০৭:০২ পি.এম
সাবেক স্পিকার এবং বাংলাদেশের সাবেক ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের মৃত্যুতে জাতীয় সংসদে গভীর শোক প্রকাশ করেছে সরকার এবং বিরোধী দলের সদস্যরা। তারা তাঁর বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের স্মৃতিচারণ করেছেন এবং তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন।
তারা বলেন, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ছিলেন একজন প্রজ্ঞাবান আইনজীবী, অভিভাবকতুল্য দক্ষ সংসদ সদস্য, গণতন্ত্রের প্রতি অবিচল আস্থাশীল রাজনীতিবিদ এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের একজন দৃঢ় অভিভাবক।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের সভাপতিত্বে জাতীয় সংসদের বৈঠকে শোক প্রস্তাবের ওপর আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
আরও পড়ুন: ২১৭ বোতল মদসহ ধরা খেয়ে ছাত্রনেতা উদয় পদ হারালেন
এসময় স্পিকার বলেন, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের মৃত্যুতে জাতি একজন মহান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, প্রথিতযশা আইনজ্ঞ এবং সাদা মনের মানুষকে হারিয়েছে। তিনি বলেন, বিভিন্ন সংসদ সদস্যের বক্তব্য শুনে তিনিও আবেগাপ্লুত হয়েছেন।
তিনি স্মরণ করেন, কয়েকটি সংসদে ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের সহকর্মী হিসেবে কাজ করার সুযোগ হয়েছিল এবং স্পিকার হিসেবে তিনি যেভাবে দক্ষতা ও সৌন্দর্যের সঙ্গে সংসদের কার্যক্রম পরিচালনা করতেন, তা তাঁকে মুগ্ধ করেছিল।
স্পিকার বলেন, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ছিলেন একজন প্রথিতযশা আইনজীবী এবং শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহযোগী। তিনি ছিলেন অত্যন্ত সজ্জন এবং উদার মনের মানুষ, যার সম্পর্কে কখনো কারো কাছ থেকে কোন অভিযোগ শোনেননি।
তিনি বলেন, গত রাতে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল তাঁকে দেখতে গিয়েছিলেন। তিনিও আজ সকালে হাসপাতালে গিয়ে তাঁকে দেখার পরিকল্পনা করেছিলেন, কিন্তু সেই সুযোগ আর হয়নি। আল্লাহর ইচ্ছার কাছে সবাইকে নতি স্বীকার করতে হয়।
আরও পড়ুন: ঢাকায় সরকারি বাসা নেওয়া চাকরিজীবীদেরকে কড়া হুঁশিয়ারি প্রতিমন্ত্রীর
স্পিকার মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং তাঁর সুযোগ্য সন্তান ব্যারিস্টার নওশাদ জমিরসহ শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। তিনি মহান আল্লাহর কাছে পরিবারের সদস্যদের এ শোক সহ্য করার শক্তি ও তৌফিক কামনা করেন।
আলোচনায় অংশ নিয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার তাঁর কাছে শুধু রাজনৈতিক সহকর্মী ছিলেন না, একজন অভিভাবকসুলভ মানুষও ছিলেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও তিনি পুত্রের মতো স্নেহ করতেন।
মন্ত্রী বলেন, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ছিলেন একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। নিজ যোগ্যতায় লন্ডনের লিংকনস ইন থেকে ব্যারিস্টারি পাস করে দেশে ফিরে তিনি আইন পেশায় অসাধারণ সুনাম অর্জন করেন।
পঞ্চগড়ের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উঠে এসে তিনি জাতীয় রাজনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তিনি কখনো কোনো নির্বাচনে পরাজিত হননি এবং নিজ এলাকায় ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয়।
আরও পড়ুন: জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান হলেন আহসান হাবিব, প্রজ্ঞাপন জারি
মির্জা ফখরুল বলেন, ছাত্রজীবনে বাম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও পরে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে জাগদল এবং পরবর্তীতে বিএনপিতে যোগ দেন।
দল প্রতিষ্ঠার পর থেকেই তিনি বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং বিভিন্ন সময়ে মন্ত্রী ও স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
তিনি বলেন, গণতন্ত্র, আইনের শাসন এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি তাঁর ছিল অটল বিশ্বাস। তিনি সবসময় বলেছিলেন, নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে এগিয়ে নিতে হবে, গণতন্ত্রের বিকল্প কোনো পথ নেই।
মির্জা ফখরুল বলেন, মৃত্যুর আগের রাতে তিনি ব্যারিস্টার নওশাদ জমিরের সঙ্গে কথা বলেছিলেন। পরদিন সকালে হাসপাতালে গিয়ে তাঁকে দেখার পরিকল্পনা থাকলেও ভোরে তাঁর মৃত্যুসংবাদ পান। এজন্য তিনি ব্যক্তিগতভাবে গভীর বেদনা প্রকাশ করেন।
আরও পড়ুন: আকামার মেয়াদ শেষ হলেও সৌদি আরবে প্রবেশের সুযোগ: প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী
তিনি আরো বলেন, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের তিন সন্তানই আইন পেশার সঙ্গে যুক্ত। আইন ও ন্যায়বিচারের প্রতি তাঁর ভালোবাসা তিনি তাঁর পরিবারেও ছড়িয়ে দিয়েছেন।
তাঁর মৃত্যুতে দেশ একজন অভিজ্ঞ আইনজ্ঞ, রাজনীতিবিদ এবং সংসদীয় গণতন্ত্রের অন্যতম অভিভাবককে হারিয়েছে।
এর আগে সরকারি দলের সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ছিলেন দেশের অন্যতম সফল আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ। আইন পেশায় তাঁর নিষ্ঠা, সততা ও পেশাদারিত্ব তাঁকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন এবং জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবেও দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন।
আরও পড়ুন: ক্রসফায়ারের বক্তব্য প্রত্যাহার করে আইজিপির জবাবদিহি নিশ্চিতের দাবি টিআইবির
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ছিলেন একজন আপাদমস্তক ভদ্রলোক এবং দলের প্রতি শতভাগ নিবেদিত একজন রাজনৈতিক কর্মী।
তিন-পিস স্যুট, হ্যাট ও ছাতা ছিল তাঁর ব্যক্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ। দীর্ঘ আইনজীবী জীবনে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ক্লায়েন্ট বা সহকর্মীর কোনো অভিযোগ শোনা যায়নি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
স্বीজাতমন্ত্রী বলেন, শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন, পরে দলের জ্যেষ্ঠ সহকর্মী হিসেবেও সবাইকে পরামর্শ দিয়েছেন। বয়সের কারণে সর্বশেষ নির্বাচনে নিজে প্রার্থী না হয়ে তাঁর ছেলে ব্যারিস্টার নওশাদ জমিরকে মনোনয়ন দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন।
তিনি বলেন, সংসদ ভবন প্রাঙ্গণেই যেহেতু সাবেক স্পিকারদের দাফনের রীতি রয়েছে, তাই তিনি সংসদের সঙ্গেই চিরদিন যুক্ত হয়ে থাকবেন।
আরও পড়ুন: ৮৫ সাব-রেজিস্ট্রারকে বদলি, নতুন কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশ
তাঁর কর্মময় জীবন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
আলোচনায় অংশ নিয়ে বিরোধী দলের নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ছয়বারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য, সাবেক স্পিকার, সাবেক ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি এবং দেশের আইন অঙ্গনের উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন।
মহান আল্লাহ মানুষকে জীবন ও মৃত্যু দিয়েছেন উত্তম কর্মের পরীক্ষার জন্য, আর ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার তাঁর কর্মজীবনের মাধ্যমে মানুষের কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন।
ডা. শফিকুর রহমান আরো বলেন, ফ্যাসিবাদী শাসনামলে রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা হলে তারা প্রায়ই ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের শরণাপন্ন হতেন।
তিনি শুধু আইনি পরামর্শই দেননি, বরং আদালতে দাঁড়িয়ে তাদের পক্ষে লড়েছেন। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল, তিনি এ ধরনের মামলায় কখনো কোনো পারিশ্রমিক গ্রহণ করেননি।
তিনি বলতেন, এটি তাঁর নৈতিক দায়িত্ব।
তিনি আরো বলেন, স্পিকার হিসেবে তিনি সংসদকে প্রাণবন্ত করে তুলেছিলেন এবং আইন অঙ্গনে ছিলেন অসংখ্য আইনজীবীর শিক্ষক।
তাঁর চলন-বলন, ব্যক্তিত্ব ও কর্মনিষ্ঠা নতুন প্রজন্মের জন্য শিক্ষণীয় হয়ে থাকবে।
তিনি মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং আল্লাহর কাছে তাঁর ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করার দোয়া করেন।
আলোচনায় আরো অংশ নেন নোয়াখালী-১ আসনের সরকারি দলের সদস্য এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন, পাবনা-১ আসনের বিরোধী দলের (জামায়াতে ইসলামী) সদস্য মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান, রংপুর-৪ আসনের এনসিপির সংসদ সদস্য আখতার হোসেন।
আলোচনা শেষে সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যরা মরহুম ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করে মোনাজাত করেন মুন্সিগঞ্জ-৩ আসনের সরকারি দলের সদস্য মো. কামরুজ্জামান।
পরে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের প্রতি সম্মান জানিয়ে সংসদের অন্যান্য কার্যক্রম স্থগিত রেখে সংসদ মুলতবি ঘোষণা করেন।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন