০২:০১ পি.এম
নারীর স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন, ক্যান্সার প্রতিরোধ ও চিকিৎসার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জরুরি স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ২৭ কোটি ৫০ লাখ ইউরোর আন্তর্জাতিক অর্থায়ন উদ্যোগের ঘোষণা দিয়েছে।
এই অর্থায়ন কাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংকের (ইআইবি) ২৫ কোটি ইউরোর রেয়াতি ঋণ এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) ২ কোটি ৫০ লাখ ইউরো অনুদান সংগ্রহের উদ্যোগের মাধ্যমে। সরকার এক লাখ কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী এবং অতিরিক্ত ২৫ হাজার পেশাদার মিডওয়াইফ নিয়োগের উদ্যোগও ঘোষণা করেছে।
রবিবার (১১ অক্টোবর) জার্মানির বার্লিনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলন ২০২৬-এর অংশ হিসেবে জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল আয়োজিত ‘দ্য মোমেন্ট ইজ নাউ: আনলকিং নিউ ক্যাপিটাল ফর উইমেনস হেলথ বিয়ন্ড এইড’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের এসব উদ্যোগ তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বাংলাদেশের ফার্স্ট লেডি ও জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা. জুবাইদা রহমান।
আরও পড়ুন: তারেক রহমান: জামায়াত-এনসিপি আমার রাষ্ট্রীয় সম্মান সহ্য করতে পারছে না
তিনি নারীর স্বাস্থ্যসেবায় প্রচলিত বৈদেশিক সাহায্যনির্ভরতার বাইরে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। তার বক্তব্যে কিশোরী ও নারীর স্বাস্থ্যসেবা, মাতৃ ও নবজাতকের সুরক্ষা, ক্যান্সার প্রতিরোধ এবং স্থানীয় পর্যায়ে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পায়।
ডা. জুবাইদা রহমান অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়াতে ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংকের সঙ্গে ২৫ কোটি ইউরোর রেয়াতি ঋণ অর্থায়নের চুক্তির কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল অতিরিক্ত ২ কোটি ৫০ লাখ ইউরো অনুদান সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে এবং সংস্থাটি এ কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় কারিগরি সহযোগিতা দেবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংকের ঋণের ১৫ কোটি ইউরো ব্যয় করা হবে জরায়ুমুখ ও স্তন ক্যান্সার প্রতিরোধ, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণ, রোগনির্ণয় এবং চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা বাড়াতে। এ ক্ষেত্রে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে ক্যান্সার প্রতিরোধ ও পরীক্ষা কার্যক্রম যুক্ত করার পাশাপাশি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও জেলা হাসপাতালের রোগনির্ণয়, রেফারেল এবং চিকিৎসাসেবা উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
অবশিষ্ট ১০ কোটি ইউরো ব্যয় করার পরিকল্পনা রয়েছে জরুরি ও নিবিড় পরিচর্যাসেবা সম্প্রসারণে। এর আওতায় নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ), নবজাতকের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (এনআইসিইউ), হৃদরোগীদের করোনারি কেয়ার ইউনিট (সিসিইউ) এবং অন্যান্য জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা বাড়ানো হবে।
আরও পড়ুন: আদাবরে যুবদল নেতাকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে জখম
এই অর্থায়ন উদ্যোগের মাধ্যমে নারীর স্বাস্থ্যসেবাকে কেবল মাতৃস্বাস্থ্য বা সন্তান জন্মদানের সময়কার চিকিৎসার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে জীবনচক্রভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনার পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে।
ডা. জুবাইদা রহমান অনুষ্ঠানে বলেন, নারীর স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগকে শুধু সামাজিক বা স্বাস্থ্য খাতের ব্যয় হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। এটি মানবসম্পদ উন্নয়ন, অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কল্যাণে একটি কৌশলগত বিনিয়োগ।
তিনি বলেন, ‘নারীর স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ কেবল স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় নয়। এটি মানবসম্পদ, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং আমাদের জাতির ভবিষ্যতের জন্য একটি বিনিয়োগ।’
বাংলাদেশে নারীশিক্ষা, পরিবার পরিকল্পনা ও নারীর ক্ষমতায়নের ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা তুলে ধরে তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অবদানের কথা স্মরণ করেন।
আরও পড়ুন: নিম্নতম মজুরি বোর্ড অচিরেই গঠন হবে: শ্রমমন্ত্রী
ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, গ্রামীণ উন্নয়ন, পরিবার পরিকল্পনা ও জনগণের অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে জিয়াউর রহমান সামাজিক উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে বেগম খালেদা জিয়া নারীশিক্ষা ও ক্ষমতায়নে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। বিশেষ করে মাধ্যমিক পর্যায়ে মেয়েদের উপবৃত্তিসহ বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক কিশোরীর শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারিত হয়।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার এই ধারাবাহিকতা এগিয়ে নিয়ে নারীর স্বাস্থ্যখাতে নতুন প্রজন্মের রূপান্তরমূলক বিনিয়োগ বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, ‘আমাদের সরকার একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে—কিশোরী ও নারীরাই হবে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা রূপান্তরের কেন্দ্রবিন্দু।’
তিনি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করতে এক লাখ কমিউনিটি হেলথ অ্যান্ড ওয়েলবিয়িং কর্মী এবং অতিরিক্ত ২৫ হাজার পেশাদার মিডওয়াইফ নিয়োগের উদ্যোগের কথা জানান।
আরও পড়ুন: শেরপুরে বাসের চাপায় সিএনজি যাত্রী নিহত, আহত ৪
এই উদ্যোগের লক্ষ্য কমিউনিটি পর্যায়ে প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, মাতৃ ও নবজাতকের স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন, নিরাপদ ও স্বাভাবিক প্রসব উৎসাহিত করা এবং প্রতিরোধযোগ্য মাতৃ ও নবজাতকের মৃত্যু কমিয়ে আনা।
সরকার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে সমন্বিত মাতৃ ও নবজাতক স্বাস্থ্যসেবার নির্ভরযোগ্য কেন্দ্রে পরিণত করতে চায়। এতে স্বাভাবিক প্রসবের পাশাপাশি জরুরি প্রসূতি ও নবজাতকের চিকিৎসাসেবাও নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, ‘সমন্বিত ও অপরিহার্য মাতৃ ও নবজাতক স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার জন্য কোনো নারীকে যেন তার উপজেলা হাসপাতালের বাইরে যেতে না হয়—এটাই আমাদের লক্ষ্য।’
জটিল পরিস্থিতিতে বিশেষায়িত চিকিৎসার প্রয়োজন হলে কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা রাখার ওপরও গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, সাধারণ ও অপরিহার্য মাতৃস্বাস্থ্যসেবা নারীদের নিজ নিজ এলাকার কাছাকাছি নিশ্চিত করা জরুরি।
আরও পড়ুন: কোনো দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে পেলে কতদিন ক্ষমতায় থাকবেন নেতানিয়াহু?
তিনি বলেন, এ উদ্যোগ শুধু স্বাস্থ্য অবকাঠামো সম্প্রসারণের বিষয় নয়; এর সঙ্গে সমতা, মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নও জড়িত।
ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, সরকারের পরিকল্পনা শুধু মাতৃস্বাস্থ্যের উন্নয়নে সীমাবদ্ধ নয়। কিশোরীদের পুষ্টি, রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধ, যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা, মাতৃ ও নবজাতকের স্বাস্থ্যসেবা এবং জরায়ুমুখ ও স্তন ক্যান্সার প্রতিরোধ ও চিকিৎসাকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়া হবে।
এ ক্ষেত্রে নারীর জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণ ও চিকিৎসার সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি জরুরি পরিস্থিতিতে জীবনরক্ষাকারী সেবা পাওয়ার সক্ষমতা বৃদ্ধিও পরিকল্পনার অংশ।
আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ও কারিগরি সহযোগিতাকে কাজে লাগিয়ে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার বিদ্যমান সক্ষমতা বাড়ানো এবং স্থানীয় পর্যায়ে সেবার পরিধি সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে অনুষ্ঠানে।
আরও পড়ুন: কুড়িগ্রামে দুই কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে চার খাদ্য কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুদকের মামলা
জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সংস্থাটির চিফ অব স্টাফ ড. নিগিনা মুনতিয়ান। মূল বক্তব্য দেন জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল ও ইউএনএফপিএর নির্বাহী পরিচালক ড. দিয়েন কেইতা।
আলোচনায় অংশ নেন—বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. এস. এম. জিয়াউদ্দিন হায়দার, জার্মানির ফেডারেল অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের পার্লামেন্টারি স্টেট সেক্রেটারি ড. বারবেল কফলার, ঘানার স্বাস্থ্যমন্ত্রী কোয়াবেনা মিন্টাহ আকানদোহ এবং ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট মারেক মোরা।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন উপস্থিত ছিলেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনের এ আয়োজনে নারীর স্বাস্থ্য খাতে নতুন অর্থায়ন, আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদারের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। বাংলাদেশের উপস্থাপিত উদ্যোগে ক্যান্সার প্রতিরোধ ও চিকিৎসা, জরুরি স্বাস্থ্যসেবা এবং কমিউনিটি পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণকে একই কাঠামোর আওতায় আনার পরিকল্পনা কথাও তুলে ধরা হয়েছে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন