০৯:৪৮ এম
মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে বাংলাদেশের কর্মী পাঠানোয় সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছিল করোনা মহামারির সময়।
এরপর ধীরে ধীরে বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাত ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করলে, সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধের প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যজুড়েও ছড়িয়ে পড়ে।
ফলে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় বাংলাদেশের কর্মী পাঠানোয় আবারও বড় ধাক্কা লেগে সংকটে পড়ে এই খাত। অন্যদিকে, যুদ্ধের কারণে কাজ হারিয়ে বহু শ্রমিক দেশে ফেরত আসতে হয়। এ কারণে দেশের বৈদেশিক শ্রমবাজার ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ক্ষেত্র নতুন করে হুমকির মুখে পড়ে।
আরও পড়ুন: পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ কমাতে ব্যাংক পর্ষদে নতুন ব্যবস্থা নিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক
সূত্র মতে, চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে সৌদি আরব, কুয়েত ও কাতারের মতো দেশগুলোয় নতুন কর্মীর চাহিদা ব্যাপক হারে কমে যায়।
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যানুযায়ী, গত মার্চ থেকে মে পর্যন্ত তিন মাসে বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য গেছেন এক লাখ ৫৩ হাজার ৬৩৬ জন বাংলাদেশি কর্মী। অথচ এর আগের বছর একই সময় এই সংখ্যা ছিল দুই লাখ ২৬০ হাজার ৪৩৮ জন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বিদেশগামী কর্মীর সংখ্যা কমেছে প্রায় ৪১ শতাংশ।
শ্রমবাজার বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে অবকাঠামো নির্মাণ, পর্যটন, সেবা ও বাণিজ্য খাতের অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন কর্মী নিয়োগে সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করেছে।
এ কারণে নতুন করে শ্রমিক নেওয়ার অনুমোদনের হার কমতে শুরু করেছে। একই সঙ্গে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে মধ্যপ্রাচ্যগামী শত শত ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় নতুন কর্মীদের বিদেশযাত্রাও বিলম্বিত হতে থাকে। আগে যেখানে ন্যূনতম বিমানভাড়া ছিল ৫০ থেকে ৫৫ হাজার টাকা, ফ্লাইটসংকটের কারণে তা এখন বেড়ে ৯০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা ছাড়িয়েছে।
আরও পড়ুন: ঢামেকে অ্যাম্বুলেন্স ধর্মঘটে মরদেহ পরিবহনে বিপাকে স্বজনরা, রোগীরাও ভোগান্তিতে
বিএমইটির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশের শ্রমবাজারের বড় অংশই মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমান বাংলাদেশের প্রধান শ্রমবাজার।
এর মধ্যে বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক শ্রমিক যান সৌদি আরবে। ২০২৫ সালে বিদেশে যাওয়া মোট কর্মীর প্রায় সাত লাখ ৫২ হাজার গেছেন শুধু সৌদি আরবে। এর বাইরে কাতারে যান এক লাখ ৬৯ হাজার, কুয়েতে যান ৪২ হাজার ৪৯৬ জন।
অন্যদিকে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে গতকাল ৫ জুন পর্যন্ত বিদেশে গেছেন তিন লাখ ১৪ হাজার ৩৬২ জন বাংলাদেশি কর্মী। এর মধ্যে সৌদি আরবে গেছেন এক লাখ ৯০ হাজার ৭২ জন, কাতারে গেছেন ২৩ হাজার ৭৮০ জন, কুয়েতে আট হাজার ৭৫৩ জন, জর্ডানে সাত হাজার ৩৫৩ জন, আরব আমিরাতে সাত হাজার ১২১ জন এবং ইরাকে তিন হাজার ৯১ জন। এ থেকেই বেরিয়ে আসে মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশি কর্মী যাওয়ার তুলনামূলক চিত্র।
এর আগের বছরগুলোয় অর্থাৎ করোনার পর ২০২২ সালে মোট ১১ লাখ ২৬ হাজার ৩৬৮ জন বাংলাদেশি কর্মী বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য গেছেন। এর মাঝে সৌদি আরব ছিল সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার, যেখানে গেছেন তিন লাখ ৯১ হাজার ৩০২ জন কর্মী। ওমানে এক লাখ ৬৩ হাজার ২১ জন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে গেছেন ৭৭ হাজার ৪৭৬ জন, কুয়েতে ২৯ হাজার ৯ জন এবং কাতারে ২৭ হাজার ৬৬৩ জন।
আরও পড়ুন: তারেক রহমান: জামায়াত-এনসিপি আমার রাষ্ট্রীয় সম্মান সহ্য করতে পারছে না
২০২৩ সালে সর্বোচ্চসংখ্যক কর্মী পাঠায় বাংলাদেশ। সরকারি হিসাবে ১৩ লাখ পাঁচ হাজার ৪৫৩ জন কর্মী বিদেশে যান। এর মধ্যে সৌদি আরবে চার লাখ ৯৭ হাজার ৬৭৪ জন, ওমানে এক লাখ ২৭ হাজার ৮৮৩ জন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৯৮ হাজার ৪২২ জন, কাতারে ৫৬ হাজার ১৪৮ জন, কুয়েতে ৩৬ হাজার ৫৪৮ জন, জর্ডানে আট হাজার ৬২৬ জন বাংলাদেশি কর্মী গেছেন।
২০২৪ সালে মোট ১০ লাখ ১০ হাজার ৯০৮ জন শ্রমিক বিদেশে গেছেন। এর মধ্যে সৌদি আরবে গেছেন ছয় লাখ ২৭ হাজার ৮১২ জন, কাতারে ৭৪ হাজার ৪৬৪ জন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) ৪৭ হাজার ১৫৮ জন, কুয়েতে ৩৩ হাজার ১৫ জন, জর্ডানে ১৫ হাজার ৪১০ জন এবং লেবাননে চার হাজার ২৩০ জন।
সংযুক্ত আরব আমিরাতপ্রবাসী শরিফুল হক জানান, দুবাইয়ে একটি রেস্তোরাঁ চালান তিনি। তাঁর মতে, ভালো আয় হচ্ছিল। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের সরাসরি প্রভাব পড়েছে আরব আমিরাতে। সেখানে ইরানের হামলার পর দীর্ঘদিন ধরে তাঁর রেস্তোরাঁটি বন্ধ রাখতে হয়। যুদ্ধ পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলেও, এখনো অবস্থার উন্নতি হয়নি। এতে এখন রেস্তোরাঁ খুললেও বিক্রি নেই। ফলে তাঁর আয়-রোজগারে বড় টান পড়েছে। বর্তমান আয় দিয়ে রেস্তোরাঁ চালানো কষ্টদায়ক হয়ে পড়েছে। দেশে পরিবারকে টাকাও পাঠাতে পারছেন না তিনি।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় বাংলাদেশি কর্মী যাওয়ার বর্তমান পরিস্থিতির বিষয়ে জানতে চাইলে অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশের (আটাব) সেক্রেটারি মাজহারুল ভূইয়া গতকাল বলেন, ‘আমাদের সৌদি আরব রুটটা এখন অনেকটা বন্ধের মুখে। কারণ মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে বর্তমান পরিস্থিতিতে ওখানে কাজ করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কুয়েতে যেসব ভিসা হচ্ছে, সেগুলো পুরনো। নতুন করে ভিসা হওয়া প্রায় বন্ধ। করোনা যাওয়ার পর মানুষ যখন একটু সোজা হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা শুরু করছিল, তখনই শুরু হয় মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ। ফলে আজ ফ্লাইট ক্যানসেল হয়তো কাল নতুন শিডিউল। মানুষ যেতে চাইলেও বর্তমানে বিমানভাড়া অনেক বেশি। আগে যেখানে ন্যূনতম ভাড়া ছিল ৫০ থেকে ৫৫ হাজার টাকা, তা এখন বেড়ে হয়েছে ৯০ হাজার থেকে এক লাখ টাকার ওপরে।’
আরও পড়ুন: আদাবরে যুবদল নেতাকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে জখম
পর্যটন ভিসার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ওমান ও দুবাইয়ের ভ্রমণ ভিসা অনেক দিন ধরে বন্ধ। আর বর্তমানে সৌদি আরবে শুধু ওমরাহ ভিসা ছাড়া অন্য সব ভিসার ক্ষেত্রে স্থবিরতা চলছে। যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত কম্পানিগুলো অনিশ্চয়তার কারণে নতুন লোক নিতে চাচ্ছে না। বিমানের জ্বালানির দাম বেড়ায় ভাড়াও বাড়ছে। ফলে এজেন্সির ব্যবসা ও ট্রাভেল ট্রেডের ওপর চারদিক থেকে বড় ধাক্কা লেগেছে।’
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বলেন, ‘বাংলাদেশের শ্রমবাজার মূলত দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক এবং সবচেয়ে বড় নির্ভরতা সৌদি আরবের ওপর। কিন্তু নীতিনির্ধারণী জায়গায় শ্রমবাজারকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে সম্প্রসারণ, ঝুঁকি কমানো বা বিকল্প বাজার তৈরির মতো কাঠামোগত উদ্যোগ যথেষ্ট দৃশ্যমান হয়নি। সরকারি আলোচনা থাকলেও, শ্রম অভিবাসনের বড় অংশই এখনো প্রাইভেট এজেন্সি ও ব্যক্তিগত নেটওয়ার্কে চলছে। ফলে বড় কোনো সংকট এলে বিকল্প বাজার প্রস্তুত না থাকায় বাংলাদেশকে সরাসরি ধাক্কা খেতে হচ্ছে। বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা শ্রমিকদের কাজের নিরাপত্তা ও বেতন নিয়মিত হওয়া নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে, যা দীর্ঘ মেয়াদে আমাদের রেমিট্যান্স প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করবে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় শক্তিশালী দ্বিপক্ষীয় চুক্তি কাঠামো ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই।’
ব্র্যাক অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘অদক্ষ শ্রম অভিবাসন ও রেমিট্যান্সের চোরাবালি থেকে বের হওয়ার বিকল্প ভাবনার সময় এখনই। গত পাঁচ বছরে সৌদি আরবে প্রায় ২০ থেকে ২৫ লাখ কর্মী যাওয়ার পরও আমাদের রেমিট্যান্স উল্টো কমে সাড়ে তিন থেকে চার বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়ের কারণে বিপুল পরিমাণ অর্থ প্রকৃতপক্ষে দেশ থেকে পাচার ও লুটপাট হয়ে গেছে। এ ছাড়া টাঙ্গাইল, কুমিল্লা, মুন্সীগঞ্জের মতো প্রবাসী-প্রধান এলাকায় তীব্র কৃষি শ্রমিক সংকট দেখা দিচ্ছে, যা উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। মাদারীপুরের মতো জেলা থেকে লাখ লাখ টাকা খরচ করে সাগরপথে লিবিয়া হয়ে ইতালি গিয়ে মানুষ নিঃস্ব হচ্ছে অথচ জেলাটি দরিদ্রই রয়ে গেছে।’
তিনি আরো যোগ করেন, ‘সরকার কত লাখ কর্মী পাঠাল সেই হিসাব বন্ধ করে তারা কতটুকু দক্ষ এবং কতটুকু রেমিট্যান্স পাঠাতে পারছে, সেই হিসাব করতে হবে। আমাদের সামনে আগামী ২০ থেকে ২৫ বছর ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা সুবর্ণ সময় রয়েছে, এরপর আমাদের জনসংখ্যা প্রবীণ হতে শুরু করবে। তাই শিক্ষা ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষাকে সম্পূর্ণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের বিকল্প হিসেবে সাম্প্রতিক যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত ইরানের মতো নতুন পুনর্গঠন বাজারে কর্মী পাঠানোর কূটনৈতিক উদ্যোগ এখনই নিতে হবে।’
আরও পড়ুন: শেরপুরে বাসের চাপায় সিএনজি যাত্রী নিহত, আহত ৪
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে ইরান ও বাহরাইন থেকে দেশে ফিরে এসেছেন বেশ কিছু কর্মী। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে চলতি বছরের এ পর্যন্ত ইরান থেকে সরকারি সহায়তায় মোট ২০১ জন বাংলাদেশি দেশে ফিরেছেন। আর বাহরাইন থেকে ফিরেছেন ২৮২ জন কর্মী।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন