১১:০৭ পি.এম
গোটা ভারতে তীব্র দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়া ভারতের জেন-জি ছাত্র জনতার আন্দোলনের মুখে মোদি সরকার তাদের সকল দাবি মেনে নিতে বাধ্য হওয়ায় ছাত্ররা আন্দোলনে ইস্তফা দিয়েছে। এর একদিন যেতে না যেতেই ঘটলো ভাইরাল ঘটনা। একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে এবং ভারতীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিশেষ করে আজ-তাক বাংলায় খবরও প্রকাশ হয়েছে। ভাইরাল ওই ভিডিওতে দেখা যায় ভারতের উত্তর প্রদেশের গাজিয়াবাদে আন্দোলন বন্ধের পরদিন-ই বিজেপি নেতা চড়াও হচ্ছেন ছাত্রদের উপর। তিনি গাড়িতে বসেই দুই শিক্ষার্থী কে কাছে ডেকে নিয়ে প্রশ্ন করেন, "তোরা কি ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) আন্দোলনকে সমর্থন করেছিস?" তারা উত্তরে সমর্থন সূলক হ্যাঁ জবাব দেওয়ার পর বিজেপি নেতা তাদেরকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল শুরু করেন এবং এক পর্যায়ে তাদের দুজনকেই চড় থাপ্পড় দিতে শুরু করেন।
মোদি সরকার যখন আন্দোলন থামাতে ছাত্রদের সব দাবি মেনে নিতে ব্যস্ত তখন বিজেপি নেতার এমন কাণ্ড কি আবার যে জেন-জি ছাত্রদের গড়া ককরোচ জনতা পার্টির নিভে যাওয়া বিক্ষোভের আগুনে ঘি ঢালল? ভিন্ন মত দমন পীড়নে যদি বিজেপি এভাবেই গোটা দেশে ছাত্রদের উপর চড়াও হয় তার পরিণতি কি হবে তা হয়তো সময়ে বলবে। তবে আপাতত বলা যায় এটি আগুনে ঘি ঢালার সমান।
দিল্লির যন্তর মন্তরে দীর্ঘদিনের ছাত্র-আন্দোলন আপাতত থেমেছে। দাবি পূরণের আশ্বাস পাওয়ার পর আন্দোলনের নেতৃত্ব কর্মসূচি স্থগিত করেছে। কিন্তু ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে—কোনো আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি মানেই জনমতের সমাপ্তি নয়। অনেক সময় একটি মাত্র ঘটনা আবারও চাপা ক্ষোভকে বিস্ফোরণের দিকে ঠেলে দেয়।
উত্তর প্রদেশের গাজিয়াবাদে দুই শিক্ষার্থীকে কথিতভাবে ছাত্র-আন্দোলনের প্রতি সমর্থনের প্রশ্ন তুলে চড়-থাপ্পড় দেওয়ার অভিযোগ সেই বাস্তবতাকেই নতুন করে সামনে এনেছে। অভিযোগ সত্য হলে ঘটনাটি কেবল দুই শিক্ষার্থীর সঙ্গে দুর্ব্যবহার নয়; এটি ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক সহনশীলতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করে।
গণতন্ত্রে রাজনৈতিক মতের পার্থক্য থাকবে, বিতর্ক থাকবে, সমালোচনা থাকবে। কিন্তু কোনো তরুণ কেবল একটি আন্দোলনের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করায় যদি অপমান, ভয়ভীতি বা শারীরিক লাঞ্ছনার শিকার হন, তবে সেটি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের জন্য উদ্বেগজনক বার্তা বহন করে। এমন প্রতিটি অভিযোগ নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি রাখে।
যে কোনো সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বিরোধিতা নয়; বরং বিরোধিতার প্রতি তার আচরণ। সংলাপ যেখানে দুর্বল হয়, সেখানে ক্ষোভ জমতে শুরু করে। আর জমে থাকা ক্ষোভের জন্য কখনো কখনো একটি ঘটনাই যথেষ্ট—যা আবারও রাজপথকে উত্তপ্ত করে তুলতে পারে।
ছাত্রসমাজ সব সময়ই রাজনৈতিক পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে পরিচিত। ভারতেও বিভিন্ন সময়ে ছাত্র-আন্দোলন জাতীয় রাজনীতির গতিপথে প্রভাব ফেলেছে। তাই যে কোনো সরকার, রাজনৈতিক দল কিংবা জনপ্রতিনিধির উচিত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আচরণে সর্বোচ্চ সংযম, সহনশীলতা ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেওয়া।
গাজিয়াবাদের ঘটনাটি যদি প্রকৃতপক্ষে অভিযোগ অনুযায়ী ঘটে থাকে এবং এর পুনরাবৃত্তি দেশের বিভিন্ন স্থানে দেখা যায়, তবে সেটি শুধু একটি বিচ্ছিন্ন আইনশৃঙ্খলার বিষয় হয়ে থাকবে না; বরং নতুন করে ছাত্র-অসন্তোষের জন্ম দিতে পারে। রাজনৈতিক ইতিহাসের বহু অধ্যায়ই বলে, অনেক বড় আন্দোলনের সূচনা হয়েছে আপাতদৃষ্টিতে ছোট একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে।
অতএব, এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রতিশোধের রাজনীতি নয়, বরং আইনের শাসন নিশ্চিত করা, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করা এবং মতপ্রকাশের সাংবিধানিক অধিকারকে সম্মান করা। কারণ গণতন্ত্রে ভিন্নমতকে চড়-থাপ্পড় দিয়ে নয়, যুক্তি ও আইনের মাধ্যমে মোকাবিলা করাই রাষ্ট্র ও রাজনীতির পরিপক্বতার পরিচয়।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন