০২:২৮ পি.এম
মাউন্ট এভারেস্টের চূড়ার নিকট প্রায় ৩০ বছর ধরে পড়ে থাকা ‘গ্রিন বুটস’ নামে পরিচিত একটি মৃতদেহ এবার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু করেছে ভারত। কর্তৃপক্ষের ধারণা, মৃতদেহটি সেই ১৯৯৬ সালে এভারেস্টে তুষারঝড়ে নিহত ভারতীয় পর্বতারোহী দোরজে মোরুপের।
এভারেস্টে পড়ে থাকা শত শত মৃতদেহের মধ্যে, ‘গ্রিন বুটস’ সবচেয়ে পরিচিত মৃতদেহগুলোর অন্যতম। দীর্ঘ সময় ধরে এটি পর্বতারোহীদের কাছে চূড়ার পথে এক ভয়াবহ কিন্তু চেনা পথচিহ্ন হিসেবে পরিচিত ছিল। মৃতদেহটি প্রায় ৮ হাজার ৫০০ মিটার উচ্চতায় চীনের দিকে ঢালে বরফের মধ্যে পড়ে আছে।
দোরজে মোরুপ ইন্দো তিব্বত সীমান্ত পুলিশের ল্যান্স নায়েক ছিলেন। ১৯৯৬ সালে তিনি ছয় সদস্য সন্নিবেশিত ভারতীয় অভিযাত্রী দলের হয়ে এভারেস্টের বিপজ্জনক উত্তর দিক দিয়ে চূড়ায় ওঠার প্রয়াস করেন। তুষারঝড়ের কারণে দলের তিন সদস্য ফিরে গেলেও, মোরুপ এবং আরো দুই পর্বতারোহী চূড়ার দিকে আগানোর সিদ্ধান্ত নেন।
আরও পড়ুন: ফ্রান্সে দাঙ্গা ও লুটপাট, ম্যাক্রোঁর কঠোর ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি
শেষ পর্যন্ত তারা ৮ হাজার ৮৪৯ মিটার উচ্চতার এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছাতে সক্ষম হন। কিন্তু ফেরার সময় তীব্র তুষারঝড়ে তাদের তিনজনই মারা যান। এদের মধ্যে দুজনের মৃতদেহ খুঁজে পাওয়া যায়নি, কিন্তু তৃতীয় মৃতদেহটি দীর্ঘদিন ধরে ‘গ্রিন বুটস’ নামে পরিচিত হয়ে আছে।
এখন পর্যন্ত, ধারণা করা হয়ে ছিল যে, ‘গ্রিন বুটস’ আসলে একই অভিযানের আরো এক সদস্য তসেওয়াঙ পালজোরের মৃতদেহ। কিন্তু ১৯৯৬ সালের অভিযানের জীবিত সদস্যদের তথ্য, পর্বতারোহীদের সঙ্গে সর্বশেষ রেডিও যোগাযোগ এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মোরুপের পোশাক ও পর্বতারোহণের সরঞ্জাম পরীক্ষা করে, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ মোরুপের মৃতদেহ বলে মনে করছে।
ভারত মরদেহটি ফিরিয়ে এনে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করার পরিকল্পনা করেছে। এরপর মৃতদেহটি পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
সংশ্লিষ্ট পর্বতারোহীরা জানিয়েছেন, মৃত দেহ উদ্ধারের কাজটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এভারেস্টের যে অঞ্চলটিকে ‘ডেথ জোন’ বলা হয়, সেখানে তাপমাত্রা মাইনাস ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নেমে যেতে পারে। সেখানে অক্সিজেনের পরিমাণ সমুদ্রপৃষ্ঠের তুলনায় প্রায় এক তৃতীয়াংশ।
আরও পড়ুন: নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত করতে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য স্বজনদের দীর্ঘ অপেক্ষা
‘গ্রিন বুটস’ যেখানে পড়ে আছে, সেটি চীনের দিকের খাড়া ঢাল। সেখানে উদ্ধারকারী দলের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তুলনামূলকভাবে কমই রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র ওই জায়গায় পৌঁছাতেই ১০ থেকে ১২ জন দক্ষ পর্বতারোহীর প্রয়োজন হতে পারে।
মৃতদেহটি উপরে নামানোর সময় বিশেষ দড়ি স্থাপন করতে হবে এবং এরপর এমন উচ্চতায় পৌঁছাতে হবে যেখানে হেলিকপ্টারে করে তা সরানো সম্ভব। পুরো অভিযানে বিপুল অর্থ এবং জনবল প্রয়োজন হবে। তবে এবার দোরজে মোরুপকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনতে ইন্দো তিব্বত সীমান্ত পুলিশ নিজেই উদ্ধার অভিযানের অর্থায়ন করছে। সেপ্টেম্বরের মধ্যেই অভিযান চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে এবং এ জন্য তারা অভিজ্ঞ পর্বতারোহী ও উদ্ধারকারী শেরপা দল খুঁজছে।
মোরুপের পরিবার প্রায় তিন দশক ধরে তাঁর ফিরে আসার অপেক্ষা করছে। তাঁর স্ত্রী কনচাক ইয়াংস্কিট বিবিসিকে জানিয়েছেন, তিনি কখনোই স্বামীর মৃত্যু পুরোপুরি মেনে নিতে পারেননি। তিনি বলেন, কিছু কিছু রাতে মনে হতো যে, মোরুপ দরজায় কড়া নাড়বে।
মোরুপের পরিবারের কাছে এখনো তাঁর কিছু পদক, ট্রফি, পুরোনো ছবি এবং এভারেস্ট জয়ের সনদ রয়েছে। চীনা সরকারের দেওয়া ওই সনদে উল্লেখ আছে যে, ১৯৯৬ সালের ১০ মে বিকেল ৫টা ৩০ মিনিটে মোরুপ এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছেছিলেন।
আরও পড়ুন: ধর্মীয় উৎসব শিশুদের নৈতিকতা ও আদর্শের শিক্ষা দেয়: ডেপুটি স্পিকার
পরিবারের পরিকল্পনা এটি, যদি মৃতদেহটি উদ্ধার করে দেশে আনা সম্ভব হয়, তবে লাদাখের লেহতে তাঁর শেষকৃত্য করার। মোরুপের ছেলে পুনচোক দোরজাই বলেছেন, তাঁর বাবাকে শহীদ হিসেবে স্মরণ করা উচিত।
তবে পরিবারের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ‘গ্রিন বুটস’। মোরুপের ছেলে জানিয়েছেন, তাঁর বাবার এভারেস্ট জয়ের সনদের পাশে সেই বুটটিও স্মৃতি হিসেবে রেখে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন