মঙ্গলবার, ১ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ইং
১২:৩৬ পি.এম
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী জানিয়েছেন, দেশে গ্যাসের সরবরাহ সপ্তাহখানেকের মধ্যেই স্বাভাবিক হয়ে যাবে।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) সকালে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করার পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এই তথ্য জানান।
তিনি উল্লেখ করেন, দেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতি একটি বৈশ্বিক সংকটের ফল। তবে সরকার এই সংকটের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।
গ্যাসের পরিস্থিতি সম্পর্কে রিজভী বলেন, তিনি আশা প্রকাশ করেন যে আগামী সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে। তিনি আরও জানান, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে নির্ধারিত বাজেটের পাশাপাশি বিপুল অর্থ ব্যয় করে গ্যাস সংকট সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর প্রসঙ্গে রিজভী বলেন, জিয়াউর রহমান দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি খালেদা জিয়ার আন্দোলন ও সংগ্রামের প্রসঙ্গ তুলে বলেন, খালেদা জিয়া বহু নির্যাতন সহ্য করেছেন এবং তার বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্র করা হয়েছে। তিনি গণতন্ত্রের মা এবং গণতন্ত্রের প্রতীক।
রিজভী আরও বলেন, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি আজ সুসংগঠিত। তিনি উল্লেখ করেন যে সংকট আসবে, তবে তা মোকাবিলা করতে হবে।
তিনি বলেন, গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়ে খালেদা জিয়া তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত বিএনপির নেতা-কর্মীদের সংগঠিত করেছেন এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তার নেতৃত্বে দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রাম একসময় প্রবল গণআন্দোলনে রূপ নেয়।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বলেন, তারেক রহমান জনগণের কাছে যে অঙ্গীকারগুলো করেছেন, সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য কাজ করছেন। ফ্যামিলি কার্ড এবং ইমাম-মুয়াজ্জিনদের ভাতা সহ বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, মহেশখালীতে থাকা টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটি ধরা পড়েছে এবং সেই ত্রুটি সমাধানের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এসব সংকট মোকাবিলা করেই দেশকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার কাজ অব্যাহত থাকবে।
রিজভী বলেন, গণতান্ত্রিক চেতনা, জনগণের সামাজিক সুরক্ষা এবং দেশের উন্নয়ন ও উৎপাদনের যে অঙ্গীকার ৩১ দফায় দেওয়া হয়েছে, নির্বাচনী ইশতেহারে যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে এবং খালেদা জিয়া যে কর্মসূচি দিয়ে গেছেন, সেগুলো বাস্তবায়নের কাজ চলছে। ভবিষ্যতে এসব কর্মসূচি আরও বিস্তৃতভাবে বাস্তবায়ন করা হবে।
দল ও সরকারের সম্পর্কের বিষয়ে রিজভী বলেন, দল ও সরকার দুটি আলাদা সত্তা হলেও তারা একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে।
তিনি বলেন, বিএনপি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করেছে। তাই সরকারের দায়িত্বে থাকা অধিকাংশ ব্যক্তি বিএনপির নেতা হওয়াটাই স্বাভাবিক। জনগণ যখন একটি দলকে ভোট দিয়ে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব দেয়, তখন সেই দলের যোগ্য নেতা-কর্মীরাই রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করবেন।
রিজভী বলেন, তৃণমূলের সদস্য থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত বিএনপির নেতাকর্মীরা সরকারের জনকল্যাণমূলক ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট কর্মসূচি সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করবেন। এতে দল ও সরকারের মধ্যে কোনো অসঙ্গতি বা বৈসাদৃশ্য নেই।
বিএনপির সামনে এখন প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা উল্লেখ করে তিনি বলেন, যারা দলে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করছেন, তারা দলের দায়িত্ব পালন করবেন। একই সঙ্গে সরকারের যেসব মন্ত্রী বিএনপির নেতা, তারাও মন্ত্রিত্বের পাশাপাশি দলের ওপর অর্পিত দায়িত্ব তাদের পদ ও সাংগঠনিক অবস্থান অনুযায়ী পালন করবেন। এ নিয়ে বিভ্রান্তির কোনো সুযোগ নেই।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় বেতন স্কেল অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী, প্রথম থেকে ১১তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন বাড়ছে ১০০ শতাংশ। আর ১২ থেকে ২০তম গ্রেডে প্রারম্ভিক মূল বেতন বাড়ছে ১১৫ থেকে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত। তবে নতুন বেতনের পুরো সুবিধা একসঙ্গে পাওয়া যাবে না। চার ধাপে ধাপে এটি বাস্তবায়ন করা হবে।
মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত প্রস্তাব অনুযায়ী, নতুন পে-স্কেলে ২০তম গ্রেডের সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা হবে। অন্যদিকে প্রথম গ্রেডের সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়াবে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা।
নতুন বেতন স্কেল গত জুলাই থেকে কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও বর্ধিত মূল বেতন ও ভাতার সুবিধা নির্দিষ্ট সময় অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে দেওয়া হবে।
নতুন পে-স্কেলের আওতায় প্রায় ২৪ লাখ সরকারি চাকরিজীবী এবং ৯ লাখ পেনশনভোগী সরাসরি উপকৃত হবেন। এ স্কেল বাস্তবায়নে সরকারি কোষাগার থেকে বছরে অতিরিক্ত ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা ব্যয় হবে।
সরকারের ওপর আর্থিক চাপ কমাতে নতুন বেতন স্কেল চার ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
প্রথম থেকে নবম গ্রেডের চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে ২০২৬ সালের ১ জুলাই প্রথম ধাপে বর্ধিত মূল বেতনের ৪০ শতাংশ যুক্ত হবে। এরপর ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে দ্বিতীয় ধাপে আরও ৩০ শতাংশ এবং একই বছরের জুলাইয়ে তৃতীয় ধাপে বাকি ৩০ শতাংশ যুক্ত হবে। এতে বর্ধিত মূল বেতনের শতভাগ কার্যকর হবে।
সবশেষে ২০২৮ সালের জানুয়ারি থেকে নতুন মূল বেতনের ভিত্তিতে বাড়িভাড়াসহ অন্যান্য ভাতা কার্যকর হবে।
অন্যদিকে, দশম থেকে ২০তম গ্রেডের চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে প্রথম ধাপেই তুলনামূলক বেশি বেতন যুক্ত হবে। ২০২৬ সালের ১ জুলাই বর্ধিত মূল বেতনের ৫০ শতাংশ যুক্ত হবে। এরপর ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে ২৫ শতাংশ এবং একই বছরের জুলাইয়ে বাকি ২৫ শতাংশ যুক্ত হবে। এ ক্ষেত্রেও ২০২৮ সালের জানুয়ারি থেকে নতুন মূল বেতনের ভিত্তিতে বাড়িভাড়াসহ অন্যান্য ভাতা কার্যকর হবে।
২০১৫ সালের পে-স্কেল অনুযায়ী নবম গ্রেডে চাকরিতে যোগ দেওয়া একজন কর্মকর্তার প্রারম্ভিক মূল বেতন ২২ হাজার টাকা। নতুন পে-স্কেলে ১০০ শতাংশ বৃদ্ধির ফলে তার প্রারম্ভিক মূল বেতন হবে ৪৪ হাজার টাকা।
তবে বর্ধিত ২২ হাজার টাকা একবারে যোগ হবে না। প্রথম থেকে নবম গ্রেডের আওতায় থাকায় তা তিন ধাপে যুক্ত হবে।
২০২৬ সালের ১ জুলাই প্রথম ধাপে বর্ধিত ২২ হাজার টাকার ৪০ শতাংশ, অর্থাৎ ৮ হাজার ৮০০ টাকা বর্তমান মূল বেতনের সঙ্গে যুক্ত হবে। এরপর ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে দ্বিতীয় ধাপে আরও ৩০ শতাংশ বা ৬ হাজার ৬০০ টাকা এবং একই বছরের জুলাইয়ে তৃতীয় ধাপে বাকি ৩০ শতাংশ বা আরও ৬ হাজার ৬০০ টাকা যুক্ত হবে।
তিন ধাপ শেষে ওই কর্মকর্তার মূল বেতন দাঁড়াবে ৪৪ হাজার টাকা। এরপর ২০২৮ সালের জানুয়ারি থেকে ৪৪ হাজার টাকা মূল বেতনের ভিত্তিতে বাড়িভাড়াসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক ভাতা নির্ধারিত হবে।
তবে বাস্তবে একজন সরকারি চাকরিজীবীর বেতন শুধু নতুন পে-স্কেলের প্রারম্ভিক মূল বেতনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। সরকারি চাকরির নিয়ম অনুযায়ী, প্রতি বছর মূল বেতনের ৫ শতাংশ হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট যুক্ত হয়। ফলে চাকরির মেয়াদ ও প্রাপ্ত ইনক্রিমেন্ট অনুযায়ী একজন চাকরিজীবীর প্রকৃত মূল বেতন প্রারম্ভিক বেতনের চেয়ে বেশি হবে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর একটি প্রতিনিধিদল নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সঙ্গে বৈঠক করেছে।
বৈঠকটি মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে শুরু হয়।
বৈঠকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন, নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ ও আনোয়ারুল ইসলাম সরকার এবং ইসি সচিব আখতার আহমেদ উপস্থিত ছিলেন।
অন্যদিকে, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের প্রতিনিধিদল বৈঠকে অংশগ্রহণ করছে।
এতে ধারণা করা হচ্ছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনসহ বিভিন্ন সমসাময়িক বিষয় নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
নড়াইলে এক কেজি গাঁজা ও ইয়াবাসহ জামাই-শাশুড়ি গ্রেফতার
শ্বশুর-শাশুড়ি ও জামাইয়ের মাদকসম্রাজ্য, প্রায় ৬ বছর ধরে করছেন মাদক বেচাকেনা
নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার পাঁচুড়িয়া গ্রাম থেকে এক কেজি গাঁজা ও ১০১ পিস ইয়াবাসহ জামাই ও শাশুড়িকে গ্রেফতার করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর (ডিএনসি)। সোমবার (৩১ আগস্ট) বিকেলে পাঁচুড়িয়া গ্রামের শ্বশুরবাড়ি থেকে মাদক কারবারি জামাই এবং শাশুড়িকে আটক করা হয়। আজ মঙ্গলবার আদালতের মাধ্যমে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে শাশুড়ি সীমা বেগম (৩৮) এবং জামাই রাসেল শেখ (২১) রয়েছেন। সীমা বেগম পাঁচুড়িয়া গ্রামের ইউসুফ শেখের স্ত্রী এবং জামাই রাসেল শেখ একই উপজেলার নোয়াপাড়া গ্রামের আবুল কালাম আজাদের পুত্র।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর নড়াইলের উপপরিচালক গোলক মজুমদার জানিয়েছেন, গোপন তথ্যের ভিত্তিতে সোমবার বিকেলে নড়াইলের পাঁচুড়িয়া গ্রামের ইউসুফ শেখের বাড়িতে অভিযান পরিচালনা করা হয়। তাদের বসতঘরে তল্লাশি চালিয়ে এক কেজি গাঁজা ও ১০১ পিস ইয়াবাসহ সীমা বেগম এবং তার জামাই রাসেল শেখকে আটক করা হয়। পরিদর্শক আব্দুল মান্নান এদের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে লোহাগড়া থানায় মামলা দায়ের করেছেন। উল্লেখ্য, প্রায় দুই মাস আগে সীমার স্বামী ইউসুফ শেখ মাদক মামলায় কারাগারে গেছেন।
ডিএনসি’র উপপরিচালক গোলক মজুমদার আরও জানান, ইউসুফ শেখ লোহাগড়া উপজেলার একজন পরিচিত মাদক কারবারি। স্বামী কারাগারে থাকায় শাশুড়ি ও জামাই মিলে মাদক ব্যবসা পরিচালনা করছেন। এই তিনজন মিলে প্রায় ছয় বছর ধরে মাদক বেচাকেনার সঙ্গে জড়িত। মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে যাদের নাম চিরকাল শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হবে, তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন জেনারেল মুহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানী (এম এ জি ওসমানী)। বাঙালির কাছে তিনি বঙ্গবীর নামে পরিচিত। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে বিচ্ছিন্ন প্রতিরোধকে একটি সুসংগঠিত সামরিক শক্তিতে রূপ দিতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব প্রদান করেন। আজ ১ সেপ্টেম্বর মহান মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিবাহিনী ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান সেনাপতি জেনারেল এম এ জি ওসমানীর ১০৮তম জন্মবার্ষিকী উদযাপিত হচ্ছে।
১৯১৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর সুনামগঞ্জে জন্মগ্রহণকারী ওসমানী ছিলেন অসাধারণ মেধাবী ও দক্ষ সামরিক কর্মকর্তা। ১৯৩৪ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় তিনি সমগ্র ব্রিটিশ ভারতে প্রথম স্থান অর্জন করেন। পরবর্তীতে আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৩৯ সালে ব্রিটিশ-ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে তিনি তাঁর সামরিক জীবন শুরু করেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি বার্মা রণাঙ্গনে দায়িত্ব পালন করেন। ভারত ভাগের পর পাকিস্তান সেনাবাহিনীতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। সামরিক জীবনে তিনি জেনারেল স্টাফ ও সামরিক পরিচালনাসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেন। ১৯৬৭ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেওয়ার পর রাজনীতিতে যোগ দেন এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।
মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই সামরিক নেতৃত্ব
১৯৭১ সালের মার্চে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা শুরু হলে বাঙালির প্রতিরোধ সশস্ত্র যুদ্ধে রূপ নেয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিচ্ছিন্নভাবে প্রতিরোধ গড়ে উঠলেও একটি কেন্দ্রীয় সামরিক নেতৃত্বের প্রয়োজন ছিল।
ওসমানী সেই দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন। এপ্রিল মাসে তেলিয়াপাড়ায় মুক্তিযুদ্ধের ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তাদের বৈঠকে তাকে মুক্তিবাহিনীর সর্বময় সামরিক নেতৃত্ব দেওয়া হয়। পরে মুজিবনগর সরকার তাঁকে বাংলাদেশ সশস্ত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি হিসেবে দায়িত্ব দেয়।
তার নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের সামরিক কাঠামো সুসংগঠিত হয়। যুদ্ধ পরিচালনার সুবিধার্থে বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয়। সেক্টর ও সাব-সেক্টরগুলোর মধ্যে সমন্বয়, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ, অস্ত্র সরবরাহ এবং গেরিলা অভিযান পরিচালনায় তার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
ওসমানী বুঝতে পেরেছিলেন, পাকিস্তানি বাহিনীর মতো শক্তিশালী ও সুসজ্জিত সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে শুধু প্রচলিত যুদ্ধ করে টিকে থাকা কঠিন। তাই গেরিলা যুদ্ধের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। পাকিস্তানি বাহিনীর যোগাযোগব্যবস্থা, সরবরাহব্যবস্থা ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় আঘাত করার কৌশল গ্রহণ করা হয়।
মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে নৌ-কমান্ডো বাহিনী এবং সীমিত বিমান সক্ষমতা গড়ে তোলার উদ্যোগও নেওয়া হয়। ফলে স্থলযুদ্ধের পাশাপাশি নদীপথ ও আকাশপথেও অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা তৈরি হয়।
বিজয়ের শেষ প্রান্তে
নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর পাকিস্তানি বাহিনী ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ে। মুক্তিবাহিনীর প্রতিরোধের পাশাপাশি ডিসেম্বরের শুরুতে ভারতের সরাসরি সামরিক অংশগ্রহণ যুদ্ধের গতি আরও দ্রুত বদলে দেয়। ভারত ৩ ডিসেম্বর পাকিস্তানের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ১৬ ডিসেম্বরের বিজয়ের মাত্র ১৩ দিন আগে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ শুরু হয়।
এরপর ভারতীয় ও বাংলাদেশ বাহিনী পূর্বাঞ্চলে যৌথভাবে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযান চালায়। ঢাকার চারপাশে পাকিস্তানি বাহিনী কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। অবশেষে ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ড আত্মসমর্পণ করে।
আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে ছিলেন না ওসমানী
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার রমনা রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। পাকিস্তানের পক্ষে লেফটেন্যান্ট জেনারেল এ এ কে নিয়াজি এবং বিজয়ী যৌথ বাহিনীর পক্ষে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করেন। দলিলেই অরোরাকে ভারতীয় ও বাংলাদেশ বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় যৌথ কমান্ডের প্রধান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।
কিন্তু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল এম এ জি ওসমানী সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। তার অনুপস্থিতি আজও ইতিহাসের একটি আলোচিত ও বিতর্কিত অধ্যায়।
ভারতীয় সেনাবাহিনীর তৎকালীন কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল জে এফ আর জ্যাকব পরে দাবি করেন, ওসমানীকে বহনকারী হেলিকপ্টার গুলিবর্ষণের মুখে পড়েছিল। এতে হেলিকপ্টারটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তিনি সময়মতো ঢাকায় পৌঁছাতে পারেননি। জ্যাকবের ভাষ্য অনুযায়ী, এ কারণেই ওসমানী আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে পারেননি।
তবে এ ঘটনাকে ঘিরে ভিন্ন মতও রয়েছে। কিছু গবেষণা ও লেখায় দাবি করা হয়েছে, ওসমানীর উপস্থিতি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ভারতীয় সামরিক নেতৃত্বের পক্ষ থেকে যথেষ্ট উদ্যোগ নেওয়া হয়নি এবং তাকে অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে না দেওয়ার পেছনে ভারতের পরিকল্পিত সিদ্ধান্ত থাকতে পারে। বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশে জনমনে দীর্ঘদিন ধরেই আক্ষেপ ও ক্ষোভ রয়েছে।
তবে নিশ্চিত ইতিহাস হলো—আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে ওসমানী ছিলেন না এবং বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ সশস্ত্রবাহিনীর উপপ্রধান এ কে খন্দকার অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
আত্মসমর্পণ কি শুধু ভারতের কাছে?
এখানেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। আত্মসমর্পণের দলিলে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ড বাংলাদেশে অবস্থানরত সব পাকিস্তানি স্থল, নৌ ও বিমান বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট সশস্ত্র বাহিনীকে লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে আত্মসমর্পণের কথা বলা হয়েছে। একই দলিলে অরোরাকে ভারতীয় ও বাংলাদেশ বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় যৌথ কমান্ডের প্রধান হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
অর্থাৎ ১৬ ডিসেম্বরের আত্মসমর্পণ ছিল ভারতীয় ও বাংলাদেশ বাহিনীর যৌথ কমান্ডের কাছে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ। তবে অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক আয়োজন ও নেতৃত্বে ভারতীয় সামরিক কর্মকর্তাদের ভূমিকা ছিল প্রধান। লেফটেন্যান্ট জেনারেল অরোরাই বিজয়ী পক্ষের হয়ে দলিলে স্বাক্ষর করেন।
এ কারণেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি ওসমানীর অনুপস্থিতি নিয়ে পরবর্তী সময়ে নানা প্রশ্ন ও আক্ষেপ তৈরি হয়। স্বাধীনতার জন্য নয় মাস যুদ্ধ করা বাংলাদেশি মুক্তিযোদ্ধাদের প্রধান সামরিক নেতার উপস্থিতি বিজয়ের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তে থাকলে বাংলাদেশের সামরিক নেতৃত্বের প্রতীকী উপস্থিতি আরও স্পষ্ট হতো—এমন মতও রয়েছে।
বঙ্গবীর হয়ে ওঠার গল্প
ওসমানীর সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব ছিল একটি সদ্যোজাত জাতির বিচ্ছিন্ন প্রতিরোধকে একটি সুসংগঠিত সামরিক কাঠামোর অধীনে নিয়ে আসা। তিনি শুধু যুদ্ধের নির্দেশদাতা ছিলেন না; মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ, যুদ্ধক্ষেত্রের সমন্বয়, সেক্টরভিত্তিক অভিযান এবং গেরিলা কৌশলকে কার্যকর করার ক্ষেত্রেও নেতৃত্ব দিয়েছেন।
একদিকে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধ, অন্যদিকে গেরিলা আক্রমণ—দুই কৌশলের সমন্বয় ঘটিয়ে মুক্তিযুদ্ধকে এগিয়ে নেওয়া হয়। তার নেতৃত্বেই মুক্তিবাহিনী ধীরে ধীরে একটি সংগঠিত সামরিক শক্তিতে পরিণত হয়।
স্বাধীনতার পর ১৯৭১ সালের ২৬ ডিসেম্বর ওসমানীকে বাংলাদেশ সশস্ত্রবাহিনীর জেনারেল পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। ১৯৭২ সালে সামরিক দায়িত্ব থেকে অবসর নিয়ে তিনি সরকারের মন্ত্রিসভায় যোগ দেন। পরে রাজনীতিতেও সক্রিয় ছিলেন।
১৯৮৪ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি লন্ডনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন এই মহান সামরিক নেতা। পরে পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় সিলেটে হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারসংলগ্ন কবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হয়।
আজও বাংলাদেশের সামরিক ইতিহাসে তার নাম উচ্চারিত হয় গভীর শ্রদ্ধায়। একজন মেধাবী তরুণ থেকে ব্রিটিশ-ভারতীয় ও পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা, সেখান থেকে মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি—জেনারেল এম এ জি ওসমানীর জীবন বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে।
তিনি ছিলেন সেই ‘বঙ্গবীর’, যিনি অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করা লাখো মুক্তিযোদ্ধাকে একটি সামরিক কাঠামোর অধীনে সংগঠিত করেছিলেন। তার নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি—একটি স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম।
সূত্র: বাসস, উইকিসংকলন, মুক্তিযুদ্ধ ই আর্কাইভ
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ