০৪:৪০ এম
তিন মাস ধরে নিখোঁজ থাকা মানসিক ভারসাম্যহীন স্ত্রীর সন্ধানে পথে পথে ঘুরেছেন তার স্বামী। রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল, মাজার, আত্মীয়ের বাড়ি, অচেনা শহরের অলিগলি—কোথাও যাননি তিনি। স্ত্রীর মুখটি বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠেছে। কখনো মনে হয়েছে, হয়তো কোথাও দেখা হবে। আবার কখনো দীর্ঘ অপেক্ষার ফলে সব আশা ম্লান হয়ে গেছে।
কিন্তু স্ত্রীর খোঁজে তার আকাঙ্ক্ষা থেমে থাকেনি। শেষ পর্যন্ত ফেসবুকের একটি ভিডিওর মাধ্যমে খুলে গেল হারানো ঠিকানার দরজা।
ভিডিওতে স্ত্রীর উপস্থিতি দেখে যেন তিন মাসের উৎকণ্ঠার অবসান ঘটল। পরিচয় ও অবস্থান নিশ্চিত করে তিনি সেখানে ছুটে গেলেন। গিয়ে স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়লেন। তিন মাসের অপেক্ষা ও কষ্ট যেন মিশে গেল সেই এক আলিঙ্গনে। এটি ওই পরিবারের জন্য একটি ঐতিহাসিক ঘটনা হয়ে দাঁড়াল।
আরও পড়ুন: প্রধানমন্ত্রী ৭টি সেনাবাহিনী ইউনিটকে জাতীয় পতাকা প্রদান করলেন
মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ায় ঘটেছে এই ভালোবাসা ও মানবিকতার আবেগঘন ঘটনা। প্রায় তিন মাস আগে সাটুরিয়ার নিজ বাড়ি থেকে নিখোঁজ হন মানসিকভাবে অসুস্থ ওই নারী। স্ত্রীর নিখোঁজ হওয়ার পর স্বামী পাগলপ্রায় হয়ে তাকে খুঁজতে থাকেন। আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি থেকে শুরু করে রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল, মাজারসহ বিভিন্ন স্থানে ছুটেছেন।
অচেনা শহরের অলিগলিতেও খুঁজেছেন প্রিয় মানুষটিকে। অন্যদিকে, নিজের নাম-ঠিকানা ভুলে যাওয়া ওই নারী তখন দিন কাটাচ্ছিলেন মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার গোবিন্দল গ্রামের রাস্তার পাশে। রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে, ক্ষুধার্ত অবস্থায় মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরছিলেন একটু আশ্রয়ের আশায়। চারপাশে মানুষের ভিড় থাকলেও আপনজনহীন জীবনে ছিল গভীর একাকিত্ব।
ঠিক সেই সময়ে তার পাশে দাঁড়ান স্থানীয় ডিজিটাল কনটেন্ট ক্রিয়েটর 'ভয়েস অব রবিউল ভাই'। রাস্তার পাশে অসহায় ওই নারীকে দেখে তিনি কষ্ট পান। তাকে এড়িয়ে না গিয়ে মানবিক দুর্দশার কথা তুলে ধরে একটি ভিডিও তৈরি করেন। পরে ভিডিওটি ফেসবুকে প্রকাশ করেন।
এরপর ঘটে এমন কিছু, যা ওই নারী কিংবা তার স্বামী কেউই হয়তো ভাবতে পারেননি। ভিডিওটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। মানুষের শেয়ার আর শেয়ারের হাত ধরে একপর্যায়ে সেটি পৌঁছে যায় ওই নারীর স্বামীর মোবাইল ফোনে। তবে স্বামী নাম পরিচয় গোপন রাখার অনুরোধ করেছিলেন গণমাধ্যমের কাছে।
আরও পড়ুন: সদরপুরে ডেঙ্গু সচেতনতার জন্য লিফলেট ও মশার কয়েল বিতরণ
ভিডিওতে স্ত্রীর উপস্থিতি দেখেই স্বামী তাকে চিনে ফেলেন। এরপর আর কোনো অপেক্ষা নয়। পরিচয় ও অবস্থান নিশ্চিত করে দ্রুত ছুটে যান নির্দিষ্ট স্থানে। গেল মঙ্গলবার (২৮ সেপ্টেম্বর) দীর্ঘ প্রায় তিন মাস পর অবশেষে খুঁজে পান স্ত্রীকে।
স্বামীকে দেখেই ওই নারীও চিনতে পারেন তাকে। মানসিকভাবে অসুস্থ হলেও এতদিনের চেনা মানুষটিকে চিনতে বিন্দুমাত্র ভুল করেননি। স্ত্রীর সামনে পেয়ে স্বামী নিজেকে আর সামলে রাখতে পারেননি। রাস্তার পাশেই তাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন। সেই মুহূর্তের সাক্ষী পথচারী ও স্থানীয় বাসিন্দারা। কেউ কথা বলছিলেন না। সবাই যেন নীরবে দেখছিলেন দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর দুটি মানুষের ফিরে পাওয়ার দৃশ্য। স্বামীর চোখের পানি আর স্ত্রীর নির্বাক উপস্থিতিতে তৈরি হয়েছিল এমন এক আবেগঘন মুহূর্ত, যা উপস্থিত অনেককেই হৃদয় ছুঁয়ে যায়।
তিন মাস ধরে যে নারী ছিলেন ঠিকানাহীন, আপনজনহীন, সেই নারী স্বামীর কাছে ফিরে যেন আবার খুঁজে পেলেন তার সেই নিরাপদ আশ্রয়। স্ত্রীকে ফিরে পাওয়ার পর স্বামী চোখের পানি মুছতে মুছতে আকাশের দিকে তাকিয়ে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
কন্টেন্ট ক্রিয়েটর রবিউল হক বলেন, রাস্তার পাশে অসহায় অবস্থায় ওই নারীকে দেখে আমার ভীষণ কষ্ট হয়। তখনই মনে হয়েছিল, যেভাবেই হোক তাকে তার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে। সেই উদ্দেশ্যেই তার বিষয়টি নিয়ে একটি ভিডিও করে ফেসবুকে শেয়ার করেছিলাম। অবশেষে গত মঙ্গলবার তার স্বামী এসে তাকে নিয়ে যান। সেই মুহূর্তটি আমার জন্য সত্যিই আবেগঘন ও স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিতে পেরে আমিও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলাম। তিনি বলেন, একজন অসহায় মানুষকে তার আপনজনদের কাছে ফিরিয়ে দিতে পেরেছি, এটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় পাওয়া।
আরও পড়ুন: বিমানবন্দরের নিরাপত্তা উন্নয়নে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে প্রধান করে ৮ সদস্যের কমিটি গঠন
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন