০৩:৪৬ এম
আদালতের রায়ে তাকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। রাসেলের বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানা ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। অথচ পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও রাজশাহীর আলোচিত মাদক ব্যবসায়ী মনোয়ারুল হাসান রাসেল, যিনি ‘চিট রাসেল’ নামে পরিচিত, এখনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছেন। বাসের হেলপার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে রাসেল উত্তরাঞ্চলের অন্যতম আলোচিত মাদক কারবারিতে পরিণত হয়েছেন। তিনি কিভাবে মাদকের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক গড়ে তুললেন এবং মাদক ব্যবসার মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হলেন, এসব প্রশ্ন এখন সাধারণ মানুষের মধ্যে ঘুরছে।
আদালতের নথি অনুযায়ী, চট্টগ্রাম জেলার দায়রা মামলা নং-৩০৯৫/২০২১ অনুযায়ী, কোতোয়ালী থানার মামলা নং-০৮ (০৯)১৯ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর বিভিন্ন ধারায় অভিযোগ দায়ের ছিল। তালিকা অনুযায়ী পলাতক আসামি মনোয়ারুল হাসান রাসেলের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত-৪, চট্টগ্রামের বিচারক আফরোজা জেসমিন কলি ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ তারিখে তাকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেছেন। সেইসঙ্গে সাজা পরোয়ানা ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির নির্দেশও দিয়েছেন।
কিন্তু আদালতের রায় ও পরোয়ানা বাস্তবায়নের পরও রাসেল গ্রেপ্তার না হওয়ায় প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে- ‘চিট রাসেল’ কোথায়?
আরও পড়ুন: মুখোশ পরে দোকানে ঢুকে ব্যবসায়ীকে গুলি
রাসেলের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বাস্তবায়নের দিকে নজর দেওয়া হলে গোদাগাড়ী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আতিকুর রহমান বলেন, তিনি বিস্তারিত জানাতে পারেননি। বরং থানার ওয়ারেন্ট অফিসারের সাথে যোগাযোগের কথা বলেন। ওয়ারেন্ট অফিসার নাজমুল হাসানের বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানালেন, ‘মনোয়ারুল হাসানের নামে একটি ওয়ারেন্ট ছিলো’ এবং আদালত থেকে জামিন নিয়ে তিনি গত ১৯ জুলাই রিকল থানায় জমা দিয়েছেন। অন্যদিকে, অপর দায়িত্বপ্রাপ্ত ওয়ারেন্ট অফিসার এসআই নুরুল ইসলামের কাছে তথ্য চেয়েও সঠিক কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। তিনি বিভিন্ন প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানান।
‘চিট রাসেল’ সম্পর্কে জানাতে গেলে, রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার জন্মস্থান হিসেবে পরিচিত মনোয়ারুল হাসান রাসেল স্থানীয়ভাবে ‘চিট রাসেল’ নামে পরিচিত। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা যায়, একসময় তিনি উত্তর-পশ্চিবাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ মাদক সরবরাহকারী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
২০১৬ সালের ৩ আগস্ট টাঙ্গাইলের বঙ্গবন্ধু সেতু পূর্ব থানার এলাকায় অভিযান চালিয়ে র্যাব-১২ প্রায় ৬০ হাজার পিস ইয়াবা এবং একটি ট্রাকসহ রাসেলকে আটক করে। সেসময় বাজেয়াপ্ত করা ইয়াবার বাজারমূল্য ছিলো প্রায় দেড় কোটি টাকা। র্যাব অবশ্য দাবী করেছে, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোরসহ উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় রাসেল মাদক সরবরাহ করতেন।
এর দুই বছর পর ২০১৮ সালের ১৭ অক্টোবর গভীর রাতে রাজশাহী মহানগরীর উপশহর এলাকায় আরএমপি ও গোয়েন্দা পুলিশের যৌথ অভিযানে রাসেল ও তার স্ত্রী মরিয়মকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তাদের ভাড়া বাসা থেকে উদ্ধার করা হয় ৮৮০ পিস ইয়াবা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তখন জানিয়েছিল, রাসেল দীর্ঘদিন ধরে ইয়াবা এবং অন্যান্য মাদক ব্যবসার সাথে যুক্ত ছিলেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে গেছেন।
আরও পড়ুন: মহাসপ্তমীতে পূজামণ্ডপ পরিদর্শন ও শারদীয় শুভেচ্ছা বিনিময় করলেন বিএমপি কমিশনার
স্থানীয়রা জানিয়ে থাকেন, রাসেলের মাদক ব্যবসার কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে হেরোইন বহন, পরে তিনি নিজস্ব নেটওয়ার্ক গঠন করে ইয়াবা ব্যবসায় আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন। অভিযোগ রয়েছে, মাদক ব্যবসার মাধ্যমে কয়েক বছরের মধ্যে বিপুল অর্থ-সম্পদের মালিক হন তিনি। রাজশাহী শহরে তাঁর বহুতল ভবন, দামি ফ্ল্যাট, জমি ও অন্যান্য স্থাবর সম্পদের দাবি রয়েছে। কেউ কেউ এও দাবী করেন, রাসেলের সম্পদ শত কোটি টাকায় পৌঁছেছে। তবে তার সম্পদের আসল উৎস ও বৈধ আয়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা তা সম্পর্কে কোনো পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এখনও হয়নি।
এই সমস্ত প্রশ্নের মাঝে সামাজিক মহলে জিজ্ঞাসা উঠছে- কেন রাসেলের সম্পদের উৎস অনুসন্ধান করা হবে না? আইন বিশেষজ্ঞদের ও সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন- একজন ব্যক্তি যখন মাদক ব্যবসার মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পায় এবং দীর্ঘদিন ধরে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ থাকে, তখন অবশ্যই তাকে অনুসন্ধানের আওতায় আনা উচিত। তবে এখন পর্যন্ত রাসেলের বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে কোনো মামলা বা সুনির্দিষ্ট তদন্তের পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এই নিয়ে স্থানীয়েরা ও সচেতন মহলে প্রশ্ন উঠা অব্যাহত রয়েছে।
সংক্ষেপে, প্রশ্ন একটি- রাসেল কোথায়? আদালতের রায়ে তাকে যাবজ্জীবন সাজা দেওয়া হয়েছে। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে। অতীতে বিপুল পরিমাণ ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়ার রেকর্ডও আছে। অথচ দীর্ঘ সময় ধরে তিনি গ্রেপ্তার হচ্ছেন না, এ পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কী ভূমিকা পালনের করছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত ‘চিট রাসেল’কে গ্রেপ্তার করে আদালতের সাজা কার্যকর করা উচিত। পাশাপাশি তার মাদক ব্যবসার নেটওয়ার্ক, সহযোগী ও পৃষ্ঠপোষকদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা এবং মাদক ব্যবসার মাধ্যমে অর্জিত সম্পদের উৎস খতিয়ে দেখে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
আরও পড়ুন: সুনামগঞ্জের মধ্যনগরে বিভিন্ন পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করলেন এম পি কামরুজ্জামান কামরুল
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন