০৩:০৮ পি.এম
বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশনের (বিসিআইসি) বরিশাল বাফার গোডাউনের ইনচার্জ শাহ আলম গাজীর বিরুদ্ধে উঠেছে অনিয়ম ও দুর্নীতির পাহাড়সম অভিযোগ। একসময় সাধারণ ‘ফায়ারম্যান’ হিসেবে কর্মজীবন শুরু করা এই কর্মকর্তা বর্তমানে শতকোটি টাকার সম্পদের মালিক বনে গেছেন। অভিযোগ রয়েছে, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে নিয়মবহির্ভূতভাবে তিনি বাফার গোডাউনের ইনচার্জ পদটি বাগিয়ে নিয়েছেন এবং দীর্ঘ বছর এক জায়গাতেই বহাল আছেন।
সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী, জাহাজ থেকে সার লেবার দিয়ে খালাস করে সরাসরি বাফার গোডাউনের ডিপোতে নেওয়ার নিয়ম থাকলেও শাহ আলম গাজী সেই নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে জাহাজ থেকে কার্গো বা বলগেট সার আনলোড করে মাঝনদীতে সার বলগেটে চড়া দামে বিক্রি করে দেন। এছাড়া প্রতি বস্তা সার মাঝনদীতে খালাস করার কারণে ৩ টাকা বেঁচে যায়। সেই সরকারি অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। স্থানীয় ডিলার ও ঘাট শ্রমিকরা জানান, এই জালিয়াতির মাধ্যমে তিনি প্রতিদিন হাজার হাজার টাকা আত্মসাৎ করছেন।
রক্ষক যখন ভক্ষক
চট্টগ্রাম থেকে বিআরটিসি ট্রাকে বরিশালে আসা সারের আনলোডিং কাজ ঠিকাদার নিয়োগের মাধ্যমে করার নিয়ম থাকলেও সরকারি নিয়ম ভেঙে শাহ আলম গাজী ঠিকাদারি কাজ নিজেই পরিচালনা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল)-এর জিএম কামরুল সাহেব তালাশ বিডিকে জানান, সরকারি পদে বহাল থাকা অবস্থায় কোনোভাবেই সার আনলোড করার ঠিকাদারি কাজ করা সম্পূর্ণ আইনবহির্ভূত। এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকলে প্রমাণসহ চেয়ারম্যান বা ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) বরাবর অভিযোগ দিলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
২০২৪ সালের মে মাসে ঘূর্ণিঝড় ‘রেমাল’-এর প্রভাবে গোডাউনের কিছু সার ভিজে যায়। অভিযোগ রয়েছে, জালিয়াতির উদ্দেশ্যে অর্থের বিনিময়ে স্থানীয় এক সাংবাদিককে ম্যানেজ করে অসত্য সংবাদ প্রচার করা হয় যে পুরো গোডাউনই পানিতে তলিয়ে গেছে। পরবর্তীতে চট্টগ্রাম থেকে অডিট টিম পরিদর্শনে এলে তাদের অর্থের বিনিময়ে ‘ম্যানেজ’ করে নষ্ট সার ভালো সারের সঙ্গে মিশিয়ে বিক্রি করা হয় এবং বিপুল পরিমাণ অর্থ লোপাট করেন ইনচার্জ শাহ আলম গাজী।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে শাহ আলম গাজী বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। সরকারি দায়িত্বের প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন সম্পদের বিশাল সাম্রাজ্য—এমন অভিযোগের পক্ষে প্রতিবেদকের হাতে রয়েছে একাধিক তথ্য-প্রমাণ। বরিশাল নগরীর ১১ নম্বর ওয়ার্ডের মাদ্রাসা সড়কে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে পাঁচতলা বিলাসবহুল ভবন—‘গাজী ম্যানশন’। পাশাপাশি রয়েছে প্রায় ৬০ লাখ টাকা মূল্যের ‘নিসান’ ব্র্যান্ডের ব্যক্তিগত গাড়ি।
অনুসন্ধানে আরও গুরুতর অভিযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। অভিযোগ রয়েছে, শাহ আলম গাজী তাঁর ব্যক্তিগত গাড়ির চালককে বাফার গোডাউনের মাস্টাররোল কর্মচারী হিসেবে দেখিয়ে সরকারি কোষাগার থেকে নিয়মিত বেতন উত্তোলন করছেন। সরকারি অর্থে ব্যক্তিগত কর্মচারীর বেতন দেওয়ার এমন অভিযোগে সংশ্লিষ্ট মহলে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন।
এতেই শেষ নয়—শাহ আলম গাজীর মালিকানায় রয়েছে দুটি কার্গো জাহাজ। পাশাপাশি, তাঁর স্ত্রীর নামে নেওয়া প্রথম শ্রেণির ঠিকাদারি লাইসেন্সের মাধ্যমে প্রতিবছর কোটি কোটি টাকার সরকারি কাজের ঠিকাদারি করার তথ্যও পাওয়া গেছে। এছাড়া গ্রামের বাড়িতে নির্মাণ করেছেন একটি আলিশান ডুপ্লেক্স ভবন এবং গড়ে তুলেছেন একটি মাদ্রাসা।
আরও পড়ুন: তাহিরপুরে প্রবাসীর স্ত্রী ও পাঁচ লাখ টাকা নিয়ে উধাও নাজমুল, পরিবার উদ্বিগ্ন
নগরীর ১০ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক এক কাউন্সিলর ক্ষোভ প্রকাশ করে তালাশ বিডিকে বলেন, শাহ আলম গাজী একসময় গোলপাতার ঘরে ভাড়া থাকতেন। একজন সাধারণ ফায়ারম্যান হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে সরকারি চাকরি থেকে তিনি কতটুকু বেতন-ভাতা পেয়েছেন, সেটি সংশ্লিষ্ট নথিতেই থাকার কথা। কিন্তু সেই সীমিত সরকারি বেতন থেকে কীভাবে অল্প সময়ের ব্যবধানে কোটি কোটি টাকার বাড়ি-গাড়ি, কার্গো জাহাজসহ বিপুল সম্পদের মালিক হলেন—এ প্রশ্নের উত্তর অবশ্যই খুঁজে বের করা দরকার। একজন সরকারি কর্মচারীর বৈধ আয় ও অর্জিত সম্পদের মধ্যে যদি এত বড় ধরনের অসামঞ্জস্য থাকে, তাহলে সেই সম্পদের উৎস কী, কার মাধ্যমে এবং কীভাবে তা অর্জিত হয়েছে—তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে।
তিনি আরও বলেন, শাহ আলম গাজীর নামে ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা বিপুল পরিমাণ সম্পদ, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, বাড়ি-গাড়ি ও অন্যান্য সম্পদের উৎস এবং এসব সম্পদ অর্জনে সরকারি ক্ষমতা বা প্রভাবের অপব্যবহার হয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) উচিত বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে অনুসন্ধান করে সম্পদের প্রকৃত উৎস ও আয়-ব্যয়ের সামঞ্জস্য যাচাই করা এবং অনিয়ম বা দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে গোডাউনের কয়েকজন শ্রমিক অভিযোগ করে বলেন, “আমরা ঠিকাদারের মাধ্যমে কাজ করি। নিয়ম অনুযায়ী নদীপথে আসা জাহাজ থেকে সার গোডাউনে আনলোড করার কথা থাকলেও তা করা হয় না। অভিযোগ রয়েছে, জাহাজ থেকে নদীর মধ্যেই বাল্ক গেটে সার হস্তান্তর করা হয়। এর ফলে প্রতি বস্তা সারে শ্রমিকদের প্রাপ্য পারিশ্রমিক থেকে ৩ টাকা কম দেওয়া হয়। অথচ সরকারি কাগজপত্রে সার গোডাউনে আনলোড দেখানো হচ্ছে। শ্রমিকদের অভিযোগ, এই হিসাবে বরাদ্দ থাকা প্রতি বস্তার ৩ টাকা ইনচার্জ নিজেই আত্মসাৎ করছেন।”
শ্রমিকরা আরও বলেন, “আমরা দিন-রাত পরিশ্রম করেও কাজের ন্যায্য পারিশ্রমিক পাই না। দীর্ঘদিন ধরে এভাবে চললেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
স্থানীয় ডিলার ও শ্রমিকদের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিয়মিত নজরদারি না থাকায় শাহ আলম গাজী দীর্ঘদিন একই স্থানে দায়িত্ব পালন করে প্রভাবশালী হয়ে উঠেছেন। তাঁদের দাবি, সার খালাসের প্রকৃত প্রক্রিয়া, সরকারি নথিতে দেখানো হিসাব, শ্রমিকদের পারিশ্রমিক এবং প্রতি বস্তায় ৩ টাকা করে কম দেওয়ার অভিযোগ—সবকিছু নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হলে অনিয়মের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনের বিষয়টিও প্রশাসনিকভাবে খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
বরিশাল কেডিসিতে অবস্থিত বাফার গোডাউনে অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেডের (সিইউএফএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মিজানুর রহমান বলেন, অভিযোগের বিষয়ে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হবে।
অভিযোগগুলো গুরুতর হওয়া সত্ত্বেও অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না কেন—তালাশ বিডির এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিষয়টি যথাযথভাবে তদন্ত করা হবে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক বিধি ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় এবং সর্বোচ্চ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সিইউএফএল সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্ত কর্মকর্তা শাহ আলম গাজীর চাকরির মেয়াদ ২০২৮ সাল পর্যন্ত রয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে শাহ আলম গাজীর বক্তব্য জানতে তাঁর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে তাঁর হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে খুদে বার্তা পাঠিয়ে বক্তব্য জানতে চাওয়া হলেও এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তিনি কোনো জবাব দেননি।
এ বিষয়ে বরিশাল দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এক কর্মকর্তার সঙ্গে শাহ আলম গাজীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ ও সংশ্লিষ্ট তথ্য নিয়ে কথা হয়। দুদকের বরিশাল জেলা কার্যালয়ের ওই কর্মকর্তা বলেন, “সাংবাদিক হিসেবে দুর্নীতি ও অনিয়মের তথ্য তুলে ধরা আপনাদের দায়িত্ব। পাশাপাশি একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আপনারা আমাদের কাছে লিখিত অভিযোগ দিতে পারেন। অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি যথাযথভাবে যাচাই ও তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন