০৮:৫৩ এম
সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান দেশের বিনিয়োগ, পর্যটন ও আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আয়োজনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। তবে বর্তমানে এই পরিকল্পনা নতুন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছে। ইয়েমেন থেকে ছোড়া ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র সৌদি আরবের বিভিন্ন শহরে আঘাত হানছে। যে আঞ্চলিক সংঘাত থেকে সৌদি আরব দূরে থাকতে চেয়েছিল, সেই সংঘাতে দেশটি আরো গভীরভাবে জড়িয়ে পড়ছে।
চলতি গ্রীষ্মে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ আবারও তীব্র হয়ে ওঠে। গত মাসে পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটে। কয়েক বছরের শান্ত পরিস্থিতির অবসান ঘটিয়ে নতুন করে সংঘাত শুরু হয়। সৌদি আরব গত ১১ বছর ধরে সামরিক শক্তি প্রয়োগ ও কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে দক্ষিণ সীমান্তের এই সংঘাত নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করে আসছে। প্রথমে ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে দেশটি। পরে তাদের সঙ্গে শান্তি আলোচনা শুরু করে। একই সঙ্গে হুথিদের পৃষ্ঠপোষক ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা পুনরায় চালু করে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব উদ্যোগের পরও একের পর এক কৌশলগত ভুল সৌদি আরবকে নতুন সংঘাতের মুখে ঠেলে দিয়েছে। গত বছরের শেষ দিকে ইয়েমেনে প্রতিদ্বন্দ্বী একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) সমর্থন দেওয়ার ফলে দুই দেশের দীর্ঘদিনের অংশীদারত্বে ভাঙন দেখা দেয়। এ ছাড়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সৌদি আরবের পাশে দাঁড়াবেন কি না, তা বুঝতে ভুল করেছে রিয়াদ। একই সঙ্গে ইয়েমেনে হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াইরত বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে ঐক্যবদ্ধ করতেও হিমশিম খাচ্ছে দেশটি।
আরও পড়ুন: ট্রাম্পের সঙ্গে টানাপোড়েন, ইউক্রেনের ক্ষেপণাস্ত্র সংকটে উদ্বেগ
এই পরিস্থিতিতে নতুন করে হুথিদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছে সৌদি আরব। ইয়েমেনের স্থানীয় মিত্রদের সহায়তায় পরিচালিত এ অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছে ‘ইয়েমেনস ডন’ বা ‘ইয়েমেনের ভোর’।
এক দশকেরও বেশি সময় আগে ক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে আসার পর যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান সৌদি আরবকে বদলে দেওয়ার যে উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা করেছিলেন, তা নানা বাধার মুখে পড়েছে। এবার নতুন করে চাপ বাড়ছে। বিভিন্ন দিক থেকে হামলায় দেশটির তেল অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেল রপ্তানি ব্যাহত হচ্ছে এবং বড় বড় প্রকল্প বাতিল হচ্ছে। একই সঙ্গে এমন এক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছে সৌদি আরব, যেখান থেকে বেরিয়ে আসার সুস্পষ্ট পথ দেখা যাচ্ছে না।
সৌদি আরবের তথ্য অনুযায়ী, এ সপ্তাহে হুথি বাহিনীর হামলায় দেশটির কয়েকটি বিমানবন্দরে আঘাত হানা হয়। এতে সৌদি পাইলটসহ অন্তত তিনজন নিহত হয়েছেন। আঞ্চলিক অস্থিরতার কারণে এ বছর তারকাসমৃদ্ধ চলচ্চিত্র উৎসব, পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান ও সংগীত কনসার্ট স্থগিত করতে হয়েছে। অক্টোবরের শেষ দিকে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সম্মেলন আয়োজনের কথা রয়েছে। এতে বিশ্বের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী নেতাদের অংশ নেওয়ার কথা। তবে হামলার কারণে সেই আয়োজনও চাপে পড়েছে।
সৌদি আরবে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত মাইকেল র্যাটনি মন্তব্য করেছেন, সৌদি আরব চেয়েছিল সংঘাত যতটা সম্ভব দূরে থাকুক, যাতে হুথিরা তাদের রূপান্তর পরিকল্পনায় বাধা সৃষ্টি করতে না পারে। কিন্তু এখন দেশটি নিজেই সংঘাতের কেন্দ্রে এসে পড়েছে।
আরও পড়ুন: দিল্লিতে সিজেপির পতাকা মিছিল ঘিরে ২৫ হাজার নিরাপত্তাকর্মীর মোতায়েন
গত এক বছরে সৌদি আরবের কৌশলগত ভুল, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা এবং ইয়েমেনে মিত্রদের দুর্বল সমন্বয় কীভাবে নতুন সংঘাতের পথ তৈরি করেছে, তা নিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
সৌদি-আমিরাত জোটে ভাঙন
গত বছর ইয়েমেনে সংযুক্ত আরব আমিরাতের পাঠানো সামরিক যানবাহনের একটি চালানে সৌদি যুদ্ধবিমান হামলা চালায়। এর ফলে ইয়েমেনে ইরানের প্রভাব ঠেকাতে এক দশক ধরে একসঙ্গে কাজ করা দুই দেশের মধ্যে বড় ধরনের ভাঙন দেখা দেয়। আমিরাতের সেনারা ইয়েমেন থেকে সরে যাওয়ার পর সংকট সামাল দেওয়ার দায়িত্ব অনেকটাই সৌদি আরবের ওপর এসে পড়ে।
দুই দেশের সম্পর্কের এই অবনতি পুরো অঞ্চলকে বিস্মিত করে। প্রতিবেশী দেশটির বিরুদ্ধে বিরল এক প্রচার অভিযানও শুরু করে সৌদি আরব। সুদান ও ইয়েমেনে অস্থিতিশীলতা তৈরির জন্য আমিরাতকে দায়ী করেন সৌদি কর্মকর্তারা। দেশটির ভাষ্যকারেরাও প্রকাশ্যে আমিরাতকে এমনভাবে উপস্থাপন করতে থাকেন, যেন সে অভিজ্ঞ বড় ভাইয়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা ছোট ভাই।
আরও পড়ুন: মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় বিপর্যস্ত ইরানের আকাশপথ, বেড়েছে ভাড়া ও ভোগান্তি
সৌদি আরবের প্রভাবশালী সাংবাদিক দাউদ আল-শিরিয়ান জানুয়ারিতে লেখেন, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা সৌদি আরবের ওপর নির্ভরশীল। তার ভাষায়, সৌদি আরব হলো সেই ‘মাথা ও শরীর’, যার ওপর আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা দাঁড়িয়ে আছে। দেশটি হোঁচট খেলে পুরো ব্যবস্থা অস্থিতিশীল হয়ে পড়বে এবং উপসাগরীয় অঞ্চল ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যাবে।
রিয়াদ যখন উপসাগরীয় অঞ্চলে নিজের প্রভাব আরো শক্তিশালী করার চেষ্টা করছিল, তখন ইয়েমেনের পরিস্থিতি বদলে যাচ্ছিল। হুথিদের সঙ্গে চার বছরের যুদ্ধবিরতি আগেই নড়বড়ে হয়ে পড়েছিল। এর মধ্যে সৌদি আরবের দাবিতে আমিরাত দ্রুত সেনা প্রত্যাহার করে নেয়। ফলে প্রায় এক দশক ধরে আমিরাতের নেতৃত্বে কাজ করা হাজারো যোদ্ধা নতুন পরিস্থিতিতে দিশাহারা হয়ে পড়েন।
আমিরাত-সমর্থিত যোদ্ধাদের দাবি, আবুধাবি চলে যাওয়ার পর ইয়েমেনে যে নেতৃত্বের শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, সৌদি আরব তা পূরণ করতে পারেনি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলের এক কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেন, আমিরাতের সেনারা চলে যাওয়ার পর দায়িত্ব হস্তান্তরের যথাযথ ব্যবস্থা ছিল না।
আরও পড়ুন: ইরানী ব্যাংকের সম্পর্কের অভিযোগে কিউবার ব্যাংকের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা
তার ভাষায়, পরিস্থিতি কতটা বদলে গিয়েছিল, তা ছিল উদ্বেগজনক। আমিরাতের নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত কার্যকর। সৌদি আরব সেই দক্ষতার বিকল্প তৈরি করতে পারেনি।
ইয়েমেনে হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াইরত বাহিনীগুলো যথেষ্ট সহায়তা পেয়েছিল কি না এবং আমিরাতের সেনা প্রত্যাহারের পর দায়িত্ব হস্তান্তরের সঠিক ব্যবস্থা ছিল কি না, তা জানতে সৌদি সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল সিএনএন।
প্রস্তুতির ঘাটতি
আমিরাতের সেনা প্রত্যাহারের আট সপ্তাহ পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে। ওই যুদ্ধে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। এর পর থেকে পুরো অঞ্চলে নজিরবিহীন অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে। সৌদি আরবসহ যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক মিত্ররাও ইরানের হামলার ঝুঁকিতে পড়ে।
আরও পড়ুন: জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের হুতিদের ‘উসকানিমূলক’ হামলার নিন্দা
বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়টি সৌদি আরবের জন্য অত্যন্ত প্রতিকূল ছিল। ইয়েমেনে আমিরাত-সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদীদের তৎপরতা সামাল দেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধ আঞ্চলিক পরিস্থিতি আরো জটিল করে তোলে। ইয়েমেনে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে সৌদি আরব বছরের পর বছর চেষ্টা করলেও ইরানের ওপর ট্রাম্পের চাপের কারণে হুথিরা শেষ পর্যন্ত সৌদি আরবের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে পারে, এমন আশঙ্কা ছিল।
সৌদি আরবে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত মাইকেল র্যাটনি বলেন, শত্রুপক্ষ সৌদি ভূখণ্ডে হামলা চালানোর পর দেশটির পাল্টা জবাব দেওয়ার কথা ছিল।
তার মতে, এ পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের প্রতিক্রিয়া জানানো ছিল প্রত্যাশিত।
পূর্ব দিক থেকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সৌদি আরবে আঘাত হানলেও দেশটির মনোযোগের বড় অংশ ছিল দক্ষিণ সীমান্তে। হুথিরা তখনো আনুষ্ঠানিকভাবে সৌদি আরবের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে ছিল। তারা ইরানের মিত্রদের সহায়তায় সরাসরি এগিয়ে আসতে আগ্রহী নয় বলেই মনে হচ্ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তেহরানের পদক্ষেপই সৌদি আরবকে আরো গভীরভাবে সংঘাতে টেনে আনে।
আরও পড়ুন: ট্রাম্পের মতে, রাশিয়ার তেল শোধনাগারে ইউক্রেনের হামলা ‘লজ্জাজনক’
জুলাইয়ে ইরান একটি বাণিজ্যিক বিমান পাঠিয়ে হুথি প্রতিনিধিদলকে খামেনির জানাজায় অংশ নিতে তেহরানে নিয়ে যায়। ইয়েমেনের ওপর সৌদি আরবের আকাশপথে অবরোধ থাকা সত্ত্বেও এই যাত্রা হয়। বিমানটি যাতে সানার হুথি-নিয়ন্ত্রিত বিমানবন্দরে অবতরণ করতে না পারে, সে জন্য সেখানে হামলা চালায় সৌদি আরব।
এর জবাবে হুথিরা যুদ্ধবিরতি শেষ বলে ঘোষণা করে এবং সৌদি জাহাজের ওপর নৌ অবরোধ আরোপের কথা জানায়। একই সঙ্গে ইয়েমেনের উপকূল ধরে দ্রুত অভিযান চালিয়ে কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ড দখল করে তারা। বাব আল-মান্দেব প্রণালির কাছাকাছি এলাকায় এই অগ্রযাত্রা ২০২২ সালের পর সংঘাতের সবচেয়ে বড় উত্তেজনা তৈরি করে।
এরপর সৌদি আরবের তেল স্থাপনা ও পাইপলাইনে হামলা চালায় হুথিরা। এতে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ ব্যাহত হয় এবং তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়। জবাবে সৌদি বাহিনী শত শত বিমান হামলা চালায়।
ইয়েমেনবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংকট গোষ্ঠীর জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক আহমেদ নাগি সিএনএনকে বলেন, সৌদি আরব বেশ কয়েকটি ভুল করেছে এবং ব্যর্থ হয়েছে।
তার মতে, হুথিদের আক্রমণের প্রস্তুতি রিয়াদের ছিল না। আমিরাতের কাছ থেকে পাওয়া ইয়েমেনি মিত্র বাহিনীগুলোর সঙ্গেও পর্যাপ্ত সমন্বয় গড়ে তুলতে পারেনি দেশটি।
নাগি বলেন, যেসব এলাকা সৌদি-সমর্থিত বাহিনী হারিয়েছে, সেগুলো মিত্রদের মনোবলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। হুথিদের হাতে আরো উন্নত অস্ত্র রয়েছে, যেগুলো সৌদি আরবের কয়েকটি শহরে আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছে। এ পরিস্থিতি এখন সৌদি আরবের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
অনিশ্চিত ট্রাম্প, চাপে সৌদি আরব
বিশেষজ্ঞদের মতে, সৌদি আরবের আরেকটি বড় ভুল ছিল যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত সামরিক সহায়তার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। গত বছর ওয়াশিংটনের সঙ্গে নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করে সৌদি আরব। যুক্তরাষ্ট্র দেশটিকে ন্যাটোর বাইরের প্রধান মিত্র হিসেবেও স্বীকৃতি দেয়। তারপরও নিজেদের নিরাপত্তার বিষয়ে মার্কিন অঙ্গীকার কমে আসছে বলে মনে করছে রিয়াদ।
গত মাসে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান দুই দফায় ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলেন। সিএনএনকে সূত্র জানায়, ওই আলোচনায় তিনি হুথিদের বিরুদ্ধে হামলা চালানোর জন্য ট্রাম্পকে অনুরোধ করেছিলেন। তবে ট্রাম্প তাতে রাজি হননি।
এর পরিবর্তে ওয়াশিংটন ওমানের মাধ্যমে হুথিদের সঙ্গে আলোচনা করে। নিজেদের সঙ্গে গোষ্ঠীটির যুদ্ধবিরতি বজায় রাখাই ছিল যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য। হুথিরা স্পষ্ট করে জানায়, তাদের যুদ্ধ শুধু সৌদি আরবের বিরুদ্ধে। ফলে লোহিত সাগর দিয়ে মার্কিন জাহাজগুলোর চলাচল নির্বিঘ্ন রাখার সুযোগ পায় ওয়াশিংটন।
র্যাটনির মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অংশীদারত্বকে নিজেদের সামরিক চিন্তাভাবনার মূল ভিত্তি হিসেবে গড়ে তুলেছিল সৌদি আরব। কিন্তু এখন ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত কতটা অনিশ্চিত হতে পারে, তা বুঝতে পারছে রিয়াদ।
তিনি বলেন, সৌদি সামরিক বাহিনীর কাঠামো কিংবা যুদ্ধের ধারণা কখনো এককভাবে এ ধরনের লড়াই চালানোর ভিত্তিতে গড়ে ওঠেনি।
তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রে স্বাভাবিক পরিস্থিতি থাকলে এমন সংকটে কোনো মিত্র আক্রান্ত হওয়ার পর ওয়াশিংটন যৌক্তিক ও পরিকল্পিত প্রক্রিয়ায় পাশে দাঁড়াত। কিন্তু এখন সেই প্রক্রিয়া নেই। শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প কী ভাবছেন, সেটিই হয়ে উঠছে প্রধান বিষয়। এ কারণে সৌদি আরব নিজেকে অরক্ষিত মনে করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমাতে এখন অন্য দেশগুলোর সহযোগিতা চাইছে সৌদি আরব। গত মাসে যুবরাজ মোহাম্মদ মিসর সফর করে প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির সঙ্গে বৈঠক করেন। কয়েক সপ্তাহ পর আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভাইস প্রেসিডেন্ট শেখ মনসুর বিন জায়েদকে রিয়াদে আমন্ত্রণ জানান তিনি।
ফ্রান্স সৌদি আরবকে সহায়তা করতে সামরিক সদস্যসহ প্রতিরক্ষাসংশ্লিষ্ট সম্পদ মোতায়েনে সম্মত হয়েছে। যুক্তরাজ্য সৌদি যুদ্ধবিমানগুলোকে আকাশে জ্বালানি সরবরাহের জন্য একটি বিমান পাঠানোর কথা জানিয়েছে। এ ছাড়া নতুন গঠিত যৌথ বাহিনীর কমান্ডের অধীনে শতাধিক মার্কিন সামরিক উপদেষ্টা সৌদি আরবে অবস্থান করছেন। তারা গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে সহায়তা করছেন।
সোমবার রিয়াদে জরুরি বৈঠকের পর সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় ‘সম্মিলিত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা সক্রিয়’ করার বিষয়ে একমত হয়। চলতি বছরের শুরুর দিকে করা এই চুক্তির লক্ষ্য তিন দেশের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা সমন্বয় করা।
ইয়েমেনে চলমান অভিযানে আমিরাত-সমর্থিত বাহিনীগুলোকেও অংশ নিতে দেখা যাচ্ছে। এতে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সম্পর্কে অন্তত আংশিক বরফ গলার ইঙ্গিত মিলছে।
আঞ্চলিক সমাধানই বড় চ্যালেঞ্জ
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, বাইরের দেশগুলোর সহায়তা এবং ইয়েমেনের সৌদি-সমর্থিত সরকারের প্রাথমিক সাফল্য দিয়ে এই সংঘাতের অবসান ঘটানো যাবে না। বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে দ্বন্দ্ব এখনো নিয়মিত ঘটনা। রাজনৈতিকভাবে সংঘাতের শেষ পরিণতি কী হবে, তা-ও স্পষ্ট নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান-সমর্থিত বাহিনীগুলোর বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি অভিযান চালাতে হলে শক্তিশালী সংগঠন, আঞ্চলিক সমর্থন, অর্থায়ন ও রসদ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমান জোট এখন পর্যন্ত এসব সক্ষমতা দীর্ঘ সময় ধরে ধরে রাখতে পারবে, তার প্রমাণ দিতে পারেনি।
ইউরোপিয়ান ইনস্টিটিউট অব পিসের ইয়েমেনবিষয়ক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা হিশাম আল-ওমেইসি সিএনএনের সাংবাদিক বেকি অ্যান্ডারসনকে বলেন, বিভিন্ন বাহিনীর মধ্যে সমন্বিত কমান্ডব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে এবং তাদের অভ্যন্তরীণ বিরোধ মেটাতে হবে।
তার মতে, সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকার দখল করা এলাকাগুলোর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে না পারলে এসব ভূখণ্ডগত সাফল্যের কোনো মূল্য থাকবে না।
অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, ইয়েমেনের যুদ্ধের সঙ্গে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সংঘাত চলতে থাকলে সৌদি আরবকে চাপে রাখতে হুথিদের ব্যবহার করার শক্তিশালী প্রণোদনা ইরানের থাকবে।
বিশ্লেষকদের মতে, উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের সঙ্গে আলাদা কূটনৈতিক সমাধানে পৌঁছানোর চেষ্টা করতে পারে। আরেকটি সম্ভাবনা হলো, হুথি নেতৃত্বকে নির্মূল করতে সামরিক হামলা আরো জোরদার করা। তবে এই দুই পথের কোনোটিই স্বল্প সময়ে ইয়েমেনের সংঘাতের সমাধান দেবে না বলে মনে করেন র্যাটনি।
তার ভাষায়, সৌদি আরবকে সামনে এগোনোর জন্য একটি অসম্পূর্ণ পথই খুঁজে নিতে হবে।
এএম
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন