০৫:০৩ পি.এম
প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষতার যুগে এসে, যখন গিগাবিট গতির ইন্টারনেটকে ভিত্তি করে ‘ডিজিটাল ইকোনমি’ গড়ে তুলছে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলো, বাংলাদেশের জন্য ধীরগতির ইন্টারনেটের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা হচ্ছে। বিগত এক দশকে দেশের ঘরে ঘরে ইন্টারনেট পৌঁছালেও, নাগরিকরা উচ্চগতি ও মানসম্মত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
সম্প্রতি, বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে দেশের ইন্টারনেট সেবার মানের করুণ চিত্র উঠে এসেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে মোবাইল ইন্টারনেটের গতিতে ১০৩টি দেশের মধ্যে ৯১তম এবং ফিক্সড ব্রডব্যান্ডে ১৪১টি দেশের মধ্যে ৯৩তম অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ।
বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত ‘দি আনফিনিশড ডিজিটাল রেভল্যুশন: এক্সপান্ডিং ইন্টারনেট অ্যাকসেস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্চগতির ইন্টারনেট এখন যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং একটি দেশের উৎপাদনশীলতা, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, উদ্ভাবন ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। দেশের প্রায় সব জায়গায় ইন্টারনেটে সংযোগের আওতায় এলেও, ব্যক্তিগত ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম।
আরও পড়ুন: দুর্গাপূজা নিয়ে জামায়াত-শিবির-এনসিপির রাজনীতি: ছাত্রদল সেক্রেটারি নাছির উদ্দীন নাছির
বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন অনুসারে, দেশের অধিকাংশ জনগণের কাছে নেটওয়ার্ক পৌঁছালেও, উচ্চমূল্যের ডিভাইস, ডেটা প্যাকেজ ও ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাবের কারণে অনেক মানুষ এখনও ইন্টারনেট ব্যবহারের বাইরে রয়েছে। ২০২৪ সালে ফোরজি মোবাইল নেটওয়ার্ক দেশের ১০০ ভাগ জনগণের আওতায় পৌঁছাতে পারলেও, বাস্তবে ইন্টারনেট ব্যবহার করেনি মাত্র ৫৩ শতাংশ মানুষ।
অর্থাৎ নেটওয়ার্ক কাভারেজ থাকা সত্ত্বেও প্রতি নয়জনের মধ্যে তিনজন এখনও অনলাইনে নেই। এটি স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, কেবল অবকাঠামো নির্মাণ করলেই প্রকৃত ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত হয় না। নেটওয়ার্ক সুবিধা থাকা সত্ত্বেও কেন মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করছেন না, সে কারণগুলো বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কার্যকর ও ন্যায়সংগত নীতি গ্রহণের মাধ্যমে মানুষের জন্য অর্থবহ ইন্টারনেট ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে এসব প্রতিবন্ধকতাগুলো চিহ্নিত করতে হবে।
বিশ্ব ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ২৭টি দেশে অর্ধেকের বেশি মানুষ জীবনে কখনো মোবাইল ফোনের মাধ্যমে এসএমএস পাঠায়নি; বাংলাদেশও ওই তালিকায় রয়েছে।
অবশ্য, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) দাবি, দেশে এখন ব্যক্তিগত পর্যায়ে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৫৮ দশমিক ৬ শতাংশ, যা এক বছরের ব্যবধানে বেড়েছে ৫ শতাংশ। মোবাইল ব্যবহারকারীর সংখ্যাও বেড়েছে, দেশে এখন ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৮৯ দশমিক ৫ শতাংশ।
আরও পড়ুন: টেকনাফে অপহৃত মাদ্রাসাছাত্র সিফাত উদ্ধার, দুই অপহরণকারী গ্রেফতার
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইন্টারনেট সংযোগ ও গতির নাজুক অবস্থা এবং ডিজিটাল অবকাঠামোর দুর্বলতা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করছে। এর প্রভাব পড়ছে বিনিয়োগ, রফতানি, প্রযুক্তিনির্ভর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, ফ্রিল্যান্সিং, স্টার্টআপ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং সরকারি ডিজিটাল সেবার সম্প্রসারণেও। বর্তমানে সরকার যখন নগদ অর্থের ব্যবহার কমিয়ে ক্যাশলেস সমাজ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে, তখন ধীরগতির ইন্টারনেট বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তাদের মতে, ডিজিটাল পেমেন্ট, মোবাইল আর্থিক সেবা, অনলাইন ব্যাংকিং, পয়েন্ট অব সেল ও কিউআর কোডভিত্তিক লেনদেন নিরবচ্ছিন্ন সংযোগের ওপর নির্ভরশীল। ইন্টারনেটের গতি কম থাকলে লেনদেন সম্পন্ন হতে দেরি, সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া, পেমেন্ট ব্যর্থ হওয়া এবং একই লেনদেন একাধিকবার সম্পন্ন হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এতে গ্রাহক ও ব্যবসায়ীদের আস্থা হ্রাস পাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে দেশে এখনই ডিজিটাল অর্থনীতিতে বড় ধরনের রূপান্তর ঘটানো প্রয়োজন।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের মতো নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে ইন্টারনেটের আওতা বাড়লেও সে অনুপাতে ইন্টারনেটের গতি বাড়ছে না। বিপরীতে উন্নত ও দ্রুত অগ্রসরমান অর্থনীতির দেশগুলোতে ইন্টারনেট ব্যবহারের পাশাপাশি সংযোগের গতিও দ্রুত বাড়ছে। সিঙ্গাপুর, আরব আমিরাত, হংকং, কুয়েত, কাতারসহ বিভিন্ন দেশে ইন্টারনেটের গতি সবচেয়ে বেশি।
আরও পড়ুন: শজিমেক হাসপাতালে অপারেশন থিয়েটারে এসি বিস্ফোরণ, হতাহতের খবর নেই
প্রতিবেদনে দেশভিত্তিক মধ্যম ডাউনলোড গতির (মেগাবিট প্রতি সেকেন্ড) তথ্য দেয়া হয়েছে। সেখানে দেখা যায়, মোবাইল ইন্টারনেট গতিতে সংযুক্ত আরব আমিরাত সবার ওপরে রয়েছে, দেশটির ইন্টারনেট গতি সেকেন্ডে ৬৮১ মেগাবিট। সিঙ্গাপুরে ইন্টারনেট গতি ৪২১ এমবিপিএস। এমনকি নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ ভিয়েতনামে প্রায় ১৮৮ এমবিপিএস। বাংলাদেশে মোবাইল ইন্টারনেটের গতি ৪৩ মেগাবিট, অন্যদিকে ব্রডব্যান্ডে গতি ৬৬ মেগাবিট। মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডেও ব্রডব্যান্ডের গতি বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি।
বিশ্বব্যাংক বলছে, একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্তরের সঙ্গে ইন্টারনেট ব্যবহারের হার ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। উচ্চ আয় দেশের প্রায় ৯৪ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করে। নিম্ন আয় দেশের মাত্র ২৩ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করে। অর্থাৎ প্রতি চারজনে একজনেরও কম মানুষ অনলাইনে যুক্ত।
নিম্নমধ্যম আয়ের দেশগুলোয় ইন্টারনেট ব্যবহার ও গতি কম থাকার অন্যতম কারণ হিসেবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্চ আয় ও নিম্ন আয় উভয় ধরনের দেশেই গ্রামীণ এলাকায় ইন্টারনেট ব্যবহারের হার শহরের তুলনায় পিছিয়ে। এর প্রধান কারণ হলো অবকাঠামোগত ঘাটতি ও তুলনামূলক কম আয়। বাংলাদেশের গ্রামীণ এলাকায় ইন্টারনেট সংযোগ ও গতি কম রয়েছে, যার কারণে মানুষ বাজারসংক্রান্ত তথ্য, কৃষিসহায়তা, ডিজিটাল পেমেন্ট, টেলিহেলথ এবং বিভিন্ন সরকারি সেবা ও কর্মসূচিতে সহজে প্রবেশাধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। নিম্নমধ্যম আয়ের দেশগুলোতেও গ্রামীণ এলাকার প্রায় অর্ধেক মানুষ এখনো ইন্টারনেট সুবিধার বাইরে রয়েছে। দরিদ্র দেশগুলোতে এই বৈষম্য আরও প্রকট।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ধীরগতির মোবাইল ইন্টারনেট কেবল ব্যবহারকারীদের ভোগান্তিই বাড়ায় না, বরং এটি অর্থনীতির বিভিন্ন খাতের উৎপাদনশীলতা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বিনিয়োগ প্রবাহকেও বাধাগ্রস্ত করছে। নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে ইন্টারনেট সংযোগের সীমাবদ্ধতা ও ধীরগতি তাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
আরও পড়ুন: সরকারি হাসপাতালে রোগীদের দৈনিক খাবারের বরাদ্দ ২৫০ টাকা
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন