আহমেদ আক্তার রানা কুলাউড়া প্রতিনিধি
০৬:৫৮ পি.এম
মৌলভীবাজারের কুলাউড়া সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে ভারতে যাওয়ার চেষ্টাকালে আটজনকে গ্রেপ্তার করেছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)-৯। গ্রেপ্তারদের মধ্যে দুজনের বিরুদ্ধে অপর ছয়জনকে সীমান্ত পারাপারে সহযোগিতা করার অভিযোগ রয়েছে।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন—কুলাউড়া উপজেলার সঞ্জরপুর গ্রামের মো. হারিছ আলী (৩৫) ও মো. আবুল আলী (৪৫)। এছাড়া গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার আমিনুর শরীফ (৪২), মো. মফিজুর শিকদার (৪৩), কামরুল মোল্যা (৪৬), ইয়ামিন মোল্যা (৪৫) ও সুখলাল বিশ্বাস (৪১) এবং গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার মো. জিহাদ সরদার (৪০)।
বুধবার (৪ নভেম্বর) দুপুরে বিষয়টি নিশ্চিত করেন এসআরবি-৯-এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও মিডিয়া অফিসার কে এম শহিদুল ইসলাম সোহাগ।
এসআরবি-৯ সূত্রে জানা গেছে, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গত সোমবার (২ নভেম্বর) কুলাউড়া উপজেলার ১১ নম্বর শরীফপুর ইউনিয়নের সঞ্জরপুর এলাকায় একটি বসতঘরে অভিযান চালানো হয়। এ সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি টের পেয়ে পালানোর চেষ্টা করলে আটজনকে আটক করা হয়।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, গ্রেপ্তার হারিছ আলী ও আবুল আলী অপর ছয়জনকে কুলাউড়া সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে ভারতে যাওয়ার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছে ভারতে যাওয়ার বৈধ পাসপোর্ট, ভিসা কিংবা প্রয়োজনীয় ভ্রমণসংক্রান্ত কাগজপত্র পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে এসআরবি-৯।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
বরিশাল মহানগরীর ৩০টি খাল এবং ১০টি পুকুর পুণঃখনন ও সংস্কারসহ ১৯টি ঘাটলা নির্মাণের উদ্যোগে সৌন্দর্য বর্ধন করে পরিপূর্ণ প্রাকৃতিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে ৭৩০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন করা হয়েছে। এই প্রকল্পের অনুমোদনে নগরবাসীর মধ্যে আনন্দের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। বর্তমান সরকারের গত প্রায় ৯ মাসে বরিশালবাসীর জন্য এটি প্রথম কোন সুসংবাদ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল। বরিশালের সিটি প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন প্রকল্পটির অনুমোদনে তারেক রহমানের প্রতি বরিশাল নগরবাসীর পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং ‘প্রাচ্যের ভেনিস বরিশাল’র ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারে প্রধানমন্ত্রীর এ উদ্যোগকে স্মরণ করেন। তিনি প্রকল্পটির কাজ সমাপ্তির পর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনে সরকার প্রধানকে আগাম আমন্ত্রণ জানিয়ে রেখেছেন।
বুধবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে জাতীয় অর্থনৈতিক কমিটির নির্বাহী কমিটি-একনেক’র সভায় ‘বরিশাল সিটি করপোরেশন’র বিভিন্ন খাল সমুহের পাড় সংরক্ষণসহ পুনঃরুদ্ধার ও পুনঃখনন প্রকল্প’টির চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রকল্পের শর্ত অনুযায়ী প্রায় ৭৩০ কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পের ৯০ ভাগ অর্থায়ন করবে সরকার। অবশিষ্ট ৭৩ কোটি টাকা সিটি করপোরেশনের নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যয় করতে হবে বলে জানা গেছে।
এই প্রকল্পের আওতায় বরিশাল মহানগরীর ৩০টি খাল খনন ও পুনঃখননের পাশাপাশি সৌন্দর্য বর্ধনসহ পূর্ণাঙ্গ প্রাকৃতিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পের আওতায় ১০টি খালের দুপাশে ওয়াকওয়ে নির্মাণ, বৃক্ষ রোপণসহ নান্দনিক বিজলী বাতি স্থাপন করা হবে। প্রতিটি খালে পাশের কীর্তনখোলা নদী থেকে জোয়ার ভাটার পানি চলাচল ও পয়ঃ নিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার কথাও রয়েছে।
একই প্রকল্পের আওতায় নগরীর ১০টি পুকুর ও লেক পুনঃখনন এবং সৌন্দর্য বর্ধনের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব পুকুর ও লেকের প্রয়োজনীয় সংস্কারসহ পাড় সংরক্ষণ এবং বৃক্ষরোপণসহ টেকসই ও নান্দনিক বিজলী বাতি স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে, প্রকল্পের আওতায় সম্ভাব্য স্থানগুলোতে বিজলীবাতির পরিবর্তে সৌরবাতি স্থাপনের বিষয়টিও বিবেচনা করা হবে বলে দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে।
প্রকল্পের আওতায় নগরীর নবগ্রাম রোড-চৌমহনী লেক ও গোল পুকুর ছাড়াও ত্রিশ গোডাউন সংলগ্ন বধ্যভূমির পাশের পুকুর, গড়িয়ার পারের ত্রিকোণ পুকুর ও আমনতগঞ্জ পুকুরসহ সংস্কারবিহীন জনগুরুত্বপূর্ণ পুকুরগুলো রয়েছে।
এছাড়া, প্রকল্পের আওতায় নগরীর বিশেষ জনগুরুত্বপূর্ণ স্থানের পুকুরগুলোতে ১৯টি ঘাটলাও নির্মিত হবে। বাংলার অতীত ঐতিহ্যের সাথে মিল রেখে গণমুখী ব্যবহারের লক্ষ্যে এসব বিশেষ বৈশিষ্টমণ্ডিত ঘাটলা নির্মাণের কথা জানিয়েছেন সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী মোঃ হুমায়ুন কবির।
এছাড়া, একই প্রকল্পের আওতায় নগরীর ৫৭ কিলোমিটার ড্রেন নির্মাণ ও পুনঃনির্মাণসহ পরিপূর্ণ সংস্কার করা হবে বলেও জানা গেছে। এসব ড্রেন সংস্কার ও পরিচালনক্ষম হলে বরিশাল মহানগরীর পয়ঃনিস্কাশন ব্যবস্থায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে বলে আশা করছেন নগর পরিকল্পনাবিদসহ।
এটি বরিশাল মহানগরীর জন্য সাম্প্রতিককালে একটি অন্যতম বৃহৎ প্রকল্প। ২০০২ সালে সিটি করপোরেশন গঠিত হওয়ার পর ২০০৫-০৬ অর্থ বছরে এ মহানগরীর অবকাঠামো উন্নয়নে ২শ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের পর ২০২৩ সালের নভেম্বরে ৭৮০ কোটি টাকার অপর একটি প্রকল্প অনুমোদন করা হয়। বর্তমান সরকারের আমলে নতুন এ প্রকল্পটি নগরবাসীর মনে আশার আলো দেখাচ্ছে।
এ বিষয়ে নগর প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন বুধবার বিকেল ইনকিলাব’কে জানান, আমরা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে কৃতজ্ঞ প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য। তিনি বলেন, শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বরিশালকে তার নিজের জেলা মনে করতেন। তার যোগ্য উত্তরসূরি বেগম খালেদা জিয়া বরিশালের উন্নয়নে পরিপূর্ণ আন্তরিক ছিলেন। তার হাত দিয়েই বরিশাল বিভাগ, বরিশাল সিটি করপোরেশন, বিমান বন্দরসহ সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছিল। আজ জিয়া পরিবারের আরেক সুযোগ্য উত্তরসূরি বরিশালের উন্নয়নে তার আন্তরিকতার ছাপ রাখলেন। বরিশাল মহানগরীর উন্নয়নে প্রকল্পটি অনুমোদনে নগর প্রশাসক প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে মহানগরীসহ সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নে বর্তমান সরকার আমলে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সফরসূচি অনুযায়ী, বুধবার সন্ধ্যায় বিভাগীয় কমিশনারের সম্মেলন কক্ষে রাজশাহী বিভাগের আট জেলার কৃষি উৎপাদন, সার, বীজ, সেচ, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত নিয়ে অংশীজনদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন মন্ত্রী।
বৃহস্পতিবার রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের সম্ভাবনাময় কৃষি উৎপাদন এলাকা পরিদর্শন এবং স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন তিনি। একই দিন সন্ধ্যায় রাজশাহী সার্কিট হাউসে বিভাগের আম, লিচু, কাঁচা মরিচ ও টমেটো চাষিদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় অংশ নেবেন।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সকাল ১১টা ২০ মিনিটে তাঁর ঢাকার উদ্দেশে রাজশাহী ত্যাগ করার কথা রয়েছে।#
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
চীনের রাজনীতিতে শি জিনপিংয়ের উত্থান কেবল একজন নেতার দীর্ঘমেয়াদী ক্ষমতায় থাকার ঘটনা নয়; এটি দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর একটি বিশাল পরিবর্তনেরও প্রতিফলন। ২০১২ সালে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে তিনি ধীরে ধীরে দল, রাষ্ট্র, সামরিক বাহিনী, অর্থনীতি এবং নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপর নিজের কর্তৃত্ব বৃদ্ধি করেছেন।
২০১৮ সালে প্রেসিডেন্টের মেয়াদসীমা তুলে দেওয়া, ২০২২ সালে তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসা এবং দলীয় সংবিধানে তার রাজনৈতিক দর্শন অন্তর্ভুক্ত করা—এসব পদক্ষেপ শি জিনপিংয়ের ক্ষমতা সংহত করার গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
তবে শি জিনপিংয়ের শক্তি কেবল ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা বা কঠোর শাসনের ওপর নির্ভরশীল নয়। এর পেছনে রয়েছে দলীয় কাঠামো পুনর্গঠন, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ, দুর্নীতিবিরোধী অভিযান, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, সামরিক সংস্কার এবং আন্তর্জাতিক প্রভাব বিস্তারের সমন্বিত কৌশল।
ক্ষমতা সংহত করার দশ কৌশল
১. কমিউনিস্ট পার্টিকে রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় পরিণত করা
শি জিনপিংয়ের অন্যতম প্রধান কৌশল হলো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর কমিউনিস্ট পার্টির কর্তৃত্ব আরো শক্তিশালী করা। চীনে আগে থেকেই দল ও রাষ্ট্রের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল। তবে শি সেই সম্পর্ককে আরো কেন্দ্রীভূত করেছেন। অর্থনীতি, নিরাপত্তা, প্রযুক্তি, শিক্ষা, প্রশাসন ও সামাজিক ব্যবস্থাপনায় দলীয় নেতৃত্বের ভূমিকা বৃদ্ধি পেয়েছে।
ফলে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যক্তিগত মন্ত্রণালয় বা প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানের চেয়ে দলীয় নেতৃত্বের প্রভাব বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কার্নেগি এনডাওমেন্টের ২০২৫ সালের গবেষণায় দেখা গেছে, শি আমলে দলীয় রাষ্ট্রব্যবস্থার পুনর্গঠন এবং জাতীয় নিরাপত্তার কাঠামো সম্প্রসারণের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
২. দুর্নীতিবিরোধী অভিযানকে দলীয় শৃঙ্খলা ও নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার করা
২০১২ সাল থেকে শি জিনপিং দুর্নীতিবিরোধী অভিযানকে তার শাসনের অন্যতম প্রধান কর্মসূচি হিসেবে ব্যবহার করছেন। উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা থেকে স্থানীয় প্রশাসনের কর্মী—বিভিন্ন পর্যায়ে তদন্ত ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এতে প্রকৃত দুর্নীতি দমনের পাশাপাশি দলীয় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার সুযোগও তৈরি হয়েছে।
২০২৬ সালের অক্টোবরের শেষ দিকে অনুষ্ঠিত কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকে দলীয় শৃঙ্খলা ও দুর্নীতিবিরোধী অভিযান জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের ৩১ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শি ক্ষমতায় আসার পর থেকে দলীয় শৃঙ্খলাবিষয়ক সংস্থাগুলো ৮১ লাখের বেশি তদন্ত পরিচালনা করেছে এবং ৭৯ লাখের বেশি ব্যক্তির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে। এসব অভিযান দুর্নীতি মোকাবিলার পাশাপাশি নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখছে।
৩. প্রশাসনে ব্যক্তিগত আনুগত্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া
শি জিনপিংয়ের ক্ষমতা সংহত করার আরেকটি কৌশল হলো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও দলীয় পদে বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব থেকে প্রাদেশিক প্রশাসন পর্যন্ত রাজনৈতিক আনুগত্য ও দলীয় শৃঙ্খলার গুরুত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কেন্দ্রের নির্দেশনা কার্যকর করার সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
তবে এর বিপরীত ঝুঁকিও রয়েছে। যোগ্যতা ও স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের চেয়ে আনুগত্য বেশি গুরুত্ব পেলে প্রশাসনে সৃজনশীলতা ও দায়িত্বশীলতার ঘাটতি দেখা দিতে পারে। ব্রুকিংসের ২০২৬ সালের অক্টোবরের বিশ্লেষণে শীর্ষ নেতৃত্বে ধারাবাহিক পরিবর্তন এবং আস্থাভিত্তিক নিয়োগের জটিলতা তুলে ধরা হয়েছে।
৪. প্রেসিডেন্টের মেয়াদসীমা তুলে দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি নেতৃত্বের পথ তৈরি
২০১৮ সালে চীনের সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে প্রেসিডেন্টের পরপর দুই মেয়াদের সীমা তুলে দেওয়া হয়। এর ফলে শি জিনপিংয়ের তৃতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট থাকার সাংবিধানিক বাধা দূর হয়। ২০২২ সালের ২০তম পার্টি কংগ্রেসে তিনি তৃতীয়বারের মতো কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এর আগে কোনো নেতা এভাবে টানা তৃতীয় মেয়াদে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পাননি মাও সেতুং-পরবর্তী সময়ে।
প্রেসিডেন্টের মেয়াদসীমা তুলে দেওয়া মানে সাধারণ সম্পাদক পদের মেয়াদসীমা তুলে দেওয়া নয়। চীনে পার্টির সাধারণ সম্পাদক পদই প্রকৃত রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্র। শির দীর্ঘমেয়াদি নেতৃত্বের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে মূলত দলীয় কাঠামোয় তার অবস্থান এবং উত্তরসূরি নির্ধারণের অনিশ্চয়তার কারণে।
৫. সামরিক বাহিনীর ওপর সরাসরি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা
চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি কেবল জাতীয় প্রতিরক্ষা বাহিনী নয়; এটি কমিউনিস্ট পার্টির সামরিক শক্তি। শি জিনপিং কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে বাহিনীর সর্বোচ্চ নেতৃত্বে রয়েছেন। সামরিক সংস্কার, আধুনিকায়ন, কমান্ড কাঠামোর পুনর্বিন্যাস এবং রাজনৈতিক আনুগত্য প্রতিষ্ঠা তার গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে চীনের দুই শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা ঝাং ইউশিয়া ও লিউ ঝেনলিকে তদন্তের আওতায় আনার ঘোষণা আসে। সিএসআইএসের ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর গবেষণা অনুসারে, ২০২২ সালের পর থেকে শতাধিক জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা অপসারিত হয়েছেন বা প্রকাশ্য পরিসর থেকে হারিয়ে গেছেন। এসব পদক্ষেপের একটি লক্ষ্য হিসেবে সামরিক বাহিনীতে দুর্নীতি দূর করা এবং রাজনৈতিক আনুগত্য নিশ্চিত করার বিষয়টি বিশ্লেষকেরা উল্লেখ করেছেন। তবে এর ফলে সামরিক নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা ও যুদ্ধপ্রস্তুতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
৬. প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ও তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ
আধুনিক চীনা শাসনব্যবস্থায় প্রযুক্তি রাজনৈতিক ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ডিজিটাল নজরদারি, মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তি, ইন্টারনেট পর্যবেক্ষণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ এবং নাগরিকদের ডিজিটাল পরিচয় ব্যবস্থার মাধ্যমে রাষ্ট্রের পর্যবেক্ষণক্ষমতা বেড়েছে।
মেরকেটর ইনস্টিটিউট ফর চায়না স্টাডিজের (মেরিকস) ২০২৫ সালের গবেষণায় দেখা গেছে, কমিউনিস্ট পার্টি শুধু কেন্দ্রীয় প্রশাসন নয়, স্থানীয় সম্প্রদায়, গ্রাম, শহর এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও নিজেদের উপস্থিতি সম্প্রসারণ করছে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে জাতীয় ডিজিটাল পরিচয়ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগও এই প্রক্রিয়ার অংশ। এর ফলে রাষ্ট্রের পক্ষে নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা সহজ হচ্ছে।
৭. জাতীয় নিরাপত্তাকে রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রীয় দর্শনে পরিণত করা
শি জিনপিংয়ের শাসনে জাতীয় নিরাপত্তার ধারণা শুধু সীমান্ত, সামরিক বাহিনী বা গোয়েন্দা কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ নেই। অর্থনীতি, খাদ্য, জ্বালানি, প্রযুক্তি, তথ্য, সাইবার নিরাপত্তা, শিক্ষা ও সামাজিক স্থিতিশীলতাকেও নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
২০১৫ সালের জাতীয় নিরাপত্তা আইন, ২০১৬ সালের সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০১৭ সালের জাতীয় গোয়েন্দা আইন, ২০২১ সালের তথ্য নিরাপত্তা আইন এবং ২০২৩ সালের পাল্টা গুপ্তচরবৃত্তি আইনের সংশোধন এই বিস্তৃত নিরাপত্তাকাঠামোর অংশ।
কার্নেগির গবেষণায় বলা হয়েছে, শি আমলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি নিরাপত্তাকে রাষ্ট্র পরিচালনার সমান গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এতে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণক্ষমতা বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা ও ব্যবসায়িক পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
৮. বেসরকারি খাত ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে রাষ্ট্রীয় লক্ষ্যের সঙ্গে যুক্ত করা
চীনের অর্থনৈতিক সাফল্যের পেছনে বেসরকারি উদ্যোক্তা, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং বাজারভিত্তিক প্রতিযোগিতার বড় ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু শি জিনপিংয়ের আমলে এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর কমিউনিস্ট পার্টির রাজনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব বাড়ানো হয়েছে। প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর, জ্বালানি, প্রতিরক্ষা ও গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকে জাতীয় নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে।
২০২৫ সালের মার্চে অনুষ্ঠিত চীনের দুই অধিবেশন নিয়ে অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের গবেষণায় এই প্রক্রিয়াকে ‘জিনট্রালাইজেশন’ নামে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। অর্থাৎ অর্থনীতি ও প্রযুক্তির গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আরো বেশি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অধীনে নিয়ে আসা। মেরিকসের ২০২৬ সালের গবেষণাও দেখিয়েছে, দেশীয় ও বিদেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে জাতীয় কৌশলগত লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার জন্য দলীয় নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো হচ্ছে।
৯. জাতীয়তাবাদ, চীনা স্বপ্ন ও রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের রাজনীতি
শি জিনপিং চীনের জাতীয় পুনর্জাগরণ বা ‘চীনা স্বপ্ন’কে তার রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে রেখেছেন। তাঁর বক্তব্যে চীনের ঐতিহাসিক মর্যাদা পুনরুদ্ধার, জাতীয় ঐক্য, প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতা এবং বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার বিষয়টি বারবার উঠে আসে।
এই জাতীয়তাবাদী বয়ান দেশের জনগণকে একটি অভিন্ন লক্ষ্য ও রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের অধীনে সংগঠিত করার সুযোগ তৈরি করে। তাইওয়ান, দক্ষিণ চীন সাগর, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত প্রতিযোগিতা এবং বিদেশি চাপের বিরুদ্ধে চীনের অবস্থানও এই বয়ানের অংশ। তবে জাতীয়তাবাদী আবেগকে অতিরিক্ত রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করলে ভিন্নমত ও আন্তর্জাতিক সমঝোতার পরিসর সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। লোই ইনস্টিটিউটের ২০২৫ সালের বিশ্লেষণে শির বৈশ্বিক কৌশলের পেছনে অর্থনৈতিক সক্ষমতা, সামরিক শক্তি এবং জাতীয় পুনর্জাগরণের আকাঙ্ক্ষার সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে।
১০. আন্তর্জাতিক প্রভাব বিস্তার ও বিকল্প বৈশ্বিক নেতৃত্বের আকাঙ্ক্ষা
শি জিনপিংয়ের ক্ষমতা সংহত করার কৌশল কেবল দেশের অভ্যন্তরে সীমাবদ্ধ নয়। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ, অবকাঠামো বিনিয়োগ, বাণিজ্যিক সম্পর্ক, প্রযুক্তি রপ্তানি, বহুপক্ষীয় কূটনীতি এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক সম্প্রসারণের মাধ্যমে চীন আন্তর্জাতিক প্রভাব বাড়াচ্ছে।
এশিয়া, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও লাতিন আমেরিকায় চীনের অর্থনৈতিক উপস্থিতি বেড়েছে। পাশাপাশি ব্রিকস, সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক কাঠামোতে সক্রিয়তার মাধ্যমে বেইজিং পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বাইরে বিকল্প সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করছে।
চীনের অর্থনৈতিক ও সামরিক সক্ষমতা শিকে আরো সক্রিয় ও আত্মবিশ্বাসী পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণের সুযোগ দিয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক প্রভাব বৃদ্ধি এবং দেশের অভ্যন্তরে ব্যক্তিগত ক্ষমতা সংহত হওয়া এক বিষয় নয়; দুটি পরস্পরকে শক্তিশালী করতে পারে, কিন্তু তাদের প্রভাব আলাদাভাবে বিচার করা প্রয়োজন।
ক্ষমতা বৃদ্ধির আড়ালে যে ঝুঁকিগুলো রয়েছে
শি জিনপিংয়ের ক্ষমতা সংহত হওয়ার অর্থ এই নয় যে চীন সব ক্ষেত্রে সমানভাবে শক্তিশালী হচ্ছে। বরং কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব যত বেশি ক্ষমতা নিজের হাতে কেন্দ্রীভূত করছে, তত কিছু নতুন ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।
প্রথমত, প্রশাসনে অতিরিক্ত আনুগত্যের সংস্কৃতি তৈরি হলে কর্মকর্তারা ভুল সিদ্ধান্তের দায় নিতে অনিচ্ছুক হতে পারেন। দ্বিতীয়ত, সামরিক বাহিনীতে ব্যাপক শুদ্ধি অভিযান অভিজ্ঞ নেতৃত্বের ঘাটতি তৈরি করতে পারে। তৃতীয়ত, বেসরকারি খাতে অতিরিক্ত রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ উদ্যোক্তাদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। চতুর্থত, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ও মতপ্রকাশের সীমাবদ্ধতা সামাজিক অসন্তোষের কারণ হতে পারে।
ব্রুকিংসের ২৩ অক্টোবর ২০২৬-এর বিশ্লেষণে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে। সামরিক বাহিনী ও দলীয় নেতৃত্বে ব্যাপক অপসারণের ফলে শি নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করলেও বিশ্বস্ত নেতৃত্বের নতুন কাঠামো গড়ে তোলার চ্যালেঞ্জে পড়ছেন। বিশ্লেষকদের মতে, অতিরিক্ত শুদ্ধি অভিযান শেষ পর্যন্ত নেতৃত্বের আস্থার সংকটও তৈরি করতে পারে।
সমাপনী কথা
শি জিনপিংয়ের ক্ষমতা বৃদ্ধির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তিনি কেবল রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে অবস্থান করছেন না; বরং রাষ্ট্র পরিচালনার প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রকে দলীয় নেতৃত্বের অধীনে আরো ঘনিষ্ঠভাবে নিয়ে এসেছেন। সামরিক বাহিনী থেকে প্রযুক্তি, অর্থনীতি থেকে প্রশাসন, জাতীয় নিরাপত্তা থেকে আন্তর্জাতিক কূটনীতি—সব ক্ষেত্রেই কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা দৃশ্যমান।
তবে তার ক্ষমতা বৃদ্ধিকে চীনের সামগ্রিক সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে এক করে দেখা ঠিক হবে না। কারণ ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষমতা যত বাড়ে, ভুল সিদ্ধান্ত সংশোধনের প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ তত সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
প্রশ্ন হলো, শি জিনপিং কি এমন একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়ে তুলছেন, যা তার পরেও সমান কার্যকর থাকবে, নাকি এমন একটি ক্ষমতাকাঠামো তৈরি করছেন, যার স্থিতিশীলতা ক্রমেই একজন ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে? চীনের ভবিষ্যৎ রাজনীতির অন্যতম বড় প্রশ্ন হয়ে থাকবে এটি।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ