১০:৪৭ পি.এম
‘সেন্টার ফর বেঙ্গল স্টাডিজ’ (সিবিএস)-এর উদ্যোগে ‘জুলাই অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা: বিচার, সংস্কার ও পুনর্গঠন’ শীর্ষক একটি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
শনিবার (২৫ জুলাই) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর. সি. মজুমদার অডিটোরিয়ামে বিকাল ৪টায় এই সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বক্তব্য রাখেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, স্বাধীন তদন্ত কমিশনের (বিডিআর হত্যাযজ্ঞ বিষয়ক) সদস্য এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক মো. শাহনেওয়াজ খান চন্দন এবং সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্য এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার ইমরান আবদুল্লাহ সিদ্দিক।
আলোচনার শুরুতে সেন্টার ফর বেঙ্গল স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক রাশিদুল হক তিমুর স্বাগত বক্তব্যে উল্লেখ করেন, যদি জুলাই পরবর্তী নতুন বাংলাদেশকে টেকসই ও দীর্ঘস্থায়ী করে তুলতে চাই হয় তাহলে প্রথমেই গণহত্যা ও আওয়ামী ফ্যাসিস্টদের অপরাধের বিচার নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে সংস্কার ও পুনর্গঠনের কাজ সহজতর হবে।
আরও পড়ুন: রাষ্ট্রদূত মুশফিকুল ফজল আনসারী এসএএফএনের অনারারি সিনিয়র ফেলো নিযুক্ত
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, “শেখ হাসিনা যে ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠেছিলেন তার ভিত্তি ছিল বাহাত্তরের সংবিধান। এই রাজনৈতিক ব্যবস্থা হতে মুক্তি পেতে জুলাই অভ্যুত্থানে দেশের তরুণেরা প্রাণ দিয়েছে।”
জুলাই অভ্যুত্থানের হত্যাযজ্ঞের বিচারের বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, “জুলাইয়ে আমাদের দেশে হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হয়। এই হত্যাযজ্ঞ কোনো বহিরাগত শক্তির দ্বারা সংঘটিত হয়নি। যখন কোনো দেশের সরকার এরকম হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত করে তাকে স্টেট স্পন্সরড টেররিজম বলা হয়। আর্জেন্টিনা এবং চিলিতে পূর্বে এরকম ঘটনাগুলো পরিচালনা করেছিল দেশগুলোর ডিক্টেটররা।”
তিনি আরও বলেন, “ট্রানজিশনাল জাস্টিস গুরুত্বপূর্ণ। ট্রানজিশনাল জাস্টিস না থাকলে একটি বিচারহীনতার সংস্কৃতির জন্ম নেয়। এই যে মব ভায়োলেন্সের কথা বলা হচ্ছে—এটি সবসময় আমাদের দেশে ছিল। যখন মানুষ সুবিচার পায় না, তখন আইন নিজের হাতে তুলে নেয়। মব ভায়োলেন্স প্রতিরোধ করতে হলে আগে সুবিচার নিশ্চিত করতে হবে।”
ক্ষমতাসীন সরকারের সমালোচনা করে তিনি মন্তব্য করেন, “আমি জানি না, বিএনপি সরকার বাহাত্তরের সংবিধানের মধ্যে কী মধু খুঁজে পেয়েছে। বাহাত্তরের সংবিধান ত্রুটিপূর্ণ। এটি একটি গোষ্ঠীর হাতে ক্ষমতাকে তুলে দেয়। আমরা দেখেছি, তারা জুলাই সনদের ক্ষমতার ভারসাম্য সংক্রান্ত প্রস্তাবগুলোতে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে। তারা বলছে, তারা গণভোট মানে না। কারণ, গণভোট নাকি অসাংবিধানিক! ড. মাহবুব উল্লাহ এজন্যই বলেছেন, আমি বিএনপির অভ্যন্তরে আইন নিয়ে খোঁচাখুঁচির বিষয়টি দেখে বিরক্ত।”
আরও পড়ুন: অপ্রতিম হত্যা মামলায় দুই কিশোরসহ ৪ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, “বিগত ১৭ বছরে আওয়ামী লীগ ছাড়া দেশের সকল নাগরিক দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে জুলাই বিপ্লব সংঘটিত হয়। নির্বাচন পরবর্তী সময়ে এসে আমরা দেখলাম যে, বলা হচ্ছে, নির্বাচন যেন দ্রুত সংঘটিত হয় সেজন্য তারা সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবসমূহ মেনে নিয়েছিলেন। আপনারা আপনাদের দল, জাতির সঙ্গে বেইমানি করছেন। ছয় মাস অতিবাহিত হয়েছে, এখনও সময় আছে। আপনারা জুলাই সনদের সংস্কার প্রস্তাবসমূহ মেনে নেন।”
আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন করতে হলে ট্রুথ কমিশনের মাধ্যমে তারা যে অপরাধসমূহ সংঘটিত করেছে সেগুলোর বিচার নিশ্চিত করতে হবে। এরপর ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশনের মাধ্যমে তাদের পুনর্বাসনের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। জুলাই একটি ঐতিহাসিক বিপ্লব। আমরা জুলাই ব্যর্থ হতে দেব না। আমরা এর জন্য সব ধরনের চাপ প্রয়োগ করতে থাকব।”
স্বাধীন তদন্ত কমিশনের (বিডিআর হত্যাযজ্ঞ বিষয়ক) সদস্য এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক মো. শাহনেওয়াজ খান চন্দন বলেন, “বিডিআর হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হয় ২০০৯ সালের ২৫-২৬ ফেব্রুয়ারি। এই হত্যাযজ্ঞে ৫৭ জন সেনা অফিসার শহীদ হন। ২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত যারা বিডিআর হত্যাযজ্ঞের বিচার দাবি করেছে তাদের নানাভাবে হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। এই সরকারের বিডিআর হত্যাযজ্ঞের বিচার করার সুবর্ণ সুযোগ রয়েছে। আমরা আমাদের তদন্তে আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পেয়েছি। শেখ হাসিনার ভাতিজা ফজলে নূর তাপস এবং শেখ সেলিম ২০০৮ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বর থেকেই বিডিআর সদস্যদের নানাভাবে উস্কানি দিতে থাকে।”
বিডিআর হত্যাযজ্ঞে বহিরাগতদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, “বিডিআর হত্যাযজ্ঞে বহিরাগতরা জড়িত ছিল। বহিরাগতদের বিডিআরদের পোশাক সরবরাহ করেছিল সোহেল তাজ। তিনি বলেছেন, আমি বিডিআর পোশাক পরিধান করে প্যারেডে অংশগ্রহণ করব। একজন প্রতিমন্ত্রী কীভাবে পোশাক পরিধান করে প্যারেডে অংশগ্রহণ করে! যে ব্যক্তি পোশাক তৈরি করেছিল তার বক্তব্য নিয়েছি। যারা হত্যাযজ্ঞে অংশগ্রহণ করেছিল, তাদের বিষয়টি স্বীকার করেছে।”
আরও পড়ুন: ঢাকা মহানগরীতে ডিএমপির অভিযানে ৪৭৭ জন গ্রেফতার, ৩৪ মামলা দায়ের
বিডিআর হত্যাকাণ্ডে আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আওয়ামী লীগের হাজারিবাগ এলাকার নেতা-কর্মীরা মিছিল নিয়ে পিলখানায় প্রবেশ করে। সেই মিছিলের মাধ্যমে বহিরাগতরা পিলখানা ত্যাগ করে। আমরা দেখতে পাচ্ছি, কীভাবে একটি দলের তৃণমূল নেতা-কর্মী হতে সর্বোচ্চ নেতৃত্ব তথা শেখ হাসিনা পর্যন্ত বিডিআর হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত ছিল।”
বিডিআর হত্যাকাণ্ডে গণমাধ্যমের নেতিবাচক ভূমিকা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “সে সময় গণমাধ্যম ন্যাকারজনক ভূমিকা পালন করে। মুন্নী সাহা, জ.ই. মামুন বিডিআর হত্যাকাণ্ডের লাইভ টেলিকাস্ট করলে সারাদেশে বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে। ডেইলি স্টারের জুলফিকার মানিক কোনো তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই একটি দীর্ঘ প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। কোনো সোর্স উল্লেখ না করে তিনি বলেন, পিলখানায় জঙ্গিরা আক্রমণ করেছে। ভারতের প্রায় সকল মেইনস্ট্রিম মিডিয়া এই প্রতিবেদনের ওপর রিপোর্ট করেছিল।”
সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্য এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার ইমরান আবদুল্লাহ সিদ্দিক বলেন, “জুলাই অভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়ে আমাদের সংবিধানের সমস্যাসমূহের সমাধানের একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে। সংবিধান সংস্কার নিয়ে কাজ করার সময় আমরা দেখেছি, দেশের সাধারণ জনগণ সংবিধান সংস্কার নিয়ে কতটা আগ্রহী। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করা। এক ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে যেন ক্ষমতা কুক্ষিগত না থাকে।”
তিনি আরো বলেন, “ইতিহাসে এরকম সময় খুব কম আসে যখন আমরা রাষ্ট্রের পুনর্গঠন নিয়ে চিন্তা করি। রাষ্ট্রের যেকোনো সংকটকালীন সময়ে তরুণদেরই রক্ত দিয়ে তার মূল্য দিতে হয়। এরকম সংকট হতে উত্তরণের সুযোগ জুলাই আমাদের এনে দিয়েছে।
আরও পড়ুন: এক মাস পর অপ্রতিম হত্যা মামলার চার্জশিট দাখিল
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন