০৬:৩৭ এম
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে জয়লাভ করার পর বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই সীমান্ত রাজনীতিতে উদ্বেগজনক মোড় নিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) জন্য বাংলাদেশ লাগোয়া সীমান্তে জমি অধিগ্রহণের যে ঘোষণা দিয়েছেন, তা কার্যত ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে বিদ্বেষমূলক পথে নিচ্ছে।
সরকার পক্ষ থেকে ৫০০ একরের বেশি জমি অধিগ্রহণ করে বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়ার যে পরিকল্পনা মুর্শিদাবাদ জেলায় শুরু করতে গিয়ে রাজ্য প্রশাসনকে কৃষকদের প্রবল প্রতিরোধের মুখে পড়তে হয়েছে। সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের জন্য মানুষের ফসলি জমি কেড়ে নেওয়ার এই রাজনীতি নিয়ে বিস্তৃত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে পশ্চিমবঙ্গের প্রধান মানবাধিকার সংস্থা অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রটেকশন অব ডেমোক্রেটিক রাইটস (এপিডিআর)। সংগঠনের মুর্শিদাবাদ জেলা সম্পাদক রাহুল চক্রবর্তী প্রতিবেদনটি চিঠি আকারে জেলার প্রশাসকের কাছে পাঠিয়েছেন।
আরও পড়ুন: তারেক রহমান: জামায়াত-এনসিপি আমার রাষ্ট্রীয় সম্মান সহ্য করতে পারছে না
এপিডিআর মুর্শিদাবাদ জেলা কমিটির ৯ সদস্য ডোমকল ব্লকের ঘোষপাড়া সর্বপল্লী ভুতগাড়ির মাঠ পর্যবেক্ষণ করেন এবং কৃষকদের সঙ্গে কথা বলেন। এই মাঠে প্রায় ১৫ হাজার বিঘা অত্যন্ত উর্বর তিন ফসলি জমি রয়েছে, যার ওপর দক্ষিণ ঘোষপাড়া, সর্বপল্লী, ফরাজীপাড়া, মুরাদপুর ও উত্তর ঘোষপাড়া—এই পাঁচটি গ্রামের প্রায় ৬০০ কৃষক পরিবার সম্পূর্ণভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। সরকারি খাতায় নথিভুক্ত এই বিস্তীর্ণ কৃষি জমিতে সারা বছর পাট, গম, কলাই, মসুর, রসুন, পেঁয়াজ ও বিভিন্ন সবজির প্রচুর ফলন হয়।
কৃষকরা প্রতিনিধি দলকে জানিয়েছেন, তারা মূলত ক্ষুদ্র কৃষক। পরিবারপ্রতি জমির পরিমাণ সর্বোচ্চ দুই বিঘা। বাপ-দাদার আমল থেকে তারা এই জমিতে চাষাবাদ করে আসছেন। এই জমিটুকুই তাদের বেঁচে থাকার একমাত্র সম্বল।
সীমান্তে ২৭ কিলোমিটার (কিমি) এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করতেই শুভেন্দু সরকার বিএসএফকে এই জমি দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে।
কৃষকরা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, তারা কোনোমতেই এই জমি বিক্রি করবেন না। এই বিষয়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে গত ৩১ মে। ডোমকল মহকুমার সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বিএসএফ হঠাৎ করেই লাল পতাকা টানিয়ে প্রায় ১৫ হাজার বিঘা জমি অধিগ্রহণ করতে যায়। এর প্রতিবাদে কৃষকরা তুমুল বিক্ষোভ শুরু করেন। ভুতগাড়ির মাঠসংলগ্ন সড়কে বিপুলসংখ্যক কৃষক অবস্থান নিলে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়।
আরও পড়ুন: আদাবরে যুবদল নেতাকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে জখম
জলঙ্গি থানার পুলিশ ও বিএসএফ যৌথভাবে জমায়েত ছত্রভঙ্গ করতে এলে কৃষকদের সঙ্গে তাদের ব্যাপক বচসা বাধে। শেষ পর্যন্ত পুলিশ প্রশাসন কৃষকদের চাষের জমি দখল না করার মৌখিক আশ্বাস দিলে কৃষকরা সড়ক ছেড়ে যান।
কৃষকরা জানিয়েছেন, বিএসএফ যদি তাদের চাষের জমি হাঁড়িয়ে অন্য কোনো স্থানে নিজেদের শিবির বানালে তাতে তাদের কোনো আপত্তি নেই। ডোমকল মহকুমার এই অঞ্চলের জমিতে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ একসঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চাষ করেন। পাশের হিন্দু গ্রামের কৃষকেরাও স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তারা কিছুতেই এই জমি ছাড়বেন না। বিএসএফ ও পুলিশ ক্রমশ এলাকার চাষিদের বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছে, আর জবরদখলের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারী কৃষকদের পুলিশ নানাভাবে হয়রানি করছে। জলঙ্গি এলাকার কৃষকরা পুলিশের ভয়ে তটস্থ হয়ে পড়েছেন।
এপিডিআর তাদের চিঠিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, পশ্চিমবঙ্গের জমি অধিগ্রহণ আইন অনুযায়ী, কৃষকদের অসম্মতিতে চাষের জমি অধিগ্রহণ করার এই চেষ্টা সম্পূর্ণ বেআইনি ও অসাংবিধানিক। বিএসএফ ও পুলিশ প্রতিবাদী কৃষকদের যেভাবে ভয়ভীতি দেখাচ্ছে, তা চরম অন্যায়।
এই জমি অধিগ্রহণের নেপথ্যে অত্যন্ত সুকৌশলে ‘বাংলাদেশি’ প্রসঙ্গ টেনে আনা হচ্ছে বলে এপিডিআর গুরুতর অভিযোগ তুলেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সীমান্ত থেকে ১৫ কিমি পর্যন্ত কার্যত বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়ার বিজ্ঞপ্তির আড়ালে মালদা, মুর্শিদাবাদ, নদীয়া এবং উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার সীমান্তে ‘হোল্ডিং’ বা ‘ডিটেনশন সেন্টার’ (আটক কেন্দ্র) নির্মাণের আসল উদ্দেশ্যই হলো চাষের জমি কেড়ে নেওয়া। কৃষকরা যাতে জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে না পারেন, সেই লক্ষ্যেই তাদের ভয় দেখাতে ‘বাংলাদেশি তকমা’ দেওয়ার মতো ভয়ংকর জনবিরোধী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তাদের ডিটেনশন ক্যাম্পে ঢোকানো বা মিথ্য মামলায় ঝুলিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে প্রতিনিয়ত।
আরও পড়ুন: শেরপুরে বাসের চাপায় সিএনজি যাত্রী নিহত, আহত ৪
এপিডিআরের বক্তব্য, মুর্শিদাবাদ থেকে বাংলাদেশি সন্দেহে বেশকিছু মানুষকে বিএসএফের মাধ্যমে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানো হয়েছে। মানবতাবিরোধী, বেআইনি ও অসাংবিধানিক এই ঠেলে পাঠানো অবিলম্বে বন্ধ করার দাবি জানিয়েছে এপিডিআর।
সংগঠনটি স্পষ্ট জানিয়েছে, এ পর্যন্ত ঠেলে পাঠানো সব মানুষের পরিচয় প্রকাশ করতে হবে এবং বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী বলে সাধারণ মানুষকে হেনস্তা করা বন্ধ করতে হবে। দেশের আইন অনুযায়ী সন্দেহ হলেই কাউকে দিনের পর দিন আটক রাখা যায় না। কেবল আদালতে আইনি প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশি প্রমাণিত হলেই কাউকে বাংলাদেশ সরকারের মাধ্যমে সে দেশে পাঠানো যেতে পারে।
জোর করে কৃষিজমি অধিগ্রহণের তীব্র বিরোধিতা করে এপিডিআর মুর্শিদাবাদ শাখা গত বৃহস্পতিবার মুর্শিদাবাদের জেলা প্রশাসকের দপ্তরে লিখিত স্মারকলিপি জমা দিয়েছে। জেলার অর্থনীতিতে ব্যাপক কু-প্রভাব ফেলা এই অধিগ্রহণ বাতিলের পাশাপাশি তাদের দাবি, মুর্শিদাবাদের সমস্ত আটক কেন্দ্র অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।
এপিডিআরের জেলা সম্পাদক রাহুল চক্রবর্তী প্রেস বিবৃতিতে জানিয়েছেন, দেশের নিরাপত্তা অবশ্যই দরকার, কিন্তু তার নামে সাধারণ চাষিদের রুটিরুজি কেড়ে নেওয়া কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। সংগঠনের নেতারা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, তাদের এই দাবিগুলো দ্রুত পূরণ না হলে আগামী দিনে সর্বস্তরের সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।
আরও পড়ুন: কোনো দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে পেলে কতদিন ক্ষমতায় থাকবেন নেতানিয়াহু?
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন