১১:৪২ এম
ভারত ও চীনের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টার মধ্যে সীমান্ত নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর প্রধান শত্রুজিৎ সিং কাপুরের বক্তব্য অনুযায়ী, অরুণাচল প্রদেশের বিরোধপূর্ণ অঞ্চলে চীনা সেনারা ভারতের দাবিকৃত ভূখণ্ডের কয়েক কিলোমিটার ভেতরে তাঁবু স্থাপন করেছে। এই মন্তব্য দুই দেশের সম্পর্কের উন্নতি কতটা স্থায়ী হবে, তা নিয়ে নতুন প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে।
ভারত-তিব্বত সীমান্ত পুলিশের (আইটিবিপি) মহাপরিচালক কাপুর সম্প্রতি রাজস্থানে এক অনুষ্ঠানে বলেন, অরুণাচল প্রদেশের কিছু স্থানে ভারত ও চীনা সেনাদের মধ্যে মুখোমুখি অবস্থানের ঘটনা ঘটেছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, জুলাই মাসে এসব ঘটনার সূচনা হয়। প্রথমে উভয় পক্ষ সরে গেলেও কয়েক দিন পর চীনা সেনারা আরও বেশি সংখ্যায় ফিরে আসে এবং ভারতের দৃষ্টিতে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখার প্রায় ছয় থেকে সাত কিলোমিটার ভেতরে তাঁবু স্থাপন করে।
কাপুরের এই মন্তব্যের পর ভারতের বিরোধী দল কংগ্রেস সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। দলটির অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার চীনের কাছে ছাড় দিচ্ছে। তবে কাপুরের বক্তব্যের বিষয়ে ভারত সরকার স্পষ্টভাবে কোনো অস্বীকৃতি জানায়নি।
আরও পড়ুন: ১২৪ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ মামলা ট্রাম্পের বিরুদ্ধে
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, চীনা সেনারা প্রতিষ্ঠিত টহল দেওয়ার নিয়ম থেকে সরে গেলে সীমান্ত পরিস্থিতি বিঘ্নিত হয়। তিনি জানান, অমীমাংসিত বিষয়গুলো সমাধানে দুই দেশ সামরিক ও কূটনৈতিক পর্যায়ে যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছে।
অন্যদিকে, চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, বেইজিং দুই দেশের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি মেনে চলছে এবং নিজেদের ভূখণ্ডের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সীমান্তে স্বাভাবিক টহল কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
ভারত ও চীনের মধ্যে প্রায় ৩ হাজার ৪৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত নিয়ে কয়েক দশক ধরে বিরোধ চলমান রয়েছে। সীমান্তের বড় অংশের সুনির্দিষ্ট সীমানা এখনো নির্ধারিত হয়নি। চীন অরুণাচল প্রদেশকে দক্ষিণ তিব্বতের অংশ বলে দাবি করে, যা ভারত প্রত্যাখ্যান করে রাজ্যটিকে নিজেদের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করে।
২০২০ সালের জুনে লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় দুই দেশের সেনাদের সংঘর্ষে অন্তত ২০ জন ভারতীয় ও চারজন চীনা সেনা নিহত হন। ওই ঘটনার পর দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের বড় ধরনের অবনতি ঘটে। তবে কয়েক দফা আলোচনার পর ২০২৪ সালে সীমান্তে উত্তেজনা কমানোর বিষয়ে দুই দেশ সমঝোতায় পৌঁছায়।
আরও পড়ুন: পুতিন ও জেলেনস্কির শিগগিরই বৈঠক হবে: ট্রাম্প
এরপর সরাসরি বিমান চলাচল পুনরায় চালু এবং ভিসাসংক্রান্ত বিধিনিষেধ শিথিল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। গত সেপ্টেম্বরে ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নিতে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ভারত সফর করেন। সাত বছরের মধ্যে এটিই ছিল তাঁর প্রথম ভারত সফর। এসব উদ্যোগ সম্পর্কের উন্নতির আশা তৈরি করলেও সাম্প্রতিক সীমান্ত পরিস্থিতি সেই অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব শ্যাম শরণ বিবিসিকে বলেন, অরুণাচল সীমান্তের বিভিন্ন স্থানে চীনের এ ধরনের তৎপরতা বেশ কিছুদিন ধরেই চলছে। তাঁর মতে, এসব পদক্ষেপ সরাসরি যুদ্ধ বাধানোর মতো না হলেও সীমান্তে নতুন বাস্তবতা তৈরির চেষ্টা হতে পারে।
সীমান্ত বিরোধের পাশাপাশি দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। গত বছর তাদের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১৫১ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে চীন থেকে ভারতে রপ্তানির পরিমাণ ছিল প্রায় ১৩১ বিলিয়ন ডলার। যন্ত্রপাতি, বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি, বিরল মৃত্তিকা চুম্বক ও ওষুধশিল্পের পণ্যের জন্য ভারত চীনের ওপর নির্ভরশীল। ফলে দুই দেশের উত্তেজনা ভারতের শিল্প ও অবকাঠামো খাতেও প্রভাব ফেলতে পারে।
সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দারাও বিরোধের প্রভাব অনুভব করছেন। অরুণাচল টাইমসের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক টোঙ্গাম রিনা বিবিসিকে বলেন, চীনের অনুপ্রবেশ ও দখলদারির কারণে সীমান্তের কিছু এলাকার গ্রামবাসী চারণভূমিতে যেতে পারছেন না। এতে স্থানীয় মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।
আরও পড়ুন: প্রশান্ত মহাসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ৫ জন নিহত
বিশ্লেষকদের মতে, চীন ভারতের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে না চাইলেও দীর্ঘস্থায়ী সীমান্ত বিরোধ থেকে কৌশলগত সুবিধা পেতে পারে। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো আবারও প্রমাণ করে যে, কূটনৈতিক সম্পর্কের উন্নতি মানেই সীমান্তে স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত হওয়া নয়। তথ্যসূত্র: বিবিসি
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন