০৮:৫৩ এম
ভারতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে জাতীয় রাজনীতি যখন উত্তাল, তখন ভোটার তালিকা সংশোধনের বিষয়টি নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি উজ্জ্বল ভূইয়াঁ। তিনি বলেন, "কোনো ব্যক্তি নাগরিক থাকবেন, অথচ ভোট দিতে পারবেন না- এমন ব্যবস্থা একেবারে সংবিধানের ভিতেই আঘাত করে।" তিনি আরও উল্লেখ করেন, কোটি কোটি ভারতীয় নাগরিক যদি ভোটাধিকার হারান, তাহলে সেই প্রক্রিয়া স্বাভাবিকভাবেই খামখেয়ালি ও স্বেচ্ছাচারী হিসেবে গণ্য হবে। বিচারপতি ভূইয়া বলেন, "পাল্টা অভিযোগ তুলে বা নজর ঘুরিয়ে এ ত্রুটিপূর্ণ প্রক্রিয়াকে কোনোভাবেই ন্যায্য বলা যায় না।"
রবিবার হায়দরাবাদের নালসার আইন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিচারপতি বোধরাজ সাহনি স্মারক প্রতিযোগিতার সমাপ্তি অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দেন বিচারপতি ভূইয়া। সেখানে তিনি ভোটাধিকারের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, নাগরিকের পরিচয় থেকে ভোট দেওয়ার অধিকার কিংবা ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার অধিকার আলাদা করা যায় না। তিনি বলেন, "এটা হবে শরীর থেকে আত্মাকে বের করে নেওয়ার মতো।"
এসআইআর সংক্রান্ত একটি আবেদন ইতোমধ্যে সুপ্রিম কোর্টে জমা পড়েছে। এই প্রেক্ষাপটেও বিচারপতির বক্তব্যের তাৎপর্য রয়েছে। তবে এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তৃতা; এটি কোনো মামলায় সুপ্রিম কোর্টের রায় বা নির্দেশ নয়।
আরও পড়ুন: কাতারের শান্তি প্রস্তাব নাকচ, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন হামলার শঙ্কা
‘নিজের দেশেই দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক’
বিচারপতি ভূইয়াঁর বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল একটি মৌলিক প্রশ্ন- নাগরিকত্ব বহাল রেখে বিপুল সংখ্যক মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হলে গণতন্ত্রের অবশিষ্ট থাকে কী? তিনি বলেন, "কোনও প্রক্রিয়ার ফলে যদি কোটি কোটি ভারতীয় নাগরিক ভোটাধিকার হারান, ভোটাধিকারহীন নাগরিক হিসেবে নিজের দেশেই দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত হন, তা হলে সেই প্রক্রিয়া অন্তর্নিহিত ভাবেই স্বেচ্ছাচারী।" তিনি আরও বলেন, "কোনও ধরনের প্রসঙ্গ টেনে এনে তাকে ন্যায্য করা যায় না।"
তিনি ইংরেজিতে ‘হোয়াটঅ্যাবাউটারি’ শব্দটি ব্যবহার করেন, যা একটি নির্দিষ্ট প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে অন্য ঘটনা বা অন্যের কাজ সামনে এনে মূল প্রশ্ন থেকে নজর সরানোর কৌশল বোঝায়। বিচারপতি ভূইয়ার বক্তব্য স্পষ্ট, বিপুল সংখ্যক নাগরিকের ভোটাধিকার হরণের প্রশ্নকে এভাবে পাশ কাটানো যায় না।
তিনি আরও বলেন, এমন প্রক্রিয়া ‘সংবিধানের একেবারে হৃদয়ে আঘাত করে’। বিচারপতির মতে, এটি ভারতীয় সংবিধানের অধীনে গৃহীত সাংবিধানিক ব্যবস্থার অস্বীকৃতিও বলা যায়।
আরও পড়ুন: গণভোটের রায় না মানলে তারেক রহমানের ক্ষমতায় থাকার অধিকার নেই: জুনায়েদ
ভোটের অধিকার সমতার ভিত্তি
ভোটাধিকার কেন এত গুরুত্বপূর্ণ, তা বোঝাতে বিচারপতি ভূঁইয়া সংবিধানের ৩২৫ ও ৩২৬ অনুচ্ছেদের প্রসঙ্গ তোলেন। ৩২৫ অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, লোকসভা বা রাজ্যের আইনসভার নির্বাচনের জন্য প্রতিটি আঞ্চলিক নির্বাচনী কেন্দ্রে একটি সাধারণ ভোটার তালিকা থাকবে। ধর্ম, বর্ণ, জাত বা লিঙ্গের কারণে কাউকে সেই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার অযোগ্য বলা যাবে না।
৩২৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, লোকসভা ও রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন হবে প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের ভিত্তিতে। বিচারপতি জানান, ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সের ভারতীয় নাগরিক, যিনি সংবিধান বা উপযুক্ত আইনসভার তৈরি আইনে নির্ধারিত কারণে অযোগ্য নন, তিনি ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হওয়ার অধিকারী। তিনি বাসস্থান-সংক্রান্ত অযোগ্যতা, মানসিক অসুস্থতাজনিত আইনগত অযোগ্যতা, অপরাধ কিংবা দুর্নীতিপূর্ণ বা বেআইনি আচরণের মতো নির্দিষ্ট ভিত্তির কথাও উল্লেখ করেন।
অর্থাৎ ভোটার হওয়ার যোগ্যতা ও অযোগ্যতার সাংবিধানিক কাঠামো রয়েছে। সেই কাঠামোর আলোচনাতেই কোটি কোটি নাগরিককে নির্বিচারে ভোটাধিকারহীন করে দেওয়ার বিরুদ্ধে সতর্ক করেছেন বিচারপতি।
আরও পড়ুন: বিয়ের ১৫ দিনের মাথায় সড়কে প্রাণ গেল ইতালি প্রবাসী তানভীরের
‘ধনকুবের ও রিকশাচালকের ভোটের দাম সমান’
ভোটাধিকার যে কেবল নির্বাচনী আনুষ্ঠানিকতা নয়, সমাজের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলানোর হাতিয়ারও, তা বোঝাতে সরাসরি উদাহরণ দেন বিচারপতি ভূঁইয়া। তিনি বলেন, "একজন ধনকুবের হতে পারেন, আর একজন রিকশাচালক। কিন্তু দু’জনেরই ভোট থাকবে এবং তাঁদের ভোটের মূল্য হবে সমান।"
একইভাবে সামাজিকভাবে উচ্চ অবস্থানে থাকা মন্দিরের পুরোহিত এবং সমাজের সবচেয়ে নীচের স্তরে থাকা, হাতে মানববর্জ্য পরিষ্কারের কাজে বাধ্য হওয়া ব্যক্তির ভোটেরও সমান মূল্য। বিচারপতির মতে, এটাই ভারতীয় সংবিধানের সমাজ বদলের দৃষ্টিভঙ্গি। তিনি বলেন, সম্পদ, সামাজিক মর্যাদা কিংবা পেশার ভিত্তিতে ভোটের ওজন বদলায় না। এই সমান ভোটাধিকার গ্রহণকে ভারতে সাম্য প্রতিষ্ঠার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেন তিনি।
ভারতে প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের ধারণার ইতিহাসও তুলে ধরেন বিচারপতি ভূঁইয়া। তিনি জানান, ১৮৯৫ সালের ‘কনস্টিটিউশন অফ ইন্ডিয়া বিল’, যা ‘স্বরাজ বিল’ নামেও পরিচিত, সেখানে এই ভাবনার প্রাথমিক প্রকাশ পাওয়া যায়। গণপরিষদের বিতর্কের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, খসড়া সংবিধানের ২৮৯এ এবং ২৮৯বি অনুচ্ছেদই পরে যথাক্রমে ৩২৫ ও ৩২৬ অনুচ্ছেদ হয়েছে।
আরও পড়ুন: ক্ষমতা হারালেই কি গ্রেফতার হবেন নেতানিয়াহু?
বি আর আম্বেদকরের বক্তব্যের উল্লেখ করে বিচারপতি জানান, ভোটাধিকার ও প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের ভিত্তি সংবিধানে স্পষ্টভাবে লিখে রাখার প্রয়োজন ছিল। তা সংসদীয় আইন প্রণয়নের খেয়ালখুশির ওপর ছেড়ে দেওয়ার বিষয় নয়।
বিচারপতি ভূইয়াঁর মতে, দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং বিদেশি শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পরে সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকার গ্রহণ ছিল স্বাভাবিক সিদ্ধান্ত। ভারত যে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা বেছে নিয়েছে, তার অপরিহার্য উপাদান এটি। সেই কারণেই নাগরিকের ভোটাধিকার হরণ নিছক তালিকা সংশোধনের বিষয় নয়। তা সমতা, নাগরিকের মর্যাদা এবং সাংবিধানিক ব্যবস্থার ভিত্তি রক্ষারও প্রশ্ন। সূত্র : দ্য ওয়াল।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন