১১:৫৫ পি.এম
শ্রমজীবী ইমাম হোসেনের পরিবারে আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্যের এক নতুন সূচনার সৃষ্টি হয়েছে। মানুষটির এগিয়ে চলার পথে মনোবল যেন বেড়েছে। তিনি হাঁস-মুরগির খামার পরিচালনা করছিলেন। প্রতিদিন হাঁসের দেয়া ডিম বিক্রি করা হতো। ছোট্ট পরিসরে মা হাঁসের সাহায্যে স্বাভাবিকভাবে বাচ্চা ফোটাতে পারতেন। তবে সে বছর একটি হাঁস দিয়ে ৫-৬ বারের বেশি করতে পারতেন না, এবং এসব নিয়ে তিনি দুশ্চিন্তায় ছিলেন। বিশাল পরিসরে হ্যাচারির মাধ্যমে বাচ্চা ফোটানোর এবং বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি করার পরিকল্পনা করে রেখেছিলেন, যা এবার তার পূর্ণ হয়েছে। এখন তার সামনে এগিয়ে চলার পথটি আরও মসৃণ হয়েছে। একটি ইনকিউবেটার তার উন্নতির গতি বাড়িয়ে দিয়েছে। ইমাম হোসেন ও কোহিনুর দম্পতি এখন স্বাবলম্বিতার পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেছেন। তারা প্রতি মাসে গড়ে তিন থেকে চারশ’ ডিম ফুটিয়ে বাচ্চা বিক্রি করতে পারছেন। বাড়ি থেকেই তাঁরা দৈনিক ৫০-৮০টি ডিম বিক্রি করছেন। এ ধরনের উন্নতিতে বর্তমানে একটি হাঁস বছরে নয় মাস ডিম দিতে পারছে। হাঁস-মুরগির খামারের পাশাপাশি গবাদিপশু পালন করে চলেছেন। তাদের বাগানে ফলদ গাছের একটি ছোট্ট বাগান রয়েছে এবং পুকুরের মাছও রয়েছে। ৪২ বছর বয়সী ইমাম হোসেন পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার কুমিরমারা গ্রামে বসবাস করেন। তিনি এখন গ্রামের অন্য মানুষের জন্য অনুকরণীয় হয়ে উঠেছেন যিনি তার অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতার পথে চলছেন। ২১ বছর আগে তিনি বিয়ে করেছেন। তিনি মাদ্রাসায় পড়ালেখা করেছেন এবং এরপর থেকেই কৃষিকাজের পাশাপাশি ছোট পরিসরে হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশু পালন করতেন। গত চার বছর ধরে তিনি প্রথমে হাঁসের বাচ্চা কিনে বড় করে ডিম উৎপাদনের পাশাপাশি হাঁস বিক্রি শুরু করেছেন। টানা দশ বছর ধরে তিনি নিয়মিত ডিম বিক্রি করে আসছেন। আবার ডিম থেকে হাঁসের মাধ্যমে তা দিয়ে বাচ্চা উৎপাদন করেন। প্রায় ২৮দিন ধরে ডিম দেয়ার ফলে মা হাঁসগুলো টানা দেড় মাস ডিম দিতে রাজি থাকতেন না, যার জন্য ইমাম হোসেন চিন্তিত ছিলেন। সবশেষ ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে উন্নয়ন সংস্থা হীড বাংলাদেশের মাধ্যমে ইনকিউবেটর মেশিনে হাঁস-মুরগির বাচ্চা ফোটানোর পদ্ধতি শেখেন। এর পর হীড বাংলাদেশ একটি ইনকিউবেটর বিনামূল্যে তাকে প্রদান করে। এরপর থেকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি ইমাম হোসেনের। বর্তমানে প্রতি মাসে তিনি গড়ে আড়াইশ’ থেকে ২৮০টি বাচ্চা ফুটাতে সক্ষম হয়েছেন। এজন্য এখন তার মা হাঁস-মুরগির ডিম দেয়া বন্ধ হয় না। স্বাভাবিকভাবে ডিম দেয়ার ৭-১০ দিনের মধ্যে মা হাঁস-মুরগি আবার ডিম দেয়। প্রতিদিন ডিম বিক্রির পাশাপাশি তিনি প্রতিবছর ২৫০-২৮০টি বাচ্চা ফুটান। কখনও তিনি এই বাচ্চা বিক্রি করেন এবং আবার বড় করে ডিমের জন্য প্রস্তুত করেন। তিনি জানান, এ পর্যন্ত চারবার হ্যাচারির মাধ্যমে তিনি ডিম থেকে বাচ্চা ফুটিয়েছেন। মুরগির বাচ্চা ফোটাতে ২১ দিন এবং হাঁসের জন্য লাগে ২৮ দিন। মুরগির ৮০ শতাংশ আর হাঁসের ৬৫-৭০ শতাংশ বাচ্চা ফুটে। বর্তমানে ডিম দেয়ার মতো ১৩০টি হাঁস ও শতাধিক মুরগির বাচ্চা রয়েছে। নিচের হ্যাচারিতে ডিম ফোটানোর জন্য এখন নিত্যদিনের আয় নিয়ে চিন্তা করতে হয় না। তিনি তার স্ত্রী কোহিনুর বেগম সহ তিন সন্তানের সঙ্গে স্বস্তিদায়ক পরিবেশে আছেন। তার বড় মেয়ে এ বছর এইচএসসি পরীক্ষার্থী, ছোট মেয়ে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী এবং ছোট্ট ছেলে ক্ওাছার ক্লাশ ওয়ানের শিক্ষার্থী। ইমাম হোসেনের আর্থিক স্বচ্ছলতার গল্পটি আশেপাশের মানুষের কাছে অনেকটাই বিস্ময়। তবে তিনি জানিয়েছেন, বিদ্যুতের কিছুটা সমস্যা রয়েছে, তাই একটি সৌরবিদ্যুত সিস্টেমের প্রয়োজন। উন্নয়ন সংস্থা হীড বাংলাদেশ পাখিমারা অফিসের প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. ইব্রাহিম খান জানান, পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) এর আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় হীড বাংলাদেশ কর্তৃক বাস্তবায়িত স্পেশাল প্রোগ্রাম-ডেভেলপমেন্ট (এগ্রিকালচার) এর আওতায় স্থানীয় চাহিদার ভিত্তিতে এই ইনকিউবেটর মেশিন সরবরাহ করা হয়। এর মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে হাঁস ও মুরগির বাচ্চা সহজলভ্য হচ্ছে এবং খামারিদের আর্থিক স্বচ্ছলতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এদের প্রশিক্ষণ সহায়তারও ব্যবস্থা করা হয়েছে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন