহারের অনুমোদন, সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুসরণ এবং প্রশাসনের তদারকি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
নাগরপুর সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুল মজিদ তালাশ তালাশ বিডিকে জানান, স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতা কলেজ মাঠে মাসব্যাপী মেলার আয়োজনের উদ্যোগ নিয়েছেন বলে তাঁকে জানানো হয়েছে। একজন সংসদ সদস্য মেলাটি উদ্বোধন করবেন বলেও তাঁকে বলা হয়েছে।
অধ্যক্ষের দাবি, তিনি কলেজ মাঠে মেলা আয়োজনের কোনো অনুমোদন দেননি। পরিস্থিতিতে নিজেকে অসহায় বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
আরও পড়ুন: রাজশাহীতে শিশু ধর্ষণ মামলায় ১ আসামির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড
মেলার জন্য কলেজ মাঠ ব্যবহারের লিখিত অনুমতি রয়েছে কি না, অনুমতি দিয়ে থাকলে কে দিয়েছেন, স্থানীয় বিএনপি নেতাদের ভূমিকা কী এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসন কী পদক্ষেপ নিয়েছে—এসব বিষয় নথিপত্রের ভিত্তিতে যাচাই করা প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্ট বিএনপি নেতা, মেলা আয়োজক এবং প্রশাসনের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ২৯ জুন ২০২২ তারিখে জারি করা ‘মেলা পরিপত্র, ২০২২’-এর ৫(চ) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠে মেলা আয়োজন করা যাবে না।
প্রজ্ঞাপনের এই বিধান সামনে রেখে প্রশ্ন উঠেছে, মির্জাপুর ও নাগরপুরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠে মেলা আয়োজনের অনুমতি কীভাবে দেওয়া হয়েছে? সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অনুমোদন দেওয়ার সময় সরকারি নির্দেশনা বিবেচনায় নিয়েছিল কি না, তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
কোনো জনপ্রতিনিধির সুপারিশ বা ডিও লেটার থাকলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী কর্তৃপক্ষকে প্রযোজ্য আইন ও সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে। তাই মেলা দুটির অনুমোদনপত্র, মাঠ ব্যবহারের শর্ত এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত প্রকাশ ও যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।
বরিশাল কালেক্টরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে মেলা আয়োজনের বিষয়ে দায়ের করা রিট পিটিশন নম্বর ৬২৫৯/২০২৬-এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৮ মে ২০২৬ হাইকোর্ট বিভাগের অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশনা জারি হয়।
নাগরিক আইনগত সহায়তা কল্যাণ সোসাইটির দাবি, ওই নির্দেশনার কপি এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনের কপি টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসককে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে পাঠানো হয়েছিল। সংগঠনটির ভাষ্য অনুযায়ী, এ বিষয়ে একাধিকবার যোগাযোগ ও চিঠি পাঠানো হলেও মেলা আয়োজনের ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ‘মেলা পরিপত্র, ২০২২’-এর কপি।
বরিশালের মামলার হাইকোর্টের নির্দেশনার কপি।
টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসককে পাঠানো হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা ও নথি প্রেরণের প্রমাণ।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে পাঠানো চিঠি এবং প্রাপ্তিস্বীকার, যদি থাকে।
মির্জাপুর ও নাগরপুরের মেলা আয়োজনের অনুমোদনপত্র ও প্রশাসনিক নথি।
এসব নথি যাচাই করলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কখন, কীভাবে অবগত করা হয়েছিল এবং এরপর কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা আরও স্পষ্ট হবে। বরিশালের মামলার নির্দেশনার সুনির্দিষ্ট পরিধি এবং টাঙ্গাইলের মেলা দুটির সঙ্গে তার আইনি সম্পর্কও আদালতের নথির ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
অভিযোগকারীদের দাবি, টাঙ্গাইলের সাবেক জেলা প্রশাসক শরীফা হককে সরকারি প্রজ্ঞাপন মেনে চলার অনুরোধ জানিয়ে একাধিকবার ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে যোগাযোগ করা হয়েছিল। বরিশালের মেলা-সংক্রান্ত হাইকোর্টের নির্দেশনার বিষয়টিও তাঁকে জানানো হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
সংগঠনটির অভিযোগ, এসব যোগাযোগের পরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
আরও পড়ুন: নারায়ণগঞ্জে মেয়েসহ ছিনতাইয়ের কবলে সিনিয়র সাংবাদিক আরিফ আলম দিপু
সাবেক জেলা প্রশাসকের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট সময়ের প্রশাসনিক নথি যাচাই করে অভিযোগের বিষয়ে তাঁর ভূমিকা স্পষ্ট করা প্রয়োজন। বর্তমান দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বক্তব্যও নেওয়া হবে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হবে।
হাইকোর্টে যাওয়ার প্রস্তুতি নাগরিক আইনগত সহায়তা কল্যাণ সোসাইটির
নাগরিক আইনগত সহায়তা কল্যাণ সোসাইটির চেয়ারম্যান রনি সিকদার জানিয়েছেন, টাঙ্গাইলের মির্জাপুর ও নাগরপুরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠে মেলা আয়োজনের বিষয়টি জনস্বার্থে হাইকোর্টের নজরে আনার প্রস্তুতি নিচ্ছে সংগঠনটি।
তিনি জানান, সরকারি প্রজ্ঞাপন, বরিশালের মেলা-সংক্রান্ত হাইকোর্টের নির্দেশনা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে পাঠানো চিঠিপত্র আদালতের সামনে উপস্থাপন করা হবে। প্রয়োজনীয় আইনি প্রতিকার চাওয়ার পাশাপাশি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও দায়িত্ব পালনের বিষয়টি পর্যালোচনার আবেদন জানানো হবে।
রনি সিকদারের ভাষ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট সাবেক ও বর্তমান দায়িত্বপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক এবং সংশ্লিষ্ট সচিবকে আইনি প্রক্রিয়ায় বিবাদী করার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। কারা বিবাদী হবেন এবং কী প্রতিকার চাওয়া হবে, তা আইনজীবীর পরামর্শ ও মামলার নথি পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত করা হবে।
টাঙ্গাইলের মির্জাপুর ও নাগরপুরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠে মেলা আয়োজনের ঘটনায় কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর জরুরি:
১.সরকারি প্রজ্ঞাপন থাকা সত্ত্বেও মেলা আয়োজনের অনুমোদন কীভাবে দেওয়া হলো?
২. বরিশালের মেলা-সংক্রান্ত হাইকোর্টের নির্দেশনা ও সরকারি প্রজ্ঞাপনের কপি পাওয়ার পর জেলা প্রশাসন কী পদক্ষেপ নিয়েছিল?
৩. মেলা দুটির অনুমোদনদাতা কর্তৃপক্ষ কে এবং কোন নথির ভিত্তিতে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে?
৪. নাগরপুর সরকারি কলেজ মাঠে মেলা আয়োজনের ক্ষেত্রে কলেজ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছিল কি না?
৫. একই বিধান সব ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন কী ব্যবস্থা নিয়েছে?
নাগরিক আইনগত সহায়তা কল্যাণ সোসাইটির বক্তব্য, আইন ও সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে বিধিবিধান প্রয়োগে ভিন্নতা তৈরি হলে তা জনস্বার্থে প্রশ্নের মুখে পড়বে।
আরও পড়ুন: আগ্রাবাদে ৫ আগস্ট থানা থেকে চুরি হওয়া পিস্তল ও গুলি উদ্ধার
এ বিষয় টাঙ্গাইলের নাগরপুর সরকারি কলেজ মাঠে ‘তাঁত ও বস্ত্র পণ্য প্রদর্শনী মেলা-২০২৬’-এর আয়োজন নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। এ বিষয়ে মেলার আয়োজক ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ও অর্থদাতা সিলেটের পারভেজের কাছে 'তালাশ বিডি'-র পক্ষ থেকে মুঠোফোনে জানতে চাওয়া হয়—সরকারি নির্দেশনা ও বিধিনিষেধ থাকা সত্ত্বেও কেন তিনি বারবার স্কুল-কলেজের মাঠে মেলা আয়োজন করছেন?
প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, *"আমরা স্থানীয় বিএনপি নেতাদের টাকা দিয়েছি, তারা আমাদের অনুমতি বা জায়গা দিয়েছে। স্থানীয় সংসদ সদস্য (এমপি) মহোদয় এ মেলার উদ্বোধন করবেন। মেলা আয়োজনের ক্ষেত্রে কোনো সরকারি প্রজ্ঞাপন আছে কি নেই, তা আমাদের দেখার বিষয় নয়।"
মেলা আয়োজক, সংশ্লিষ্ট স্থানীয় বিএনপি নেতা, প্রশাসন ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য এবং অনুমোদন-সংক্রান্ত নথি যাচাইয়ের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য পাওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
আরও পড়ুন: দুদকের মামলায় মৃত ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ, পরিবার বলছে ‘মৃত্যু নিয়ে তামাশা’
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন