০১:৩৪ পি.এম
ইতালির সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এর সাহায্যে তৈরি একটি মিম ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনিকে এমন কিছু কাজ করতে দেখা যাচ্ছে, যা সাধারণত কোনো ‘সম্পর্ক’ ভেঙে যাওয়ার পর একজন মানুষ করে থাকে।
একটি ভুয়া ছবিতে তাকে পরিবর্তিত নতুন চুলের স্টাইল করতে দেখা যাচ্ছে। অন্য ছবিগুলোতে তিনি একা ভ্রমণের পরিকল্পনা করছেন, ম্যারাথনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন এবং একটি ডেটিং অ্যাপে প্রোফাইল খোলার উদ্দেশ্যে ব্যস্ত রয়েছেন। ছবিগুলোর কোনোটিই বাস্তব নয়। তবে এগুলো জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে, কারণ এগুলো মেলোনি ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বিরোধকে ব্যঙ্গাত্মকভাবে তুলে ধরেছে।
গত কয়েক মাসের মধ্যে, দুই নেতার সম্পর্কের মাঝে নাটকীয় টানাপোড়েন লক্ষ্য করা গেছে। রাজনৈতিক সমালোচনা, ব্যক্তিগত মন্তব্য ও পাল্টা প্রতিক্রিয়া এই একসময়ের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সম্পর্ককে অনেকটাই শীতল করে তুলেছে। অথচ ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্পের অভিষেক অনুষ্ঠানে মেলোনিই ছিলেন একমাত্র ইউরোপীয় নেতা, যিনি সামনের সারিতে বসেছিলেন।
আরও পড়ুন: কংগ্রেসকে পরজীবী ও রাহুলকে ব্যর্থ পণ্য আখ্যা দিলেন নরেন্দ্র মোদি
এপ্রিল মাসে, ইউরোপীয় পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নিয়ে সৃষ্টি হওয়া উত্তেজনা কমানোর উদ্দেশ্যে হোয়াইট হাউসে অনুষ্ঠিত একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধি হিসেবে মেলোনিকেই বেছে নেওয়া হয়েছিল।
ফ্যাসিবাদ-পরবর্তী ইতালীয় ডানপন্থী রাজনীতির মাঝে উঠে আসা মেলোনি, রাজনৈতিক জীবনের প্রাথমিক পর্যায়ে মূল ধারা থেকে সরে ছিলেন। কিন্তু পরে তিনি ইউরোপের ডানপন্থী রাজনীতির একজন মধ্যপন্থী ও গ্রহণযোগ্য নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, মেলোনি ও ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠতা শুধুমাত্র কূটনৈতিক সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এটি ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষণশীল রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বোঝাপড়ার প্রতীক হিসেবেও দেখা হত।
মেলোনির জন্য ট্রাম্পের সাথে সম্পর্ক স্থাপন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার রাজনৈতিক গুরুত্ব ও প্রভাব বৃদ্ধির জন্য একটি বিশাল সুযোগ ছিল। এর মাধ্যমে তিনি বিশ্বের প্রভাবশালী নেতাদের সারির মধ্যে নিজের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করার সক্ষমতা অর্জন করেন। তবে সময়ের সাথে সাথে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অপ্রত্যাশিত ও বিতর্কিত আচরণ সামলানোর জন্য প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির জন্য সহজ হয়ে পড়ছিল না। এর ফলে তার রাজনৈতিক অবস্থান ও বিশ্বাসযোগ্যতা কিছুটা বিপাকে পড়ে যায়।
আরও পড়ুন: পাকিস্তানের গোয়াদরে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে নিহত ৩ সন্ত্রাসী
দুই নেতার সম্পর্কের প্রথম বড় টানাপড়েন দেখা দেয় মার্চের শেষে। সে সময় ইতালির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সিসিলির সিগোনেলা ন্যাটো ঘাঁটিতে মধ্যপ্রাচ্যগামী মার্কিন সামরিক বিমানকে সংসদের অনুমোদন ছাড়া ব্যবহার করার অনুমতি দিতে অস্বীকার করে। ইতালির সংবিধান এবং যুদ্ধবিরোধী জনমতের কথা চিন্তা করেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
কয়েক সপ্তাহ পর, দুই নেতার বিরোধ ক্রমশ তীব্র হয়ে উঠে। এপ্রিল মাসে, ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে পোপ লিও চতুর্দশের সমালোচনা করেন। যুদ্ধ নিয়ে পোপের অবস্থানের পাল্টা জবাবে তিনি তাকে অপরাধ দমনে অপ্রতুল হিসেবে আখ্যা দেন।
ক্যাথলিক সংখ্যাগরিষ্ঠ ইতালির প্রধানমন্ত্রী হিসেবে, মেলোনি ট্রাম্পের এই মন্তব্যের কড়া সমালোচনা করেন। তিনি পোপের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত আক্রমণকে অগ্রহণযোগ্য বলে অভিহিত করেন। মেলোনির এই অবস্থান ট্রাম্প ভালভাবে নেননি।
ইতালীয় দৈনিক ‘কোরিয়েরে দেলা সেরা’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি তার আচরণে বিস্মিত। আমি ভেবেছিলাম তিনি সাহসী, কিন্তু আমি ভুল ছিলাম।’ ট্রাম্প আরো জানান, ‘তিনি আর আগের মানুষ নেই। ইতালিও আর আগের দেশ নেই।’ তার এই মন্তব্য দুই নেতার মধ্যে রাজনৈতিক দূরত্ব স্পষ্ট করে দেয়। তবে জুন মাসে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে বলে মনে হয়।
আরও পড়ুন: যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের লড়াই বদলে দিচ্ছে সুপ্রিম কোর্ট
ফ্রান্সের এভিয়ান-লে-বাঁ শহরে অনুষ্ঠিত জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনে ট্রাম্প ও মেলোনিকে দীর্ঘ সময় একত্রে আলোচনা করতে দেখা যায়। পরে ইতালীয় কর্মকর্তারা জানান, দুই নেতার মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি দূর করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। মেলোনিও বলেন, ঐ বৈঠকের পরিবেশ ছিল ইতিবাচক এবং সেখানে কোনো উত্তেজনা ছিল না।
এ কারণে ধারণা করা হচ্ছিল, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তৈরি হওয়া টানাপোড়েন ধীরে ধীরে কমে আসতে পারে। কিন্তু সেই ধারণা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। সাংবাদিকরা খবর প্রকাশ করার আগেই নতুন বিতর্ক শুরু হয়।
কিছুদিন পর, ইতালির টেলিভিশন চ্যানেল লা৭-কে দেওয়া এক ফোন সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প দাবি করেন, জি-৭ সম্মেলনে মেলোনি তার সাথে ছবি তোলার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। ট্রাম্পের ভাষায়, ‘তিনি আমার সাথে ছবি তুলতে খুবই আগ্রহী ছিলেন। আমি ছবি তুলতে চাইনি, কিন্তু তার জন্য খারাপ লেগেছিল।’ এর জবাবে, মেলোনি একটি ভিডিও বার্তা প্রকাশ করে ট্রাম্পের বক্তব্যকে ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা’ বলে উড়িয়ে দেন।
তিনি বলেন, ‘আমি জানি না কেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট তার মিত্রদের সাথে এমন আচরণ করেন। তবে তিনি যদি পশ্চিমা বিশ্বের শত্রুদের প্রতিও একই দৃঢ়তা দেখাতেন, তাহলে আরো ভালো হতো। আর একটি বিষয় তিনি মনে রাখবেন, আমি বা ইতালি কখনো কারো কাছে অনুরোধ বা ভিক্ষা করি না।’
আরও পড়ুন: নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে আইন প্রয়োগের দাবি জানালো নিসচার
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন