০২:০৬ পি.এম
নিজের একটি ছোট দোকান রয়েছে, এবং আয়ও সীমিত। কিন্তু অসহায় পাগলদের সেবায় কখনো পিছপা হন না রায়হানুর রহমান কাজল। কখনো তিনি গোসল করিয়ে দেন, কখনো হাত-পায়ের নখ কেটে দেন, আবার কখনো নিজের হাতে খাবার তুলে দেন। বিনিময়ে তার কোনো প্রত্যাশা নেই। এসব মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি মনের তৃপ্তি খুঁজে পান। এভাবেই কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার রায়হানুর রহমান কাজল (৩৯) প্রায় ২১ বছর ধরে পাগলদের সেবা করে আসছেন।
কাজল উপজেলার নাজিমখান ইউনিয়নের বেটুবাড়ি গ্রামের মৃত গমির উদ্দিন আহমেদ ও শাহের বানুর ছেলে। নাজিমখান বাজারে তার একটি ছোট ভুসির দোকান রয়েছে। সেখানে ভুসি, মাছের খাদ্য ও ওষুধ বিক্রি করেই তার সংসার চলে। সীমিত আয়ের মধ্যেও প্রতি মাসে পাগলদের জন্য তিনি নিজের পকেট থেকে প্রায় তিন হাজার টাকা ব্যয় করেন।
কাজলের মানবিক পথচলার শুরু ২০০৫ সালে। ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে নাজিমখান বাজারে আসার সময় তিনি দেখতেন, অনেক পাগল অপরিচ্ছন্ন পোশাকে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তাদের হাত-পায়ের নখ অযত্নে বড় হয়ে আছে। এসব দৃশ্য তাকে ব্যথিত করত। সেই উপলব্ধি থেকেই তিনি তাদের পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। ২০১১ সালে বাজারে দোকান দেওয়ার পর তিনি আরও নিয়মিতভাবে সেবা শুরু করেন।
আরও পড়ুন: ঢামেকে অ্যাম্বুলেন্স ধর্মঘটে মরদেহ পরিবহনে বিপাকে স্বজনরা, রোগীরাও ভোগান্তিতে
এরপর থেকে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী পাগলদের গোসল করানো, নখ কেটে দেওয়া, চুল-দাড়ি ছেঁটে দেওয়া, খাবার খাওয়ানো ও নতুন পোশাক কিনে দেওয়ার মতো কাজ করে যাচ্ছেন কাজল। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত প্রায় ১২০ জনকে সেবা দিয়েছেন। বাজারে কিংবা আশপাশে যেখানেই তাদের দেখা পান, সাধ্যমতো সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। বর্তমানে তিনি নিয়মিত চারজন পাগলকে দেখাশোনা করছেন।
কাজলের এ মানবিক পথচলায় সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা তার স্ত্রী মারুফা আক্তার লিপি। স্বামীর উদ্যোগে তিনি শুধু উৎসাহই দেন না, প্রয়োজনে বাড়িতে আসা সেবাপ্রত্যাশীদের খাবারের ব্যবস্থাও করেন।
মারুফা আক্তার লিপির ভাষ্য, ‘আমার স্বামীকে আমি সব সময় অনুপ্রাণিত করি। মাঝেমধ্যে তিনি অনেককে বাড়িতে নিয়ে আসেন। আমি তাদের খাবার খাওয়াই। তার এ কাজকে আমি ভালো চোখে দেখি।’
কাজলের মানবিক উদ্যোগের সবচেয়ে আবেগঘন উদাহরণ রাসেল। বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধী এ ছেলেকে ১০ বছর ধরে তিনি নিজের কাছে আশ্রয় দিয়েছেন। রাসেলের খাবার, পোশাক ও দেখাশোনার দায়িত্ব পালন করছেন নিজের অর্থেই। রাসেল নিজে কাপড় পরতে পারেন না, তাই দৈনন্দিন কাজেও সহযোগিতা করেন কাজল। শুধু আশ্রয় ও খাবারের ব্যবস্থা করেই থেমে থাকেননি; রাসেলকে স্কুলেও ভর্তি করিয়েছেন। কোথাও দাওয়াত খেতে গেলে তাকেও সঙ্গে নিয়ে যান। নিজের সন্তানের মতোই আগলে রাখেন রাসেলকে।
আরও পড়ুন: তারেক রহমান: জামায়াত-এনসিপি আমার রাষ্ট্রীয় সম্মান সহ্য করতে পারছে না
নাজিমখান বাজারের স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের কাছেও কাজলের এ উদ্যোগ পরিচিত। রামকৃষ্ণ গ্রামের বাসিন্দা মো. রেজা বলেন, ‘আমি ছোটবেলা থেকেই দেখছি, কাজল ভাই নাজিমখান বাজারে যত পাগল আসে সবাইকে নিয়ে আসে। হাত-পায়ের নখ কাটি দেয়। গোসল করে দেয়। খাওয়া-দাওয়া করে তারপর পাঠিয়ে দেয়।’
কাজলের দোকানের পাশের দর্জি মো. এমদাদুল হক (৫৫) বলেন, যেকোনো এলাকার পাগল হোক, নাজিমখান বাজারে আসলে কাজল তাদের খোঁজ করেন। রাসেল তো কাজলের সঙ্গে সব সময় থাকেন। রাসেল নিজে কাপড়ও পরতে পারে না। সবকিছু কাজল করে দেন তাকে। নিজের সন্তানের মতো রাসেলকে আগলে রাখেন।
নাজিমখান ইউনিয়নের বাসিন্দা আব্দুর সবুর মন্ডল (৬০) বলেন, ‘আমরা তো ভালো মানুষ পাক-পবিত্র থাকতে পারি। কিন্তু পাগলরা তো এসব বুঝে না। কাজল তাদের পাক-পবিত্র থাকতে সাহায্য করছেন। এটি আমার কাছে প্রশংসনীয় কাজ।’
নাজিমখান ছালামিয়া নূরানী ও হাফিজিয়া মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুর রশিদ বলেন, ‘আমি অনেকদিন ধরেই দেখতেছি, তিনি মানবসেবায় নিয়োজিত রয়েছেন। পাগলদের সবাই অবহেলা করে। কিন্তু কাজল তাদের আপন করে নিয়েছেন।
আরও পড়ুন: আদাবরে যুবদল নেতাকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে জখম
নিজের এ দীর্ঘ পথচলা সম্পর্কে রায়হানুর রহমান কাজল বলেন, ‘আমি এদের আপন মানুষ মনে করি। ওদের আসলে বুদ্ধি কম। আমি আমার মন থেকে এ কাজগুলো করি। তাদের সেবা করলে আমি মনের তৃপ্তি পাই। আমি যতদিন বেঁচে থাকব, ততদিন এই কাজ করব।
এ বিষয়ে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মোছা. ববিতা খাতুন বলেন, সমাজে পাগল বা মানসিক ভারসাম্যহীন ও অপ্রকৃতিস্থ মানুষদের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের সেবা করা পৃথিবীর অন্যতম সেরা ও মহান কাজ। সমাজে যখন বেশিরভাগ মানুষ তাদের এড়িয়ে চলে বা অবহেলা করে, তখন যারা তাদের পরম মমতায় আগলে রাখেন তারা এ সমাজের পরম বন্ধু।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন