০৯:৪১ পি.এম
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধঝুঁকির পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস অর্থাৎ ২০২৬ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) আবারও কমিয়েছে।
বুধবার আইএমএফের সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুসারে, চলতি বছরে অর্থনীতির যে প্রবৃদ্ধি হবে তা ৩ দশমিক ০ শতাংশ হবে, যা এপ্রিল মাসে প্রকাশিত পূর্বাভাসের ৩ দশমিক ১ শতাংশের থেকে কিছুটা কম। উল্লেখযোগ্য যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক পাল্টাপাল্টি হামলার শুরু হওয়ার আগেই এই পূর্বাভাস তৈরি করা হয়েছিল।
এটি চলতি বছরে আইএমএফের পক্ষ থেকে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসের দ্বিতীয়বারের মতো হ্রাস। নতুন পূর্বাভাস বলছে, ২০২৬ সালের প্রবৃদ্ধি ২০২৫ সালের তুলনায় কিছুটা কম হবে।
আরও পড়ুন: সৌদি আরবে হুথিদের হামলার নিন্দা জানাল মিসর ও পাকিস্তান
অন্যদিকে, বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি এই বছরে ৪ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছাতে পারে, যা আগের পূর্বাভাসের তুলনায় বেশি।
আইএমএফ জানায়, এআই-ভিত্তিক প্রযুক্তির চাহিদা বৃদ্ধির ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক গতি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাবগুলোকে কিছুটা প্রশমিত করবে, তাই বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির ধীরগতি তুলনামূলকভাবে সীমাবদ্ধ থাকবে।
সংস্থাটি ২০২৭ সালে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারা ৩ দশমিক ৪ শতাংশে উন্নীত হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে।
আইএমএফের গবেষণা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডেনিজ ইগান ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেছেন, আগামী দুই বছরের জন্য সংস্থার সম্মিলিত পূর্বাভাস মোটামুটি অপরিবর্তিত রয়েছে এবং তিনি সম্ভাব্য পুনরুদ্ধারকে ‘ভি-আকৃতির পুনরুদ্ধার’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
আরও পড়ুন: আমি খুবই চিন্তিত: নেতানিয়াহু আসন্ন নির্বাচনে জয় নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন
তিনি আরো বলেন, ইরান যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব, সরবরাহব্যবস্থায় দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতি এর ফলে চলতি বছরে বিশ্ব অর্থনীতির তুলনামূলকভাবে ক্ষতি হতে পারে।
আইএমএফ জানিয়েছে, যুদ্ধের প্রভাব ভিন্ন দেশের উপর ভিন্নভাবে পড়ছে।
সংস্থাটির মতে, সংঘাতের বাইরে থাকা জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশগুলো পুনরায় বাণিজ্যিক সুবিধা পাচ্ছে। এদিকে, প্রযুক্তিনির্ভর প্রবৃদ্ধির সাথে যুক্ত অর্থনীতিগুলো, জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল থাকার পরেও সম্প্রতি তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে সক্ষম।
কিন্তু যেসব দেশ জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল এবং প্রযুক্তি মূল্যশৃঙ্খলে সীমিতভাবে যুক্ত, সেসব দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রম দুর্বল হয়ে পড়ছে।
আরও পড়ুন: ইরানের নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিলেন
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার কারণে তেহরান কার্যত হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত করে। এর ফলে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের ওপর বড় আকারের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়।
বিশ্বের অপরিহার্য জ্বালানি পরিবহনপথে চলাচল বিঘ্নিত হওয়ার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়, যা বিভিন্ন দেশের অর্থনীতির উপর চাপ তৈরি করে।
পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে একটি অস্থায়ী সমঝোতার ফলে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়, যার ফলে তেল ও গ্যাস পরিবহন আংশিকভাবে স্বাভাবিক হয়ে আসে। তবে বর্তমানে আবারও উত্তেজনা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ইরানের সাম্প্রতিক হামলার আগে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইগান আশা প্রকাশ করেছেন যে ২০২৭ সালের মধ্যে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল আবার স্বাভাবিক হবে।
আরও পড়ুন: আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি, ৪৭.৪২% পরিবার ঋণের চাপের মধ্যে
আইএমএফ বলেছে, যুদ্ধের ধাক্কা বিশ্ব অর্থনীতি সামগ্রিকভাবে আশঙ্কার তুলনায় ভালোভাবে সামাল দিলেও দেশভেদে পরিস্থিতির পার্থক্য খুব স্পষ্ট।
যুদ্ধ শুরুর পর উদীয়মান এশিয়ার দেশগুলোতে খুচরা পর্যায়ে জ্বালানির দাম ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে, যেখানে লাতিন আমেরিকায় তা বেড়েছে ১৫ শতাংশ।
মার্কিন অর্থনীতি এ বছর ২ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করবে বলে ধারণা করা হলেও, মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়ার প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ১ দশমিক ২ শতাংশ পয়েন্ট কমিয়ে ০ দশমিক ৭ শতাংশে নামানো হয়েছে।
আইএমএফ জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালীতে দীর্ঘমেয়াদি বিঘ্নের সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে এই সংশোধন করা হয়েছে। তবে ভবিষ্যতে এ অঞ্চলে তুলনামূলক দ্রুত পুনরুদ্ধারের আশা করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন: ১০ ডিসেম্বরের মধ্যে ইউপি নির্বাচনের তফসিলের সম্ভাবনা
এদিকে, ইউরো অঞ্চলের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ০ দশমিক ৯ শতাংশ করা হয়েছে। ফ্রান্সের প্রবৃদ্ধি ০ দশমিক ৬ শতাংশ, যা আগের পূর্বাভাসের তুলনায় ০ দশমিক ৩ শতাংশ পয়েন্ট কম।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি চীনের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস সামান্য বাড়িয়ে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ করা হয়েছে।
তবে আইএমএফ সতর্ক করেছে যে, যুদ্ধের পূর্ণ অর্থনৈতিক প্রভাব এখনও সম্পূর্ণভাবে দৃশ্যমান হয়নি। কৌশলগত জ্বালানি মজুতের থেকে সরবরাহ দেওয়ায় কিছুটা স্বস্তি এলেও, সামনে আরও দুর্বলতা দেখা দিতে পারে।
সংস্থাটি আরও সতর্ক করে বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যে পুনরায় বড় ধরনের সংঘাত শুরু হলে পণ্যমূল্যের অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হতে পারে, সরবরাহব্যবস্থাও বিঘ্নিত হতে পারে, মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে এবং বৈশ্বিক আর্থিক পরিস্থিতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
আরও পড়ুন: ফ্রান্সে দাঙ্গা ও লুটপাট, ম্যাক্রোঁর কঠোর ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি
এছাড়া, বিশ্ব বাণিজ্যের ক্রমবর্ধমান বিভাজন আরো ত্বরান্বিত হতে পারে, যা মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি করবে। তবে কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে বলে আইএমএফ উল্লেখ করেছে।
বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তি সরবরাহ শৃঙ্খলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়া— এই চারটি এআই-সম্পর্কিত হার্ডওয়্যারের প্রধান রপ্তানিকারক দেশ যুদ্ধজনিত ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও তুলনামূলক শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
ইগান আরও বলেন, চলতি বছরে মূল্যস্ফীতি কিছুটা বাড়লেও এটি মূল্যস্ফীতি হ্রাসের দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতার সমাপ্তি নয়, বরং এটি একটি সাময়িক বিরতি মাত্র।
সূত্র: এএফপি।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন