০৬:৫৪ পি.এম
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হিসেবে খাইবার শেকান গণ্য করা হচ্ছে। এটি তুলনামূলকভাবে কম খরচে তৈরি করা সম্ভব হয়, সহজে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তরিত করা সম্ভব এবং লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার ক্ষেত্রে এর নির্ভুলতা উল্লেখযোগ্য। ইরান সম্প্রতি প্রায় ৯০০ মাইল পাল্লার এই ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে কিছু জটিল হামলায়।
মার্কিন কর্মকর্তাদের দ্বারা প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই ইরান তাদের খাইবার শেকান ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করার কাজ শুরু করেছে। তারা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে একযোগে ভিন্ন গতিপথ, গতি এবং আক্রমণ কৌশল প্রয়োগে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে।
এক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, সংঘাত চলাকালে ইরান দ্বারা নিক্ষিপ্ত অধিকাংশ খাইবার শেকান যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করতে সক্ষম হলেও কিছু ক্ষেপণাস্ত্র সঠিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করার ক্ষেত্রেও সফল হয়েছে।
আরও পড়ুন: আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ নেই: তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী
সামরিক বিশ্লেষকরা বলেন, ইরানের পুরোনো ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের জন্য আগে দীর্ঘ সময় ধরে জ্বালানি ভরতে হতো। কিন্তু খাইবার শেকানকে আগে থেকেই জ্বালানিপূর্ণ অবস্থায় রাখা সম্ভব হচ্ছে। প্রয়োজন হলে এটি দ্রুত ট্রাক বা মোবাইল লঞ্চারে তুলে উৎক্ষেপণ করা যায়। মার্কিন বা ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানের নজর এড়িয়ে ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি সচল রাখার উদ্দেশ্যে এটি করা হচ্ছে বলেই ধারণা।
কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকদের অনুযায়ী, খাইবার শেকানের কিছু সংস্করণে সামনের অংশে ছোট ইঞ্জিনসহ ওয়ারহেড রয়েছে। উড্ডয়নের শেষ পর্যায়ে বিস্ফোরকবাহী এই অংশটি প্রধান ক্ষেপণাস্ত্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং ঘণ্টায় প্রায় ৬ হাজার মাইল বেগে ধ্রুব গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে।
সাধারণত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মহাকাশ বা ঊর্ধ্বমুখী হয়ে প্রথমে উঠে সেখান থেকে দ্রুতগতিতে লক্ষ্যবস্তুতে আছড়ে পড়ে। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেপণাস্ত্র মাঝপথে গতিপথ পরিবর্তনের সক্ষমতা রাখে না। খাইবার শেকান নিয়ে গবেষণা করা বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি রাডারের নজর এড়িয়ে এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দেওয়ার জন্য অন্যান্য ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় অনেক বেশি দক্ষতার সঙ্গে নিজের গতিপথ পরিবর্তন করতে সক্ষম।
মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছেন, যুদ্ধের পুরো সময়জুড়ে ইরান তাদের আক্রমণ কৌশলে পরিবর্তন এনেছে। স্যাটেলাইটনির্দেশিত খাইবার শেকান দিয়ে যেসব লক্ষ্যবস্তুতে আক্রমণ করা হচ্ছে, সেখানে উচ্চগতির আক্রমণাত্মক ড্রোন এবং অপেক্ষাকৃত কম আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্রও ব্যবহার করছে তেহরান।
আরও পড়ুন: বিমানের দাম্মাম ও রিয়াদগামী ফ্লাইট স্থগিত
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়া পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ রাডারগুলো ইরানের হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। ফলে ওই অঞ্চলে মোতায়েন মার্কিন বাহিনীর নিরাপত্তা ঝুঁকি আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের সাবেক প্রধান, অবসরপ্রাপ্ত আর্মি জেনারেল জোসেফ ভোটেল বলেন, ইরান পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রতিপক্ষকে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য নতুন নতুন কৌশল উদ্ভাবন করছে।
তিনি আরও বলেন, ইরানের ড্রোন সক্ষমতা অত্যন্ত উন্নত। পাশাপাশি দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থাকায় তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও রকেট কর্মসূচিতে উল্লেখযোগ্য দক্ষতা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর আগে ইরানের হাতে প্রায় দুই হাজার খাইবার শেকান ও অন্যান্য মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ছিল। স্বাধীন ক্ষেপণাস্ত্র বিশেষজ্ঞ ফ্যাবিয়ান হিঞ্জের মতে, ভূগর্ভস্থ স্থাপনা থেকে সংরক্ষিত যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে ইরান নতুন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরী করে থাকতে পারে। তবে ক্ষেপণাস্ত্রের ইঞ্জিন উৎপাদনের প্রাথমিক কেন্দ্রগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে।
ইরানবিষয়ক বিশেষজ্ঞ নিকোল গ্রাজিউস্কির মতে, যুদ্ধ চলাকালীন ইরান বুঝতে পেরেছে যে খাইবার শেকান তাদের জন্য অত্যন্ত কার্যকর অস্ত্র। কারণ এটি তুলনামূলকভাবে কম খরচে তৈরি করা যায়, বিভিন্ন উৎক্ষেপণ প্ল্যাটফর্ম থেকে নিক্ষেপ করা সম্ভব এবং লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সক্ষমতাও বেশি।
আরও পড়ুন: ইরানের ওপর ভয়াবহ হামলা করেছি, আবারো হামলা চালাব: ট্রাম্প
ইসরায়েলের দিকে খাইবার শেকান নিক্ষেপ করেছে ইরান। যদিও ইসরায়েলের দাবি, অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র তারা প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে। অন্যদিকে ইরান দাবি করছে, খাইবার শেকান ব্যবহার করে তারা ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় এবং বিমানবাহিনীর কমান্ডারের সদর দপ্তরে হামলা চালিয়েছে। গত মাসে জেটচালিত ড্রোনের পাশাপাশি খাইবার শেকান ব্যবহার করে নতুন দফার হামলার ঘোষণা দিয়েছে তেহরান। তবে ওই হামলার ফলাফল স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
ঐতিহাসিক খাইবার যুদ্ধের স্মরণে এই ক্ষেপণাস্ত্রের নামকরণ করা হয়েছে। ৬২৮ সালে আরবের খাইবার মরূদ্যান মুসলিম বাহিনীর দখলে যাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে এ নামকরণ করা হয়েছে।
একটি খাইবার শেকান তৈরির খরচ প্রকাশ করেনি ইরান। তবে বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় এটি অনেক কম ব্যয়বহুল। ব্যবহৃত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ধরন অনুসারে একটি মার্কিন বা ইসরায়েলি ইন্টারসেপ্টরের মূল্য ২০ লাখ থেকে ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার পর্যন্ত হতে পারে।
ফ্যাবিয়ান হিঞ্জের মন্তব্য অনুযায়ী, আগের হামলাগুলোর অভিজ্ঞতাকে বিশ্লেষণ করে ইরান এখন ক্ষেপণাস্ত্রের কার্যকারিতা আরও বাড়ানোর চেষ্টা করছে। এর ফলে শত্রুর প্রতিরক্ষাব্যূহ ভেদ করে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সম্ভাবনা সর্বাধিক করা সম্ভব হয়।
আরও পড়ুন: দ্রুত সময়ে সিরাজগঞ্জ বিসিক শিল্প পার্ক দৃশ্যমান হবে: প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব
তাঁর মতে, যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণই নতুন তথ্য প্রদান করে। প্রসেসটি পর্যবেক্ষণ করে ইরান তাদের সক্ষমতাকে আরও উন্নত করতে কাজ করছে। তিনি বলেন, তেহরান দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে যে খাইবার শেকান উড্ডয়নের শেষ মুহূর্তে গতিপথ পরিবর্তন করে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিতে সক্ষম।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন