০২:০৯ পি.এম
বিশ্বের longest সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারে প্রতিদিন হাজারো পর্যটকের ভিড় জমে। কিন্তু ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সৈকতের মধ্যে মাত্র ২ কিলোমিটার এলাকায় রয়েছে লাইফগার্ড সেবা। বাকি অংশে কোনো লাইফগার্ড, সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড বা নিরাপত্তা পতাকা না থাকায় ১৫-২০টি জনপ্রিয় পয়েন্টে সমুদ্রস্নানে নেমে পর্যটকরা চরম ঝুঁকিতে পড়ছেন। এর ফলে বারবার নিখোঁজ ও প্রাণহানির মতো দুর্ঘটনা ঘটছে।
পর্যাপ্ত নজরদারি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা না বাড়ালে কক্সবাজার সৈকতে ঝুঁকি আরও বাড়বে বলে মনে করছেন পর্যটন সংশ্লিষ্টরা।
কক্সবাজারের ইনানী সমুদ্রসৈকত; মেরিন ড্রাইভ থেকে পর্যটকরা ঘুরতে নেমে পড়েন পাথুরে সৈকত, ইনানী জেটি কিংবা পাতুয়ারটেকে। আর বালিয়াড়ি পেরিয়ে অনেক পর্যটক নেমে পড়েন সমুদ্রস্নানে। কিন্তু ইনানী সমুদ্রসৈকতের তিনটি পয়েন্টে নেই কোনো লাইফ গার্ড সেবা। নেই কোনো ধরণের সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড কিংবা নিরাপত্তা চিহ্নিত পতাকা; যার কারণে সমুদ্রস্নানে নেমে পড়ে ঘটছে প্রাণহানি বা নিখোঁজের ঘটনা।
আরও পড়ুন: কুলিয়ারচরে পূর্ব গাইলকাটা জুনিয়র ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনালে আকাশ-নিলয় একাদশ চ্যাম্পিয়ন
পর্যটকদের অভিযোগ, সৈকতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা এবং নিরাপদে সমুদ্রে নামার নির্দেশনা সংবলিত পর্যাপ্ত সাইনবোর্ড এবং সতর্কতামূলক পতাকা নেই। তারা জানান, অনেক পর্যটক সমুদ্রের আচরণ সম্পর্কে অজ্ঞ থাকার কারণে ঝুঁকিতে পড়ছেন।
ইনানী সৈকতে বেড়াতে আসা পর্যটক শফিউল আলম বলেন, ‘কক্সবাজার থেকে ইনানী সৈকতে আসার পথে বিভিন্ন স্থানে জোয়ার-ভাটার সময়সূচি মেনে সমুদ্রে নামার বিষয়ে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড চোখে পড়েছে। কিন্তু ইনানী সৈকতের আশপাশে এ ধরনের কোনো সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড তেমন দেখা যায় না।’
তিনি বলেন, ‘এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন এলাকা, যেখানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ বেড়াতে আসেন। তাই পর্যটকদের নিরাপত্তার স্বার্থে সৈকতের বিভিন্ন স্থানে জোয়ার-ভাটা, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলি এবং নিরাপদে সমুদ্রে নামার নির্দেশনা সম্বলিত সাইনবোর্ড স্থাপন করা জরুরি।’
তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর প্রতি এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।
আরও পড়ুন: পূর্বধলায় ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ সিজন-২ এর উদ্বোধন
গাজীপুর থেকে ইনানী সৈকতে বেড়াতে আসা পর্যটক তারিকুল ইসলাম বলেন, ‘সৈকতের এই অংশে এখন পর্যন্ত আমরা কোথাও লাল-হলুদ সতর্কতামূলক পতাকা দেখতে পাইনি। একইভাবে জোয়ার-ভাটার সময়সূচি বা কখন সমুদ্রে নামা নিরাপদ, আর কখন ঝুঁকিপূর্ণ-এ ধরনের কোনো নির্দেশনাও চোখে পড়েনি।’
তিনি বলেন, ‘পর্যটকদের সতর্ক করার জন্য কোথায় সমুদ্রে নামা যাবে, কোথায় নামা যাবে না কিংবা কোন সময় জোয়ার বা ভাটা থাকবে—এসব তথ্য সম্বলিত দৃশ্যমান সাইনবোর্ড বা সংকেত থাকা উচিত। কিন্তু আমি যতক্ষণ এখানে আছি, ততক্ষণে এ ধরনের কোনো ব্যবস্থা দেখতে পাইনি।’
ঢাকার বনানী থেকে ইনানী সৈকতে বেড়াতে আসা পর্যটক রোকেয়া বেগম বলেন, ‘সমুদ্রে নামার সময় কিছুটা ঝুঁকি অনুভব হয়। কারণ জোয়ার—ভাটার সময়সূচি বা সমুদ্রের আচরণ সম্পর্কে অনেক পর্যটকেরই ধারণা থাকে না।’
তিনি বলেন, ‘পর্যটকদের সচেতন করতে সৈকতে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মী বা লাইফগার্ড থাকা জরুরি। পাশাপাশি নিরাপত্তা—সংক্রান্ত নির্দেশনা ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা আরও জোরদার করা উচিত।’
আরও পড়ুন: পুষ্টি ও গবেষণায় সহযোগিতা বাড়াতে বাকৃবি-নিউট্রিশন ইন্টারন্যাশনালের সমঝোতা
রোকেয়া বেগম আরও বলেন, ‘আমরা যারা ঢাকা বা দেশের অন্যান্য এলাকা থেকে বেড়াতে আসি, তাদের অনেকেই সমুদ্রের পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত নই। তাই নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও উন্নত ও কার্যকর করা হলে পর্যটকদের জন্য সৈকতটি অনেক বেশি নিরাপদ হয়ে উঠবে।’
পর্যটন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিদিন বিপুল পর্যটক আসলেও লাইফগার্ড, বিচকর্মী ও দ্রুত উদ্ধার ব্যবস্থার ঘাটতি রয়েছে।
ইনানী এলাকার পর্যটন ব্যবসায়ী সিয়াম আহমেদ বলেন, ‘ইনানী সৈকতে প্রতিদিনই প্রচুর পর্যটকের সমাগম হয়, বিশেষ করে ছুটির দিনগুলোতে। কিন্তু সেই তুলনায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও উদ্ধারসেবা পর্যাপ্ত নয়। সৈকতের বিভিন্ন স্থানে ২০০ থেকে ৩০০ মিটার পরপর বিচকর্মী বা লাইফগার্ড মোতায়েন থাকলে নতুন ও সাঁতার না—জানা পর্যটকদের আগেই সতর্ক করা সম্ভব হতো। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেকটাই কমে আসত।’
একই এলাকার পর্যটন ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘ইনানী সৈকতে তাৎক্ষণিক উদ্ধার ব্যবস্থার যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। দুর্ঘটনা ঘটলে ট্যুরিস্ট পুলিশ, বিচকর্মী বা ফায়ার সার্ভিসকে উদ্ধার অভিযানে অংশ নিতে দেখা যায়। তবে জরুরি মুহূর্তে দ্রুত উদ্ধার নিশ্চিত করা যায় কি না, সে বিষয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।’
আরও পড়ুন: কামরুজ্জামান জুয়েলের উদ্যোগে বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে ফ্রি চক্ষু চিকিৎসা ক্যাম্প
লাইফ গার্ড সংস্থা জানায়, সীমিত উদ্ধার সরঞ্জাম রাখলেও সৈকতের বড় অংশজুড়ে পর্যাপ্ত লাইফগার্ড নেই। মাত্র কয়েকটি পয়েন্টে দায়িত্ব পালন করা সম্ভব হচ্ছে, যা ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ সৈকতের জন্য যথেষ্ট নয়।
সি সেফ লাইফগার্ড সংস্থার সুপারভাইজার মো. ওসমান গনি বলেন, ‘আমাদের উদ্ধার সরঞ্জাম বলতে মূলত রেসকিউ টিউব এবং রেসকিউ বোর্ড রয়েছে। রেসকিউ বোর্ডটি হাতে প্যাডেল করে পরিচালনা করা হয়। এই দুটি সরঞ্জাম দিয়েই আমরা উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করি।’
তিনি আরও বলেন, ‘সি সেফ লাইফগার্ডই একমাত্র সংস্থা, যারা লাবণী, সুগন্ধা এবং কলাতলী—এই তিনটি পয়েন্টের কিছু অংশে দায়িত্ব পালন করছে। কিন্তু সমুদ্রসৈকতের দৈর্ঘ্য প্রায় ১২০ কিলোমিটার। সৈকতজুড়ে বিভিন্ন স্থানে পর্যটকরা নামলেও সব এলাকায় পর্যাপ্ত লাইফগার্ড নেই।’
পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত সংখ্যক লাইফগার্ড সদস্য এবং আধুনিক উদ্ধার সরঞ্জামের প্রয়োজন। বর্তমানে এ ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে, যা দ্রুত পূরণ করা জরুরি। এসব ঘাটতি দূর করা গেলে দুর্ঘটনার সংখ্যা অনেকটাই কমে আসবে বলে জানান মো. ওসমান গনি।
আরও পড়ুন: বান্দরবানে শিক্ষার্থীদের আর্থিক সচেতনতা বাড়াতে স্টুডেন্ট ব্যাংকিং কনফারেন্স
পাশাপাশি তিনি বলেন, ‘পর্যটকদেরও সচেতন হতে হবে। সমুদ্রে নামার আগে কোথায় নামা নিরাপদ, কোন এলাকায় ঝুঁকি রয়েছে—এসব বিষয় সম্পর্কে জেনে এবং সতর্কতা মেনে চললেই অনেক দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব।’
এ দিকে সৈকতের বিস্তৃতি বেশি হওয়ায় সার্বক্ষণিক নজরদারি করা সম্ভব হয় না। পর্যাপ্ত লাইফ গার্ড থাকলে দুর্ঘটনার সময় দ্রুত উদ্ধার করা সম্ভব হবে এবং প্রাণহানি কমানো যাবে বলে মনে করে ইনানী ট্যুরিস্ট পুলিশের পরিদর্শক গাজী আতাউর রহমান।
তিনি বলেন, ‘ট্যুরিস্ট পুলিশের পক্ষ থেকে প্রতিদিন সকাল, দুপুর এবং বিকেলে হ্যান্ড মাইক ব্যবহার করে সমুদ্র সৈকতে আসা পর্যটকদের সতর্ক করা হয়। আমরা তাদের নিরাপদভাবে সমুদ্রে নামার বিষয়ে ব্রিফ করি এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় না যাওয়ার জন্য বারবার অনুরোধ জানাই।’
তবে সৈকতটি অনেক বিস্তৃত হওয়ায় কে কোথা থেকে সমুদ্রে নামছে, তা সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখা সম্ভব হয় না। এরপরও আমরা নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি বলে জানান।
আরও পড়ুন: টেকনাফে সন্ত্রাসীদের সঙ্গে গোলাগুলিতে সেনা সদস্য গুরুতর আহত
তিনি আরও বলেন, সৈকতে পর্যাপ্ত রেসকিউ টিম থাকলে দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে দ্রুত উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হবে। কেউ পানিতে বিপদে পড়লে তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ধার করা গেলে প্রাণহানির ঝুঁকিও অনেক কমে আসবে বলে জানান ট্যুরিস্ট পুলিশের পরিদর্শক গাজী আতাউর রহমান।
সি-সেফ লাইফগার্ড সংস্থা জানায়, গেলো ১২ বছরে সমুদ্রে গোসলে নেমে মৃত্যু হয়েছে ৭৬ জনের, জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে এক হাজার ২৪ জনকে। আর এখনো হদিস মেলেনি দুই পর্যটকের।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন