০৯:১৩ পি.এম
টান পড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডারে! অতিসম্প্রতি ইরানে নতুন করে হামলা চালিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের বিপদ ডেকে আনছে কি না, এই বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ, প্রায় ৫ মাস ধরে চলা ইরান যুদ্ধের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রধান অস্ত্রের ভাণ্ডারে টান পড়েছে।
বর্তমান হারে যদি ইরানে হামলা চলতেই থাকে, তাহলে অস্ত্রের মজুদ সংকট আরো তীব্র হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের মজুদ ইরান যুদ্ধের আগের অবস্থায় ফেরত নিতে ৩ বছরেরও বেশি সময় লাগবে।
বিশেষজ্ঞরা মন্তব্য করেছেন, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে চীন বা উত্তর কোরিয়ার দিক থেকে ঝুঁকি এলে তা মোকাবিলায় মার্কিন সামরিক সক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলবে। মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএন সামরিক বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলাপ করে এই আশঙ্কার কথা জানিয়েছে।
আরও পড়ুন: দুই সন্তানকে হত্যার পর মায়ের আত্মহত্যা, ওড়না পেঁচিয়ে
থিংক ট্যাংক ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইনটেরন্যাশনাল স্টাডিজ’-সিএসআইএস-এর প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক, অবসরপ্রাপ্ত মেরিন কর্পস কর্নেল মার্ক কানসিয়ান বলেছেন, ‘গত পাঁচ দিন ধরে যেভাবে যুদ্ধ চলছে, তা যদি এই রকমই চলতে থাকে, তবে এটি অস্ত্রের মজুদ এতটাই কমিয়ে দেবে যে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ঝুঁকির একটি নতুন ও উচ্চতর স্তর তৈরি করবে।’
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশন থিংক ট্যাঙ্কের পররাষ্ট্রনীতি গবেষণা প্রধান মাইকেল ও’হানলন বলেছেন, ‘অস্ত্রের মজুদ যে আমাদের পছন্দের চেয়ে কম হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।’
ইরান যুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায় থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনী দূরপাল্লার হামলা এবং শত্রুর বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে রক্ষা পেতে হাজার হাজার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। কিন্তু সাপেক্ষে নতুন অস্ত্রভাণ্ডারে যুক্ত হয়নি।
সিএসআইএস-এর বিশ্লেষণের দাবি, গত এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ যখন সাময়িকভাবে বন্ধ হয়েছিল; তখন পর্যন্ত পেন্টাগন তাদের থাড ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ইন্টারসেপ্টরের অন্তত অর্ধেক, প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ইন্টারসেপ্টরের প্রায় অর্ধেক এবং টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের অন্তত ৩০ শতাংশ ব্যবহার করে ফেলেছে। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর পুনরায় মজুতকরণের হার খুবই ধীরগতির। চলতি অর্থবছরের সরবরাহ সূচি অনুযায়ী, পেন্টাগন প্রতি মাসে আনুমানিক ১৫টি নতুন টমাহক এবং ২০টি নতুন প্যাট্রিয়ট ক্ষেপাণাস্ত্র পাচ্ছে। ২০২৬ সালে কোনো থাড সরবরাহের পূর্বাভাস নেই। সিএসআইএস-এর ধারণা, মার্কিন অস্ত্রের মজুদ ইরান যুদ্ধের আগের স্তরে ফিরে আসতে তিন বছর বা তার থেকে বেশি সময় প্রয়োজন।
আরও পড়ুন: ককরোচদের মোকাবিলায় এবার ‘লাল হিট’
পেন্টাগনের সাবেক ডেপুটি এবং অ্যাক্টিং কমপ্ট্রোলার, বর্তমানে আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো এলেন ম্যাককাস্কার জানিয়েছেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে অস্ত্রের পুনরায় মজুত করার সময়কাল বছর দিয়ে হিসাব করতে হবে, এক্ষেত্রে দুই থেকে পাঁচ বছর লাগবে।
এটি সঙ্কটের বিষয় নয়, নতুন করে অস্ত্র তৈরির জন্য অর্থ পেতেও সমস্যায় পড়ছে ট্রাম্প প্রশাসন। অবসরপ্রাপ্ত দুই তারকা জেনারেল জন ফেরারি, যিনি বর্তমানে আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের সাথে যুক্ত, জানিয়েছেন, যুদ্ধে জড়িয়ে যাওয়ার পর থেকে একটি ক্ষেপণাস্ত্রও প্রতিস্থাপনের জন্য কংগ্রেস একটি ডলারও বাড়তি বরাদ্দ দেয়নি।
পেন্টাগনের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, প্রতিরক্ষা দপ্তর প্রতিরক্ষা শিল্প ভিত্তি দ্রুত সম্প্রসারণ করার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন ত্বরান্বিত করতে এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করতে, ট্রাম্প জুনে ডিফেন্স প্রোডাকশন অ্যাক্ট প্রয়োগ করেছেন। প্রতিরক্ষা দপ্তর উৎপাদন লাইন সম্প্রসারণের জন্য নির্মাতাদের সঙ্গে চুক্তি করেছে। ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক চাহিদার মধ্যে জার্মানি এবং ইউক্রেনের মতো অন্যান্য দেশগুলোকে অভ্যন্তরীণভাবে প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির লাইসেন্স চুক্তি দেওয়া হলে তা মার্কিন উৎপাদন লাইনের ওপর চাপ কমাতে পারে। তুরস্কে ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনের ফাকে কথা বলার সময়, ট্রাম্প বৃহস্পতিবার ইউক্রেনের জন্য এই লাইসেন্সের ঘোষণা দিয়েছেন।
মোদ্দা কথা হলো, অস্ত্রের মজুদ বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্র তাদের সম্ভাব্য সব উৎস ব্যবহারের চেষ্টা করছে। কিন্তু সমস্যা হলো, যত চুক্তিই হোক বা অনুমতি দেয়া হোক, রাতারাতি অস্ত্র তৈরি সম্ভব নয়। যে কোনো প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে কিছুটা সময় প্রয়োজন হয়। জাপানে প্যাট্রিয়ট কারখানা তৈরি করতে তিন বছর সময় লেগেছিল। ২০২২ সালে উৎপাদন লাইনে কাজ শুরু করার পরও জার্মানি এখন পর্যন্ত একটিও প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে পারেনি।
আরও পড়ুন: ইয়েমেনে ২৪ ঘণ্টায় সউদী বাহিনীর ১১০ হামলার দাবি
যুদ্ধবিরতি মার্কিন অস্ত্রভান্ডারে কিছুটা স্বস্তি এনেছিল। তবে নতুন করে যুদ্ধের তীব্রতা অস্ত্রের মজুতের বিষয়টির আলোচনা আবার শুরু করেছে। অস্ত্রের মজুদের যে অবস্থা রয়েছে, তাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগ্রাসী হুমকির সাথে তাল মিলিয়ে কতদিন বর্তমান তীব্রতায় হামলায় অব্যাহত রাখতে পারবে, সে বিষয় নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন