০৩:৩৬ পি.এম
ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী জানিয়েছেন, শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য একটি আইনগত প্রক্রিয়া বর্তমানে চলমান রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেছেন, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এ বিষয়ে ভারতের অবস্থান বারবার স্পষ্ট করেছেন। বিষয়টি আইনগত এবং সুসংগঠিত প্রক্রিয়ার আওতায় রয়েছে এবং আদালতও এর সঙ্গে যুক্ত। এজন্য শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা উল্লেখ করা সম্ভব নয়। একইভাবে, ওসমান হাদির হত্যাকারীদের ফিরিয়ে দেওয়ার প্রসঙ্গেও তিনি একই মন্তব্য করেছেন।
শনিবার ‘বে অফ বেঙ্গাল কনভার্সেশন ২০২৬’-এর গ্র্যান্ড বলরুমে অনুষ্ঠিত একটি সেশনে দীনেশ ত্রিবেদী এসব কথা বলেন।
ভারতের হাইকমিশনার আরও বলেন, এ বিষয়ে উত্তর দিতে হলে আমাদের ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকাতে হবে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইতোমধ্যে এ বিষয়ে ভারতের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। তারা বলেছেন, এ বিষয়ে একটি প্রক্রিয়া রয়েছে এবং সেই প্রক্রিয়াটি আইনগত ও সুসংগঠিত। বর্তমানে সেই প্রক্রিয়া চলছে এবং আদালতও এর সঙ্গে যুক্ত। তাই এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা বলা সম্ভব নয়।
আরও পড়ুন: যাত্রাবাড়ীতে ছিনতাই সন্দেহে গণপিটুনিতে আহত যুবক নিশাত মিয়ার মৃত্যু
শেখ হাসিনা ভারতে কীভাবে গিয়েছিলেন, সে প্রসঙ্গে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, শেখ হাসিনাকে ভারতীয় বিমানবাহিনী বা সেনাবাহিনী ভারতে নিয়ে যায়নি। বাংলাদেশে যে সময় মর্মান্তিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল, তার পরিপ্রেক্ষিতেই তিনি ভারতে এসেছিলেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, পৃথিবীর কোনো প্রান্তেই যেন এমন পরিস্থিতি আর কখনো সৃষ্টি না হয়, যেখানে নিরপরাধ মানুষকে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়।
দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, সেই সময় একটি সামরিক বিমান ভারতে এসেছিল এবং ভারতও এ ধরনের পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত ছিল না। তিনি নিজেও তখন টেলিভিশনে দেখছিলেন, স্ক্রলে প্রচার করা হচ্ছিল যে তিনি অন্য কোনো দেশে যাচ্ছেন। সেই মুহূর্তে তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ফলে পরিস্থিতির বাস্তবতায় আমাদের সামনে খুব বেশি বিকল্প ছিল না।
তিনি বলেন, একজন প্রতিবেশী হিসেবে তখনকার বাস্তবতাকে গ্রহণ করাই ভারতের দায়িত্ব ছিল। কারণ কখনো কখনো এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, যার জন্য কোনো দেশই আগে থেকে প্রস্তুত থাকে না। ভারত যদি বলত যে তাকে গ্রহণ করবে না, এমনকি অবতরণের অনুমতিও না দিত, তাহলে পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াত, তা বলা কঠিন।
তিনি বলেন, এটাই ছিল সেই সময়ের ঐতিহাসিক বাস্তবতা। বর্তমান পরিস্থিতিতে যে আইনগত প্রক্রিয়া রয়েছে, সেটি তার নিজস্ব গতিতে চলছে। বাংলাদেশ একটি প্রাণবন্ত গণতান্ত্রিক দেশ এবং দেশের মানুষ আইনের শাসন ও বিচারব্যবস্থাকে সম্মান করে, ভারতও একটি প্রাণবন্ত গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে তার আইনগত প্রক্রিয়াকে সম্মান করে।
আরও পড়ুন: গণভোটের রায় না মানলে তারেক রহমানের ক্ষমতায় থাকার অধিকার নেই: জুনায়েদ
সম্প্রতি ভারতের নিরাপত্তা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ এবং নিজেদের নিরাপত্তার বিষয়টি তারা অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে ভালো বুঝেন। বাংলাদেশের কী করা উচিত, তা কাউকে বলে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশের সরকার ও জনগণ নিজেদের স্বার্থ ও নিরাপত্তা নিয়ে নিজেরাই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রাখে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতের নিরাপত্তায় হস্তক্ষেপের প্রশ্নই আসে না। বাংলাদেশের জনগণের ওপর ভারতের পূর্ণ আস্থা রয়েছে। বাংলাদেশের মানুষও বুঝবেন যে ভারতের নিরাপত্তায় হস্তক্ষেপের বিষয়টি কখনোই সামনে আসবে না।
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক অন্য কোনো দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ অন্য দেশগুলোর সঙ্গে যে সম্পর্কই বজায় রাখুক না কেন, নিজেদের জনগণের স্বার্থ রক্ষার অধিকার তাদের রয়েছে। একইভাবে ভারতেরও নিজেদের স্বার্থ রক্ষার অধিকার রয়েছে। একজন ভালো প্রতিবেশী হিসেবে একে অপরের মর্যাদা ও সম্মানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকাটাই গুরুত্বপূর্ণ।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে শুধুমাত্র লেনদেনভিত্তিক সম্পর্ক হিসেবে না দেখার কথা জানিয়ে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক এর চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত। এর সঙ্গে গভীর সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক বন্ধন রয়েছে।
আরও পড়ুন: বিয়ের ১৫ দিনের মাথায় সড়কে প্রাণ গেল ইতালি প্রবাসী তানভীরের
পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভারতের পূর্বাঞ্চলের মানুষ হিসেবে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিদ্যমান ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধন তিনি ভালোভাবেই বোঝেন। দুই দেশের এই সাংস্কৃতিক বন্ধন অত্যন্ত শক্তিশালী ও মৌলিক।
তিনি বলেন, ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক বাইরের বিশ্বের পক্ষে পুরোপুরি বোঝা কঠিন। একদিকে নজরুলগীতি, অন্যদিকে রবীন্দ্রসংগীত। এমনকি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দুই দেশের জাতীয় সংগীতের রচয়িতা। এ ধরনের সম্পর্ক দুই দেশের বন্ধনের অনন্য গভীরতাকে তুলে ধরে।
নিরাপত্তা সম্পর্ক এবং লেনদেনভিত্তিক সম্পর্ক এক নয় উল্লেখ করে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, বাংলাদেশের জনগণ অত্যন্ত বুদ্ধিমান এবং তারা ভারতের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে বোঝেন। তাই ভবিষ্যতেও এমন কোনো পরিস্থিতি আসবে বলে তিনি মনে করেন না, যেখানে ভারতের নিরাপত্তা নিয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে উদ্বেগের কারণ তৈরি হবে।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে মতপার্থক্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একটি পরিবারের মধ্যে যেমন কখনো কখনো সমস্যা বা মতপার্থক্য দেখা দেয়, দুই দেশের সম্পর্কেও তেমন কিছু বিষয় থাকতে পারে। কোনো সমস্যা না থাকলে সেটি গণতন্ত্রের বৈশিষ্ট্যও নয়। গণতন্ত্রে মতপার্থক্য থাকবেই। তবে এসব সমস্যা সমাধানের একমাত্র পথ হলো সংলাপ, আলোচনা, পরামর্শ ও পারস্পরিক যোগাযোগ। আর এই সংলাপের ভিত্তি হলো আস্থা।
আরও পড়ুন: হাসিনার পতনের আগে ইউনূসকে দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান করেন শফিকুল আলম
দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, দূরত্ব রেখে কোনো সম্পর্কের সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক সবসময়ই একটি চলমান প্রক্রিয়া। দুই দেশের মানুষের ভালোবাসা ও পারস্পরিক আন্তরিকতা তিনি দেখছেন। এ কারণে তিনি বিশ্বাস করেন, দুই দেশের সম্পর্কের মূল ভিত্তি অটুট রয়েছে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন