০৮:১১ এম
ফেসবুকে পরিচয়ের মাধ্যমে সুমাইয়া তৃষ্ণার (২৬) সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন সাজ্জাদ হোসেন (২৪)। তাদের মধ্যে একাডেমিক ও সামাজিক গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। ধীরে ধীরে তারা পরস্পরের ছবি আদান-প্রদান শুরু করেন। এক সময় এই সম্পর্ক বিষয়টি তৃষ্ণার স্বামী রোকনুজ্জামান পলাশ (২৬) জানতে পারেন। যা পরিস্থিতিকে অসমাপ্ত ও জটিল করে তুলে। শেষ পর্যন্ত তারা মিলিত হয়ে পরিকল্পনা করেন, স্বামী-স্ত্রী মিলিত হয়ে প্রেমিক সাজ্জাদকে হত্যা করবেন। উপযুক্ত পরিকল্পনার আওতায় রাজধানীর বছিলার একটি ফাঁকা মেসে ডেকে সাজ্জাদকে হত্যা করা হয়। পরে মরদেহকে ৯ টুকরো করে দুই জেলা ফেলে দেওয়ার করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ঢাকার এক যুবকের হত্যার তদন্তের সময় এসব তথ্য প্রকাশ করে। গত বছরের ৩ এপ্রিল নির্মমভাবে খুন হওয়া যুবকের নাম সাজ্জাদ হোসেন, যিনি মা-বাবার একমাত্র সন্তান হিসেবে পরিচিত। তিনি সাভারের হেমায়েতপুরে মা-বাবার সঙ্গে থাকতেন। স্থানীয় কলেজ থেকে স্নাতক (সম্মান) সম্পন্ন করেছিলেন। প্রায় এক বছর আগে রাজধানীর বনানীতে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেন এবং সেখানে যাওয়ার জন্য নিয়মিত বাসা থেকে আসা-যাওয়া করতেন। এই সময়েই সুমাইয়া তৃষ্ণার সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সুমাইয়া মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা এবং ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিল। তার স্বামী রোকনুজ্জামান পলাশও একই বিশ্ববিদ্যালয়ের একই বর্ষের ছাত্র ছিলেন। সাজ্জাদকে হত্যা করার জন্য তাকে মেসে ডেকে নিয়ে যায় সুমাইয়া। বর্তমানে দুজনেই কারাগারে বন্দী রয়েছে এবং সাজাদের হত্যার মামলার বিচার চলছে। পিবিআইয়ের আদালতে জমা দেওয়া অভিযোগপত্রে সুমাইয়ার সঙ্গে সাজ্জাদের প্রেম ও তার পরবর্তী সময় সুমাইয়া ও তার স্বামীর সাজ্জাদ হত্যার ষড়যন্ত্রের বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। মামলাটির তদন্ত সম্পন্ন হওয়ার পর গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর ঢাকার আদালতে রোকনুজ্জামান ও সুমাইয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দেয় পিবিআইয়ের ঢাকা জেলার পুলিশ পরিদর্শক জামাল উদ্দীন। বর্তমানে মামলাটি সাক্ষ্য গ্রহণের পর্যায়ে রয়েছে। অভিযোগপত্রে ৪০ জনকে সাক্ষী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং ৩১ আগস্ট মামলাটির পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহণের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।
পিবিআইয়ের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে যে, সাজ্জাদের সঙ্গে সুমাইয়ার পরিচয় একটি ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে হয়েছিল। হত্যার দুই মাস আগে থেকে তাদের মধ্যে যোগাযোগ শুরু হয় এবং প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয়, যা পরে শারীরিক ঘনিষ্ঠতায় প্রবাহিত হয়।
হত্যাকাণ্ডের পর রোকনুজ্জামান এবং সুমাইয়া ভারতে পালানোর পরিকল্পনা করেন। চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে রোকনুজ্জামানের বাড়ি। জীবননগর সীমান্ত হয়ে তারা ভারতে পালানোর চেষ্টা করেন। তদন্ত কর্মকর্তা জামাল উদ্দীন জানিয়েছেন, হত্যাকাণ্ডের দেড় মাস আগে থেকে তাদের মধ্যে অন্তরঙ্গ ছবি আদান-প্রদান সংঘটিত হতে থাকে। ২০২৫ সালের ১ মার্চ সুমাইয়া বলেছিল, তার স্বামী রোকনুজ্জামান ব্যক্তিগত ছবি চান। সুমাইয়া ছবি দিতে গিয়ে ‘সুপ্ত’ নামের একটি আইডিতে ছবি পাঠিয়ে দেয়, যা সাজ্জাদের অধিকারী ছিল। এই থেকেই সুমাইয়া এবং সাজ্জাদের মধ্যে কথাবার্তা শুরু হয়, এবং সাজ্জাদ সুমাইয়াকে ব্ল্যাকমেইল করতে থাকে।
আরও পড়ুন: শেরপুরে বাস-সিএনজির সংঘর্ষে জুয়েল মিয়া নিহত, আহত ৪
তবে সুমাইয়া ও সাজ্জাদের মধ্যে সম্পর্কটি মাত্র দুই মাসের বলে জানিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা। এ সময় তারা একাধিকবার অন্তরঙ্গ সম্পর্ক করে। যেহেতু রোকনুজ্জামান সব জানেন, তাই তাদের মধ্যে টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন কৌশলের মাধ্যমে সত্য লুকাতে সুমাইয়া মিথ্যা বলেন। স্বামীর কথায় রাজি হয়ে হত্যার পরিকল্পনায় অংশ নেন তাঁরা।
পিবিআইয়ের অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, রোকনুজ্জামান ও সুমাইয়ার পরিচয় উচ্চমাধ্যমিকে লেখাপড়ার সময় থেকে। তারা ২০২৩ সালে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন, কিন্তু তাদের বিয়ের কথা দুই পরিবারের কারও কাছেও ছিল না। তারা আলাদাভাবে বসবাস করতেন। সুমাইয়া পরিবারের সঙ্গে মোহাম্মদপুরে এবং রোকনুজ্জামান বছিলার মেসে অবস্থান করতেন।
তদন্তে দেখা গেছে, ঈদের ছুটিতে কেউ মেসে নেই বলে সাজ্জাদকে ফোন করে ডেকে নেয় সুমাইয়া এবং পরিকল্পনা অনুসারে সুমাইয়া সেই মেসের গোসলখানায় লুকিয়ে থাকেন রোকনুজ্জামান। সাজ্জাদ কক্ষে প্রবেশ করলে পেছন থেকে এসে তাকে ছুরি দিয়ে আঘাত করে রোকনুজ্জামান। বিবেকবর্জিত, অনিবার্য মদনির্ব্বিত পেঁছেজাতির চূড়ান্ত আঘাতের বাসনায় ছুরি দিয়ে সাজ্জাদকে আক্রমণ করা হয়।
তদন্ত কর্মকর্তা জামাল উদ্দীন জানিয়েছেন, বিভিন্ন সময় রোকনুজ্জামান সুমাইয়াকে মুখ ঢেকে নগ্ন ছবি ও ভিডিও তৈরি করতে বাধ্য করতেন। সেই কারণেও তাদের সম্পর্কের মধ্যে টানাপোড়েন ছিল। অন্যদিকে সাজ্জাদের সঙ্গে সুমাইয়ার সম্পর্ক এবং তাদের ব্যক্তিগত ছবি আদান-প্রদানের বিষয়টি জানার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
আরও পড়ুন: কেন্দুয়ায় পাচারের সময় ৩২ বস্তা সার জব্দ, চালক পালিয়েছে
২০২৫ সালের ২ এপ্রিল রাতে রোকনুজ্জামান একজন রিকশাচালককে ৫০০ টাকা দিয়ে মোবাইলের একটি সিম কিনতে বলেন। সেই সিমটি ওই রিকশাচালকের নামে নিবন্ধিত ছিল। এই নম্বর থেকে সাজ্জাদকে ফোন করে পরদিন সকালে যাবার জন্য আহ্বান জানায় সুমাইয়া। সুমাইয়া ওই মেসে থাকতেন, যেখানে সাজ্জাদ পরদিন সকালে গেলে ঘটে পুরো হত্যাকাণ্ড।
আদালতে রোকনুজ্জামান জবানবন্দিতে বলেন, সাজ্জাদের মৃত্যুর পর মেঝেটা রক্তে ভেসে যায়। তারা প্রথমে মরদেহ সরানোর চেষ্টা করেন, কিন্তু তা সম্ভব না হলে মরদেহ টুকরো করার সিদ্ধান্ত নেন।
তদন্তে উঠে এসেছে, মরদেহের খণ্ডগুলো সরানোর জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সামগ্রী কেনা হয় যেমন চালের বস্তা, চটের ব্যাগ, বড় কার্টন এবং স্কচটেপ। পরে খণ্ডিত মরদেহ তিনটি কার্টনে ভরা হয় এবং স্কচটেপ দিয়ে সেগুলো ভালোভাবে মুড়িয়ে দেওয়া হয়। পুরো প্রক্রিয়াটি এভাবে করা হয়েছিল যাতে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তাদের সরাসরি জড়িত থাকার প্রমাণ না থাকে।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, হত্যার পর লাশ গুম করতে ৪ হাজার ৫০০ টাকা দিয়ে একটি প্রাইভেট কার ভাড়া করেন তারা। তিনটি কার্টনে মরদেহের খণ্ডিত অংশ নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মুন্সীগঞ্জের মাওয়ার দিকে রওনা দেন তারা। সেখানকার রাতে খাওয়া শেষে ফেরার পথে তারা কার্টনগুলো নির্জন স্থানে ফেলে দেন।
আরও পড়ুন: উখিয়ায় ১৫ ঘণ্টা পরও জ্বলছে গ্যাসের আগুন, ১৫ কিলোমিটার এলাকায় বিদ্যুৎ বন্ধ
অভিযোগপত্র অনুযায়ী, একটি কার্টন মুন্সীগঞ্জের পদ্মা সেতুর (উত্তর) থানার মেদিনীমণ্ডল এলাকায় ফেলা হয় এবং অন্য দুটি কেরানীগঞ্জের শুভাঢ্যা ইউনিয়নের পাওয়ার হাউস থেকে মালঞ্চ হাসপাতাল সড়কের পাশে একটি নিচু জমিতে ফেলে দেওয়া হয়।
পরদিন, ২০২৫ সালের ৪ এপ্রিল কেরানীগঞ্জে পাওয়া একটি কার্টন থেকে কুকুর একটি পোঁটলা টেনে বের করে ছিঁড়ে ফেলে এবং তখন সাজ্জাদের খণ্ডিত মরদেহের অংশ বেরিয়ে আসে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে সেগুলো উদ্ধার করে। প্রায় একই সময় মুন্সীগঞ্জের পদ্মা সেতু (উত্তর) থানাধীন এলাকা থেকে অন্য একটি কার্টনও উদ্ধার করা হয়।
মরদেহের খণ্ডিত অংশগুলো স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। পুলিশ ফিঙ্গারপ্রিন্ট ও হাড়, দাঁত ও নখের নমুনা সংগ্রহ করে এবং পরে ডিএনএ পরীক্ষায় নিশ্চিত হয়, উদ্ধার হওয়া অংশগুলো সাজ্জাদের।
এদিকে সাজ্জাদের নিখোঁজের খবর পেয়ে ২০২৫ সালের ৩ এপ্রিল রাতেই তার বাবা মোহাম্মদ ইউসুফ আলী সাভার মডেল থানায় একটি জিডি করেন। পরে মরদেহ উদ্ধার হওয়ার পর সেটি হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়।
আরও পড়ুন: তাহিরপুরে প্রবাসীর স্ত্রী ও পাঁচ লাখ টাকা নিয়ে উধাও নাজমুল, পরিবার উদ্বিগ্ন
সাজ্জাদের খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার হওয়ার পর প্রযুক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণ শুরু করে পিবিআই। মুঠোফোনের কলের তথ্য, অবস্থান এবং অন্যান্য আলামত বিশ্লেষণ করে হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্তের চেষ্টা চালানো হয়।
তদন্ত কর্মকর্তা জামাল উদ্দীন বলেন, এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা সম্পূর্ণভাবে ‘ক্লুলেস’ ছিল। শুরুতে প্রযুক্তি ব্যবহার করে মোবাইলে কথা বলার সূত্র যাচাই করা হয়। এর মাধ্যমে রিকশাচালককে গ্রেফতার করা হয়। তিনি আশ্বস্ত হন যে, অন্য একজন তার কাছ থেকে ৫০০ টাকা দিয়ে সিম কিনেছেন। পরে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় রোকনুজ্জামানের তথ্য সংগ্রহ করা হয় এবং সেটির সূত্র ধরে আসামি সুমাইয়াকেও শনাক্ত করা হয়।
নিজেদের অবস্থান গোপন রাখতে সুমাইয়া তার ব্যবহৃত সিম ফেনীতে গ্রামের বাড়িতে রেখে দেন এবং তারপর গাবতলী হয়ে জীবননগরের উদ্দেশ্যে রওনা হন। তথ্যপ্রযুক্তির সাহায্যে তার অবস্থান শনাক্ত করে পুলিশ এবং ওই বাসে সুমাইয়া যাচ্ছিলেন এমন একজন পুলিশ সদস্যও যাত্রী হিসেবে সদস্য ইয়ারের ৮ এপ্রিল রাত দেড়টার দিকে সুমাইয়াকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে রোকনুজ্জামানকেও গ্রেফতার করা হয়।
সুমাইয়ার আইনজীবী মোজ্জাম্মেল হোসেন বলেন, এই মুহূর্তে বিশেষ কিছু বলার নেই। মামলার পূর্ণাঙ্গ বিচারক কার্যক্রম শুরু হলে বোঝা যাবে। তার দাবি, অভিযোগপত্রের সঙ্গে আসামির ১৬৪ ধারায় দেয়া জবানবন্দির অমিল রয়েছে।
আরও পড়ুন: আদাবরে যুবদল নেতাকে কুপিয়ে মারাত্মকভাবে জখম
ছেলের কথা বলতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন ইউসুফ আলী। তিনি বলেন, সাজ্জাদ তার একমাত্র সন্তান ছিল। ঘটনার দিন সকালে আটটার দিকে ঘুম থেকে উঠে তিনি দেখেন, ছেলে বাসাতে নেই। মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করে সেটিও বন্ধ পান। পরে বাসার ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরার ফুটেজ দেখে জানতে পারেন, সকাল পৌনে ছয়টায় সাজ্জাদ বাসা থেকে বের হয়ে গেছেন।
সারা দিন ছেলের কোনো খবর না পেয়ে সন্ধ্যা সাতটায় থানায় জিডি করেন ইউসুফ আলী। তিনি বলেন, 'আমার ছেলে খুব ভালো ছিল। ছেলের কোনো শত্রু ছিল না। আমি ছেলে হত্যার বিচার চাই।'
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন