১২:৫০ পি.এম
গাজীপুরের কালিয়াকৈরে তৈরি পোশাক শ্রমিকদের তিন দফা দাবিতে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধের ফলে মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়ক কার্যত অচল হয়ে পড়ে। সকাল ৮টা থেকে চন্দ্রা, পল্লী বিদ্যুৎ, সফিপুর ও মৌচাক এলাকায় শ্রমিকেরা মহাসড়কে অবস্থান নিলে ঢাকা ও উত্তরবঙ্গের মধ্যে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে হাজার হাজার যাত্রী চরম দুর্ভোগে পড়েন। শ্রমিকদের তিন দফা দাবির মধ্যে রয়েছে তৈরি পোশাক শ্রমিকদের সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ, বিনা নোটিশে শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধ এবং ব্ল্যাকলিস্ট প্রথা বাতিল।
সরেজমিনে দেখা যায়, মহাসড়কের দুই পাশে যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাসের ভেতরে আটকে থাকা নারী, শিশু, বৃদ্ধ, রোগী ও শিক্ষার্থীরা অসহনীয় কষ্টের মুখে পড়েন। কারও হাতে জরুরি চিকিৎসার কাগজ ছিল, কারও গন্তব্যে পৌঁছানোর তাড়া ছিল, আবার কেউ কর্মস্থলে ফিরতে না পেরে দুশ্চিন্তায় সময় কাটাচ্ছিলেন।
অনেক যাত্রীকে ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও ক্লান্তি নিয়ে গাড়ির ভেতরেই অপেক্ষা করতে হয়। দীর্ঘ যানজটে আটকে থাকা মানুষের চোখেমুখে অসহায়ত্ব ও অনিশ্চয়তার ছাপ স্পষ্ট ছিল। বিশেষ করে অসুস্থ রোগী ও শিশুদের কষ্ট ছিল বর্ণনাতীত।
আরও পড়ুন: ওমান উপকূলে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা, নিহত এক ভারতীয় নাগরিক
পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় দুপুরের দিকে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন গাজীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. মজিবুর রহমান। তাঁর সঙ্গে ছিলেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ও বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-শ্রমবিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান।
তাঁদের নেতৃত্বে কয়েক হাজার নেতাকর্মী মহাসড়কে অবস্থান নেন এবং আন্দোলনরত শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলেন। শ্রমিকদের দাবি ও ক্ষোভের বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে মালিকপক্ষ ও সরকারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, "শ্রমিকেরা আমাদের দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি। তাঁদের ঘাম, শ্রম ও ত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে আছে দেশের তৈরি পোশাকশিল্প। একজন শ্রমিক যখন ন্যায্য মজুরি, চাকরির নিরাপত্তা ও সম্মানের দাবিতে রাস্তায় নামতে বাধ্য হন, তখন বিষয়টি আমাদের গভীরভাবে উপলব্ধি করতে হবে। আমি শ্রমিক ভাইদের বলতে চাই, আপনাদের ন্যায্য দাবির প্রতি আমাদের দৃষ্টি রয়েছে। কিন্তু মহাসড়ক অবরোধের কারণে হাজার হাজার সাধারণ মানুষ, রোগী, নারী, শিশু ও শিক্ষার্থী যে কষ্টের শিকার হচ্ছেন, সেটিও আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে। একজন অসুস্থ রোগী যদি যানজটে আটকে চিকিৎসা নিতে না পারেন, একটি শিশু যদি ঘণ্টার পর ঘণ্টা খাবার ও পানির কষ্টে থাকে, একজন কর্মজীবী মানুষ যদি জীবিকার তাগিদে গন্তব্যে পৌঁছাতে না পারেন, সেই কষ্ট আমাদের সবার কষ্ট। আমি চাই, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি আলোচনার মাধ্যমে সমাধান হোক। শিল্পকারখানা সচল থাকুক, শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত হোক এবং সাধারণ মানুষের চলাচলের পথ বন্ধ না হোক। সংঘাত নয়, আলোচনাই হোক সমাধানের পথ।"
এদিকে কালিয়াকৈর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এইচ এম প্রকরণ হোসাইন পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং জনদুর্ভোগ কমাতে প্রশাসনিক তৎপরতা অব্যাহত রাখেন।
আরও পড়ুন: পোশাক কারখানা বন্ধে ১ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতির আশঙ্কা
তিনি বলেন, "কালিয়াকৈর একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল। এখানে হাজার হাজার শ্রমিক কাজ করেন এবং প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক ব্যবহার করে যাতায়াত করেন। শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির বিষয়টি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সাধারণ মানুষের নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করাও প্রশাসনের দায়িত্ব। আজকের এই অবরোধে নারী, শিশু, বৃদ্ধ, রোগীসহ হাজার হাজার মানুষ যে দুর্ভোগের শিকার হয়েছেন, তা অত্যন্ত কষ্টদায়ক। বিশেষ করে জরুরি প্রয়োজনে যাঁরা রাস্তায় বের হয়েছেন, তাঁদের ভোগান্তি আমাদের ভাবিয়ে তুলেছে। আমরা চাই, শ্রমিকদের দাবি যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা হোক। কোনো অবস্থাতেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি বা সাধারণ মানুষের জানমালের ক্ষতি কাম্য নয়। প্রশাসন, শ্রমিক প্রতিনিধি, মালিকপক্ষ ও জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। সকল পক্ষকে ধৈর্য ও সংযমের সঙ্গে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার আহ্বান জানাচ্ছি।"
এমপি ও শ্রমিক নেতাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে বিকেলের দিকে শ্রমিকেরা শান্তিপূর্ণ মিছিলে অংশ নেন। একপর্যায়ে তাঁরা অবরোধ প্রত্যাহার করে নিজ নিজ কারখানায় ফিরে যেতে শুরু করেন। ফলে চন্দ্রা ও আশপাশের এলাকায় ধীরে ধীরে যান চলাচল স্বাভাবিক হতে থাকে।
তবে চন্দ্রা এলাকায় অবরোধ প্রত্যাহার হলেও যাত্রীদের দুর্ভোগ পুরোপুরি শেষ হয়নি। কালিয়াকৈর থেকে ভোগড়া বাইপাস পর্যন্ত মহাসড়কের কিছু অংশে যান চলাচল শুরু হলেও পরবর্তী অংশে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। শত শত বাস, কাভার্ডভ্যান ও ব্যক্তিগত যানবাহন আটকে থাকে।
মহাসড়কে আটকে থাকা যাত্রীদের অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "শ্রমিকদের দাবি থাকতেই পারে, তাঁদের ন্যায্য অধিকারও নিশ্চিত হওয়া জরুরি। কিন্তু সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে দাবি আদায়ের পরিস্থিতি তৈরি হলে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেতে হয় নিরীহ যাত্রীদের।"
আরও পড়ুন: টুঙ্গিপাড়ার ইউএনও’র মাদকবিরোধী আহ্বান, সুন্দর জীবন গড়ার পরামর্শ
কালিয়াকৈরের এই ঘটনা আবারও প্রশ্ন তুলেছে, শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি কীভাবে শিল্পাঞ্চলের স্বাভাবিক পরিবেশ ও মহাসড়কে মানুষের চলাচল সচল রাখা যায়।
একদিকে শ্রমিকের ঘামে গড়ে ওঠা শিল্প, অন্যদিকে সেই শিল্পাঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল হাজারো মানুষের জীবন-জীবিকা। তাই শ্রমিকদের দাবি, মালিকপক্ষের দায়িত্ব এবং সরকারের কার্যকর উদ্যোগ- সবকিছুর সমন্বয় এখন সময়ের দাবি।
স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও শ্রমিক নেতাদের প্রতি সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, ভবিষ্যতে যেন এমন পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি না ঘটে। কোনো শ্রমিক যেন ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত না হন, আবার কোনো যাত্রীকেও যেন রাস্তায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অসহায় অবস্থায় দিন কাটাতে না হয়।
আরও পড়ুন: রাজশাহীতে রেশম শিল্পের উন্নয়নে বিশেষ কমিটি গঠন
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন