১০:৫৬ পি.এম
কানিকা টেকরিওয়ালের জীবন ২১ বছর বয়সেই থমকে যেতে পারতো। ঠিক ওই বয়সে তার জীবনে ঘটে দুটি ঘটনা। প্রথমত, তিনি এভিয়েশন সংক্রান্ত একটি স্টার্টআপ ব্যবসা শুরু করেন এবং দ্বিতীয়ত, তার স্টেজ-২ ক্যান্সার ধরা পড়ে। এরপরের বিষয়টা চিন্তা করুন। সাধারণ কোনো মানুষের ক্ষেত্রে কী হতো? নিশ্চয়ই ব্যবসা লাটে ওঠার আশঙ্কা তৈরি হতো, ডাক্তারদের আশঙ্কা সত্যি হলে অনেক আগেই তার শরীরের অবস্থা খুব খারাপ হতো। কিন্তু কানিকা অন্যরকম। তিনি ক্যান্সারকে জয় করেছেন এবং ভারতের আকাশকেও জয় করেছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘জেটসেটগো‘ এখন ভারতের সবচেয়ে বড় প্রাইভেট এভিয়েশন সংস্থা। শূন্য হাতে শুরু করা স্টার্টআপ এখন বৃহৎ ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখায়। শূন্য হাতে শুরু বলা না হলেও, কানিকা টেকরিয়ালের ব্যবসার পুঁজি ছিল ৫ হাজার ৬০০ রুপি যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৭ হাজার টাকা। বর্তমানে তার কোম্পানির নিট সম্পদের পরিমাণ ৪২০ কোটি রুপি, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫৩৭ কোটি টাকা। এখন তার প্রতিষ্ঠান ১০টি বিমান এবং হেলিকপ্টারের মালিক। যুবরাজ সিং-এর মতো তারকা ক্রিকেটারও তার প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করেছেন। ভারতের মুম্বাই, দিল্লি, বেঙ্গালুরু ছাড়াও নিউইয়র্ক এবং দুবাইতে তার ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক বিস্তৃত হয়েছে।
কেবল ক্যান্সার সারভাইভার হলে কানিকা অনুপ্রেরণার উৎস হতে পারতেন। কিন্তু যখন ৫ হাজার ৬০০ রুপি পুঁজি নিয়ে তিনি ৪২০ কোটি টাকার ব্যবসা দাঁড় করান, তখন তিনি কোটি মানুষের অনুপ্রেরণার এক আদর্শ হয়ে ওঠেন। তবে তার এই পথচলাটা সহজ ছিল না। কানিকা টেকরিওয়ালের জীবন কেবল ব্যবসায়িক সাফল্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ক্যান্সার থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে ফেরা এবং পিতৃতান্ত্রিক সমাজকে চ্যালেঞ্জ করেন তিনি, যার ফলে তিনি নিজের একটি অনন্য ব্যক্তিত্ব তৈরি করেছেন।
২১ বছর বয়সে যখন কানিকা ক্যানসারের শিকার হন, তখন তার আত্মীয়রা তার মা'কে সান্ত্বনা দিয়ে বলছিলেন, ‘আহা! মেয়েটা যদি সুস্থও হয়, তবে কিভাবে সে বিয়ে করবে?’ হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে কানিকা রেগে গিয়ে তাদের বলেছিলেন, ‘ঠিক ৫ বছর পর আমি ফোর্বসের কভারে আসব।’ সবার অস্বস্তির মধ্যে ঠিক ৫ বছর পর ২০১৬ সালের মার্চ মাসে তিনি ফোর্বসের ’৩০ আন্ডার ৩০’ তালিকায় জায়গা করে নেন। এটি কোনো লটারি নয়, এটি কানিকার অর্জন।
আরও পড়ুন: সার্বিয়ায় ছাত্র আন্দোলন ভুসিসকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে
ক্যান্সারকে অনেকে ভয় পায়, অভিশাপ মনে করে। কিন্তু কানিকা ক্যান্সারকে নিজের জীবনের 'সেরা উপহার' মনে করেন। তার উপলব্ধি হলো, ক্যান্সার তাকে জীবনের আসল মূল্য বুঝতে এবং কোন কিছুকে হালকাভাবে না নিয়ে, নিজের স্বপ্নের পেছনে সম্পূর্ণ শক্তি নিয়ে ছুটতে শিখিয়েছে। ১৯৯২ সালের ৭ জুন ভারতের মধ্যপ্রদেশের ভোপালে এক মারোয়ারি পরিবারের জন্ম হয় কানিকার। অন্য দশটি পরিবারের মতো তাদের চাওয়া ছিল মেয়েকে পড়াশোনা করে ভালো পরিবারের কাউকে বিয়ে করার সুযোগ দেওয়া। কিন্তু কানিকার মনে ছিল ভিন্ন একটি ভাবনা। ছোটবেলা থেকেই তার আগ্রহ ছিল ফিন্যান্স এবং এভিয়েশনে। ভোপালে স্কুল জীবন শেষ করার পর উন্নত উচ্চ শিক্ষা অর্জনের জন্য তিনি ইংল্যান্ডের কভেন্ট্রি ইউনিভার্সিটিতে যান। ২১ বছর বয়স পর্যন্ত তার জীবন বাবা-মার ইচ্ছার সাথে এগিয়ে যাচ্ছে। একসাথে দুটি বড় ঘটনা ঘটে ২১ বছর বয়সে—ক্যান্সার এবং ব্যবসা।
ক্যান্সারের মোকাবিলা করার বিষয়ে তিনি জানিয়েছেন, ‘আমার বয়স যখন ২১, তখন ৪০ জন ডাক্তার আমাকে বলেছিলেন যে, আপনি চার মাস বা চার দিন বাঁচবেন। এরপর আমি মুম্বাইয়ের এক ডাক্তারের কাছে গিয়ে বলি, 'আমরা ৪০ বছর পর একসঙ্গে এক কাপ চা পান করব, এখন চিকিৎসা নিয়ে কথা বলুন।' সেই ডাক্তার নিশ্চয়ই এখন চায়ের জন্য অপেক্ষা করছেন। কানিকা এক সাক্ষাতকারে বলেছেন, ‘ক্যান্সার থেকে বেঁচে ফেরা আসলে আমাকে বুঝতে শিখিয়েছে যে জীবন কত ছোট এবং আমাকে নিজের জন্য বাঁচতে হবে এবং যা আমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ তাই করতে হবে।’
অনেকে ভাবতে পারেন, বিনা পুঁজিতে ব্যবসা শুরু করে তিনি কীভাবে ৪২০ কোটি রুপি সম্পদ গড়লেন? তিনি কোনো লটারি জিতেননি। কানিকার ব্যবসা মূলত আইডিয়ার উপর ভিত্তি করে। কানিকার প্রতিষ্ঠিত ’জেটসেটগো’ ভারত নির্মিত প্রথম এবং বৃহত্তম প্রযুক্তি-ভিত্তিক প্রাইভেট এভিয়েশন মার্কেটপ্লেস। এটি চার্টার ফ্লাইট বুকিং সহজতর করার উদ্দেশ্যে একটি অনলাইন এগ্রিগেটর প্ল্যাটফর্ম। গ্রাহকেরা ব্যক্তিগত বিমান এবং হেলিকপ্টার বুক করতে পারেন এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে, কর্পোরেট মিটিং, ব্যক্তিগত ছুটি বা জরুরি চিকিৎসার জন্য। এছাড়া ধনী ব্যক্তি এবং কর্পোরেট গ্রুপ যারা নিজস্ব বিমান কেনেন; তাদের পাইলট স্টাফিং, রক্ষণাবেক্ষণ এবং সরকারি নিয়মকানুনের সকল দায়িত্ব এই প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে। তাদের নিজের প্রশিক্ষিত রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রকৌশল টিম রয়েছে, যা বিমানের নিরাপত্তা ও ইন-হাউস মেরামত নিশ্চিত করে। তাদের শুরুতে নিজস্ব কোনো বিমান ছিল না, তারা কেবল গ্রাহক ও বিমান মালিকের মধ্যে যোগাযোগ করাত। বর্তমানে তাদের অন্তত ১২টি বিমান ও হেলিকপ্টার রয়েছে। ’জেটসেটগো’কে আকাশের উবার বলা হয়। ভারতের শহুরে যাতায়াত ব্যবস্থায় বিপ্লব আনতে তারা বৈদ্যুতিক এয়ার ট্যাক্সি চালু করার পরিকল্পনা করছে।
একজন ক্যান্সার রোগী এবং নারী হিসেবে প্রায় শূন্য থেকে একটি প্রাইভেট এভিয়েশন প্রতিষ্ঠান গঠন করা সহজ ছিল না। কানিকা বলেন, ‘অনেকে আমাকে জিজ্ঞেস করেন, পুঁজি ছাড়াই আমি কীভাবে এটি করলাম। বাস্তবতায়, আমি মাত্র ৫৬০০ রুপি বিনিয়োগ করেছি এবং আমরা ভারতের সবচেয়ে বড় প্রাইভেট জেটের বহর পরিচালনা করছি।’ কানিকার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল এভিয়েশন শিল্পে পুরুষদের আধিপত্য জয় করা। তিনি বলেন, ’শুরুতে আমি যে ব্যবসাটা করছিলাম সেটির জন্য মানুষ আমাকে গুরুত্ব সহকারে নিতে সময় নিয়েছিল এবং আমাকে ‘আপনার কাপ কেক বেক করা উচিত’ এর মত মন্তব্যও শুনতে হয়েছে। মাঝে মাঝে আমি যখন নিজের দাবিতে অটল থাকি, তখন আমাকে অহংকারী মনে করা হয়, কিন্তু একজন পুরুষ যদি আমার চেয়ে বেশি দৃঢ় হয়, তাহলে তাকে উৎসাহী অথবা আবেগপ্রবণ মনে করা হয়। তবে এগুলো খুবই তুচ্ছ ব্যাপার।’
আরও পড়ুন: যৌতুকের দাবিতে স্ত্রী হত্যা: মিজানুর রহমানের মৃত্যুদণ্ড
ব্যবসায়ী পি. শরৎ চন্দ্র রেড্ডিকে বিয়ে করে কানিকা টেকরিওয়াল সুখে আছেন। এই দম্পতি এক পুত্রসন্তানের বাবা-মা। কানিকা একজন নিয়মিত ম্যারাথন রানার। সুযোগ পেলে ক্যানভাসে রঙ তুলির সঙ্গে সময় কাটান। ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করেন। ফোর্বসের তালিকায় নাম তুলেছেন ৩০-এর আগেই। ভারত সরকারের 'জাতীয় উদ্যোক্তা পুরস্কার' পেয়েছেন। বিবিসির '১০০ প্রভাবশালী নারী' এবং ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের 'তরুণ গ্লোবাল লিডার' এর তালিকায়ও কানিকা টেকরিওয়ালের নাম রয়েছে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন