০৭:৪৬ এম
জামালপুর শহর থেকে ৪৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত দেওয়ানগঞ্জের মানুষের একমাত্র সরকারি চিকিৎসাসেবার ভরসা হলো দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স।
এই উপজেলার আটটি ইউনিয়ন, একটি পৌরসভা, এবং পার্শ্ববর্তী ইসলামপুর, বকশীগঞ্জ ও কুড়িগ্রামের রাজীবপুর এলাকার বহু মানুষ দীর্ঘদিন ধরে এই হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীল। তবে সেখানে চিকিৎসক ও জনবল সংকট, চিকিৎসকদের অনিয়মিত উপস্থিতি, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাব, পরিচ্ছন্নতা সংকট এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে হাসপাতালটির স্বাস্থ্যসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
আরও পড়ুন: বরগুনার বেতাগীতে বর্ণাঢ্য র্যালি ও আলোচনা সভার মাধ্যমে জাতীয় যুব দিবস উদযাপন
এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন চরাঞ্চলের দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষেরা।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, একসময় হাসপাতালটির বহির্বিভাগে প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৪০০ রোগী চিকিৎসা নিতে আসতেন। কিন্তু বর্তমানে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা না পাওয়ার ভয়ে অনেকেই সরকারি হাসপাতাল এড়িয়ে বেসরকারি ক্লিনিক কিংবা জেলা শহরের হাসপাতালের দিকে ঝুঁকছেন।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ১১টি জুনিয়র কনসালট্যান্ট পদের মধ্যে কর্মরত রয়েছেন মাত্র তিনজন। গাইনি, মেডিসিন, সার্জারি, শিশু, অর্থোপেডিকস ও চক্ষু বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। অন্যদিকে ২০টি মেডিকেল অফিসার পদের বিপরীতে দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র ৯ জন। তাদের মধ্যে কিছু কর্মী প্রশিক্ষণ, উচ্চশিক্ষা বা অন্যান্য কারণে বেশিরভাগ সময় ছুটিতে থাকেন। হাসপাতালের একটি কর্মচারী নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হয়ে বলেন, বর্তমানে হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার মান আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসকের সংখ্যা নেই। কেউ কেউ নিয়মিত কর্মস্থলে উপস্থিত থাকেন না বলেও অভিযোগ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাবে হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটার (ওটি) প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিন থাকলেও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকায় নিয়মিত এই সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না এবং বিশেষ করে নারী ও শিশু রোগীদের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি।
আরও পড়ুন: সিরাজগঞ্জে পাবনা ও রাজবাড়ীর ৬৫ চরমপন্থির আত্মসমর্পণ
সরেজমিনে হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, হাসপাতালে ওয়ার্ড, বারান্দা ও টয়লেট অপরিচ্ছন্ন হয়ে রয়েছে। পাঁচটি পরিচ্ছন্নতাকর্মীর পদের মধ্যে কর্মরত রয়েছেন মাত্র দুজন। ওয়ার্ডবয়ের তিনটি পদও শূন্য রয়েছে। আয়ার দুটি পদও দীর্ঘদিন ধরে খালি রয়েছে। রোগীদের অভিযোগ, দিনে মাত্র একবার চিকিৎসক রাউন্ড দেন। ওষুধ সরবরাহ থাকলেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পরামর্শ ও তদারকি সবসময় সফর করা সম্ভব হচ্ছে না। হাসপাতালের খাবারের মান নিয়েও অভিযোগ রয়েছে।
রোগী ইউসুফ আলী বলেন, নার্সরা আন্তরিকভাবে সেবা দেন। কিন্তু ডাক্তারদের দেখা খুব কম পাওয়া যায়। নার্সিং সুপারভাইজার মনোয়ারা জেসমিন বলেছেন, ৩১টি নার্সের পদের বিপরীতে বর্তমানে ২৫ জন কর্মরত রয়েছেন এবং সীমিত জনবল নিয়েও তারা রোগীদের সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
হাসপাতালের জনবলেও রয়েছে বড় ধরনের সংকট। বর্তমানে তিনটি ওয়ার্ডবয়ের পদ খালি রয়েছে এবং দুটি আয়ার পদও শূন্য। পাঁচ পরিচ্ছন্নতাকর্মীর মধ্যে কর্মরত মাত্র দুজন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, হাসপাতালের আবাসিক কোয়ার্টার দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় অনেক চিকিৎসক সেখানে থাকতে আগ্রহী নন এবং ফলে বদলি হয়ে এলেও অনেকেই অল্প সময়ের মধ্যে অন্যত্র চলে যান। এদিকে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ আহসান হাবীবের নিয়মিত উপস্থিতি নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। ওই অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি ময়মনসিংহ থেকে যাতায়াত করেন। এই বিষয়ে অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে প্রতিবেদক পরপর কয়েকদিন হাসপাতালে গিয়ে তাকে কর্মস্থলে পাননি।
আরও পড়ুন: ‘মেম্বার-চেয়ারম্যান প্রার্থী দিবা, নালা ভেঙে ফেলব’: মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ আহসান হাবীব বলেছেন, চিকিৎসকদের অনুপস্থিতি বা চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ সঠিক নয়। সকলেই নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছেন। আমি আমার অনুপস্থিতির অভিযোগও ভিত্তিহীন।
তিনি আরো বলেন, প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক বিভিন্ন কাজে আমাকে মাসের অনেক দিন হাসপাতালের বাইরে থাকতে হয়। হাসপাতালে চিকিৎসক, ওয়ার্ডবয়, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও অন্যান্য জনবলের সংকট রয়েছে। এসব সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তারা রোগীদের প্রয়োজনীয় সেবা দেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন