১১:২৬ পি.এম
কাস্পিয়ান সাগরে ইরানের একটি মালবাহী জাহাজে ইউক্রেনের বোমা হামলার পর রাশিয়া-ইউক্রেন এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এখন নতুন দিকে মোড় নিয়েছে। এর ফলে একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, ইরান ও ইউক্রেনের মধ্যে এতদিনের পরোক্ষ উত্তেজনা এবার সরাসরি সংঘাতে রূপ নিতে পারে, যা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কাসহ আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।
গত ২৫ জুলাই সংঘটিত এ হামলার পর ইরান ও ইউক্রেনের মধ্যে উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে।
আরও পড়ুন: প্রধানমন্ত্রী ৭টি সেনাবাহিনী ইউনিটকে জাতীয় পতাকা প্রদান করলেন
ইরানের একটি মালবাহী জাহাজে ইউক্রেনের বোমা হামলা হয়েছে। ইউক্রেনের দাবি, হামলার শিকার জাহাজটি ইরান থেকে রাশিয়ায় সামরিক সরঞ্জাম পরিবহনে ব্যবহৃত হচ্ছিল। তবে ইরান এ দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, এটি একটি বাণিজ্যিক জাহাজ। হামলায় একজন নাবিক নিহত হয়েছেন বলেও জানিয়েছে তেহরান।
ঘটনার পর ইরানি কর্মকর্তারা ইউক্রেনের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিক্রিয়া জানান এবং হামলার জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন। এর জবাবে ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা বলেন, রাশিয়ার যুদ্ধ প্রচেষ্টায় দীর্ঘদিন ধরে সামরিক সহায়তা দিয়ে আসা ইরান এখন নিজেকে ভুক্তভোগী হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে না।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান-ইউক্রেন সম্পর্কের বর্তমান বৈরিতার মূল সূত্র রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে রুশ বাহিনী ইরানের তৈরি দীর্ঘপাল্লার ড্রোন ব্যবহার করে ইউক্রেনে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, ড্রোনের পাশাপাশি ইরান রাশিয়াকে স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রও সরবরাহ করেছে। ইউক্রেনের দাবি, রুশ সেনাদের ড্রোন পরিচালনার প্রশিক্ষণ দিতেও ইরানি বিশেষজ্ঞরা সহায়তা করেছেন। যদিও তেহরান এসব অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছে।
আরও পড়ুন: নাজরানে হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত, সৌদি আরবে দুই ক্রু নিহত
ইরানি ড্রোনের ব্যাপক ব্যবহার ইউক্রেন যুদ্ধের কৌশলগত চিত্র বদলে দেয়। এর ফলে ইউক্রেন দ্রুত নিজস্ব ড্রোন প্রতিরোধ প্রযুক্তি উন্নয়ন করে, যা বর্তমানে সামরিক বিশ্লেষকদের কাছে উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
একই দিনে জেলেনস্কি-নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠকে বসছেন ট্রাম্প। পরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত শুরু হলে উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানি ড্রোন হামলা মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রকে প্রযুক্তিগত সহায়তার প্রস্তাব দেয় ইউক্রেন। গত মার্চে প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানান, ইরানি ড্রোন প্রতিরোধে সহায়তা করতে ২০০ জনের বেশি ইউক্রেনীয় সামরিক বিশেষজ্ঞকে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়েছে। একই সময়ে সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধসংক্রান্ত প্রতিরক্ষা সহযোগিতাও জোরদার করে কিয়েভ।
অন্যদিকে ইউক্রেনের অভিযোগ, রাশিয়া ইরানকে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার স্যাটেলাইট নজরদারি-সংক্রান্ত তথ্য সরবরাহ করছে। প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির দাবি, এসব তথ্য ইরের সামরিক পরিকল্পনা ও হামলা পরিচালনায় সহায়তা করছে।
এমন পরিস্থিতিতে কাস্পিয়ান সাগরে ইরানি জাহাজে হামলাকে দুই দেশের পরোক্ষ সংঘাত সরাসরি রূপ নেওয়ার সবচেয়ে স্পষ্ট ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন পর্যবেক্ষকরা।
আরও পড়ুন: ইউরোপের ৪ দেশে বিক্ষোভকারীরা, উত্তাল রাস্তায়
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি হামলাটিকে জাতিসংঘ সনদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেছেন। তার অভিযোগ, ইউরোপকে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে জড়িয়ে ফেলতেই ইসরায়েলের নির্দেশনায় এ হামলা চালানো হয়েছে। তিনি রাশিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ কূটনীতিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে হামলার জবাব দেওয়ার অঙ্গীকারও ব্যক্ত করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া-ইরানের সামরিক সহযোগিতা, ইউক্রেনের পাল্টা প্রতিরোধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতি— সব মিলিয়ে এতদিন আলাদা দুটি সংঘাত এখন ধীরে ধীরে একই ভূরাজনৈতিক সংকটের অংশ হয়ে উঠছে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন