০১:৫৪ পি.এম
মৃত্যু মানুষের জীবনের অবধারিত পরিণতি। পৃথিবীর সব পরিচয়, ক্ষমতা, সম্পদ ও প্রভাব একদিন মৃত্যুর কাছে থেমে যায়।
তবে একজন মানুষের জীবনে তাঁর কার্যকলাপ, চরিত্র, ঈমান, ইলম এবং মানুষের কল্যাণে অবদান মৃত্যুর পরও মানুষের হৃদয়ে জীবিত থাকতে পারে। ইতিহাসে দেখা যায়, অনেক নেককার আলেম, দাঈ, মুজাহিদ কিংবা সমাজসেবকের ইন্তেকালে লাখো মানুষের ঢল নেমেছে, আবার অনেক খ্যাতিমান ব্যক্তিকে নীরব পরিবেশে দাফন করা হয়েছে। এখানে প্রশ্ন উঠছে—জানাজায় মানুষের উপস্থিতি কি ইসলামে বিশেষ মর্যাদার প্রমাণ? অধিক মানুষের উপস্থিতি কি মৃত ব্যক্তির কল্যাণের নিশ্চয়তা বহন করে?
ইসলাম বাহ্যিক সংখ্যা বা লোকদেখানো সম্মানের চেয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে অগ্রাধিকার দেয়। তবে একই সঙ্গে আমাদের রাসুলুল্লাহ (সা.) জানিয়েছেন, নেককার ব্যক্তির জন্য মুমিনদের আন্তরিক দোয়া, সৎ সাক্ষ্য এবং জানাজার সালাতে অধিক সংখ্যক মানুষের অংশগ্রহণ কল্যাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হতে পারে।
আরও পড়ুন: তারেক রহমান: জামায়াত-এনসিপি আমার রাষ্ট্রীয় সম্মান সহ্য করতে পারছে না
আল্লাহ তাআলা বলেছেন, 'নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বাধিক সম্মানিত, যে সর্বাধিক তাকওয়াবান।' (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১৩) এই আয়াতটি স্পষ্ট করে দেয় যে, ইসলামে মানুষের মর্যাদার মূল ভিত্তি হলো তাকওয়া। জানাজায় মানুষের সংখ্যা, সামাজিক অবস্থান বা বাহ্যিক জনপ্রিয়তা নয়; বরং আল্লাহভীতি এবং নেক আমলই প্রকৃত মর্যাদার মানদণ্ড।
জানাজায় বহু মানুষের সমাগম মৃত ব্যক্তির জন্য কল্যাণের একটি কারণ হতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'যে মুসলিম ব্যক্তির জানাজায় এমন চল্লিশজন মুসলিম অংশগ্রহণ করবে, যারা আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করে না, এবং তারা তার জন্য সুপারিশ (দোয়া) করবে, আল্লাহ তাদের সুপারিশ কবুল করবেন।' (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং : ৯৪৮)
এই হাদিসে বোঝা যায়, জানাজায় অধিকসংখ্যক ঈমানদার মানুষের উপস্থিতি মৃত ব্যক্তির জন্য রহমত ও মাগফিরাতের একটি কারণ হতে পারে। তবে এর মূল বিষয় হলো—তাদের আন্তরিক দোয়া ও ঈমান, সংখ্যা শুধু নয়। আরও একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, 'যে মুসলিমের জানাজায় একশত মুসলিম অংশগ্রহণ করে এবং সবাই তার জন্য দোয়া করে, তাদের দোয়া কবুল করা হয়।' (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং : ৯৪৭) এখানে সংখ্যার উদ্দেশ্য গৌরব প্রদর্শন নয়; বরং বেশি সংখ্যক মুমিনের আন্তরিক দোয়ার গুরুত্ব তুলে ধরা।
মুমিনদের সাক্ষ্য একটি সুসংবাদ। একবার একটি জানাজা অতিক্রম করলে সাহাবিগণ মৃত ব্যক্তির প্রশংসা করেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, 'তার জন্য জান্নাত অবধারিত হয়েছে।' এরপর আরেক ব্যক্তির জানাজা গেলে সাহাবিরা তার নিন্দা করেন। তখন তিনি বলেন, 'তার জন্য জাহান্নাম অবধারিত হয়েছে।' এরপর তিনি ব্যাখ্যা করেন, 'তোমরা পৃথিবীতে আল্লাহর সাক্ষী।' (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ১৩৬৭) এই হাদিসের অর্থ এই নয় যে, মানুষের মতামতই চূড়ান্ত ফয়সালা। বরং নেককার ব্যক্তির ব্যাপারে সৎ মুমিনদের স্বতঃস্ফূর্ত উত্তম সাক্ষ্য আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি শুভ লক্ষণ হতে পারে।
আরও পড়ুন: আদাবরে যুবদল নেতাকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে জখম
আল্লাহ যাঁকে ভালোবাসেন, মানুষও তাঁকে ভালোবাসে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'আল্লাহ যখন কোনো বান্দাকে ভালোবাসেন, তখন জিবরাইল (আ.)-কে বলেন, 'আমি অমুককে ভালোবাসি, তুমিও তাকে ভালোবাস।' এরপর আকাশবাসীদের মধ্যে তাঁর ভালোবাসার ঘোষণা দেওয়া হয়। তারপর পৃথিবীতেও তার জন্য গ্রহণযোগ্যতা প্রতিষ্ঠা করে দেওয়া হয়।' (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ৩২০৯) এই কারণেই অনেক নেককার আলেম ও বুযুর্গের মৃত্যুতে অসংখ্য মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে জানাজায় অংশগ্রহণ করেছেন। ইতিহাসে বহু মনীষীর জানাজায় অভূতপূর্ব মানুষের সমাগম ঘটেছে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল এবং ইবনে তাইমিয়া (রহ.).
জানাজায় বহু মানুষের উপস্থিতি কামনা করার চেয়ে এমন জীবন গড়া অধিক গুরুত্বপূর্ণ, যাতে মানুষ মৃত্যুর পর আন্তরিকভাবে আমাদের জন্য দোয়া করে। একজন মুসলমানের লক্ষ্য হওয়া উচিত—
১. আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ইখলাসের সঙ্গে আমল করা।
২. কোরআন ও সুন্নাহর অনুসরণ করে জীবন-যাপন করা।
আরও পড়ুন: শেরপুরে বাসের চাপায় সিএনজি যাত্রী নিহত, আহত ৪
৩. মানুষের উপকার করা এবং উত্তম চরিত্র গঠন করা।
৪. জীবদ্দশায় এমন আচরণ করা, যাতে মৃত্যুর পর মানুষ কল্যাণের সাক্ষ্য দেয় ও দোয়া করে।
৫. অন্যের জানাজায় অংশগ্রহণ করে তার জন্য আন্তরিকভাবে মাগফিরাতের দোয়া করা।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে এমন জীবন দান করুন, যা মাধ্যমে মৃত্যুর পরও মুমিনদের আন্তরিক দোয়ার সৌভাগ্য অর্জন করা। আমিন।
আরও পড়ুন: কোনো দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে পেলে কতদিন ক্ষমতায় থাকবেন নেতানিয়াহু?
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন