০৪:৪৯ পি.এম
২০ জুন আজ সরকারিভাবে প্রথমবারের মতো ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ উৎসব হিসেবে পালিত হচ্ছে। ২০২৫ সালে মিছিল করার সময় শুভেন্দু অধিকারী এই দাবিটি জানান। বিজেপি পশ্চিমবঙ্গের সরকার গঠন করার পর থেকে দিনটিকে ‘পশ্চিমবঙ্গ সৃষ্টি’ এবং ভারতের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার দিন হিসেবে উদযাপন করা হচ্ছে। তবে আজ থেকে পাঁচ বছর আগে এই দিনটির উদযাপনের কোনো চল ছিল না।
বিগত তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের অবস্থান ছিল, বাংলা ভাগ হওয়া উদযাপনের বিষয় নয়। কারণ দেশভাগের ফলে লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছিলেন এবং তারা তাদের স্বজন হারিয়েছিলেন। সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ২০ জুনের পরিবর্তে পহেলা বৈশাখকে ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ হিসেবে পালন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তবে বিজেপি সরকার গঠনের পর সেই সিদ্ধান্ত বদলে ২০ জুনকেই সরকারিভাবে বেছে নেওয়া হয়েছে।
বিজেপি সরকার এই দিনটি উদযাপন করছে, তার নিচে যে সকল কারণ তুলে ধরা হলো সেগুলো হল, ইতিহাসের পাতায় ২০ জুনের সিদ্ধান্ত ও ভারতভুক্তি। আজ থেকে ৭৯ বছর আগে, ১৯৪৭ সালের ২০ জুন বঙ্গীয় প্রাদেশিক আইনসভায় অবিভক্ত বাংলা ভাগ হওয়া নিয়ে ভোটাভুটি হয়। ওই দিন মুসলিম সংখ্যাগুরু পূর্ববঙ্গ এবং হিন্দু সংখ্যাগুরু পশ্চিমবঙ্গের জনপ্রতিনিধিরা আলাদাভাবে ভোট দেন। পূর্ববঙ্গের মুসলিম নেতাদের বেশিরভাগ বাংলা ভাগের বিপক্ষে ভোট দিলেও, পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু জনপ্রতিনিধিরা বাংলা ভাগের পক্ষে ভোট দেন। এই কারণেই সিদ্ধান্ত হয় যে বাংলার পূর্ব অংশ পাকিস্তানে যাবে এবং পশ্চিম অংশ ভারতের সঙ্গে যুক্ত হবে। হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো একে পশ্চিমবঙ্গ সৃষ্টির দিন হিসেবে গণ্য করে।
আরও পড়ুন: তারেক রহমান: জামায়াত-এনসিপি আমার রাষ্ট্রীয় সম্মান সহ্য করতে পারছে না
আরএসএসের ইতিহাসবিদ রবি রঞ্জন সেনের মতে, এই দিনটিকে বাংলা ভাগের দিন হিসেবে না দেখে, এটি পশ্চিমবঙ্গ সৃষ্টি ও তার ভারতভুক্তির দিন হিসেবে দেখা উচিত। স্বাধীনতার আগে বাংলার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং কংগ্রেস নেতা শরৎ চন্দ্র বসু বাংলাকে ভাগ না করে একটি স্বাধীন ‘যুক্তবঙ্গ’ গঠনের পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু হিন্দু মহাসভার নেতা ও জনসঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী এই পরিকল্পনার তীব্র বিরোধিতা করেন। জওহরলাল নেহেরু ও বল্লভভাই প্যাটেলও এর বিরোধী ছিলেন। বিজেপি ও আরএসএস শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীকে ‘পশ্চিমবঙ্গের জনক’ মনে করে।
বিজেপির দাবি, শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর লড়াইয়ের কারণেই বাঙালি হিন্দুরা নিজেদের জীবন সুরক্ষিত করার জন্য একটি ‘হোমল্যান্ড’ বা আবাসভূমি পেয়েছেন। রাজ্যের বর্তমান মন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত মনে করেন, বাংলা ভাগ হওয়া অনিবার্য ছিল। তার মতে, যদি দুই বাংলা যুক্ত থাকত তবে হিন্দু বাঙালিদের সমস্যা আরো বাড়ত। তিনি এক প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকার চিরকাল বাংলায় হিন্দু রাজনৈতিক চেতনাকে অস্বীকার করে এসেছে।
তিনি আরো দাবি করেন, ভারতের বাঙালি স্বত্বা এবং বাংলাদেশের বাঙালি স্বত্বার মধ্যে কিছু মিল থাকলেও, দুটি পরিচয় সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই ভিন্ন পরিচয় উদযাপন করা এবং ‘বাঙালি হিন্দুর হোমল্যান্ড’ হিসেবে পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসগত ভিত্তি তৈরি করতেই বিজেপি এই দিনটিকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গ দিবস উদযাপন উপলক্ষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কলকাতা সফরে এসেছেন। পশ্চিমবঙ্গ দিবস ও ২১ জুনের যোগ দিবস উপলক্ষে কলকাতায় তার দুই দিনের কর্মসূচি রয়েছে। এই দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন জেলা, ছোট শহর ও গ্রামে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর ছবিতে মাল্যদান অনুষ্ঠান চলছে। সকালে কলকাতার ভবানীপুরে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর মূর্তিতে মালা পরান বিজেপি নেতা অগ্নিমিত্রা পাল। তিনি বলেন, ‘ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর জন্যই আমরা আজ বাংলাদেশে নেই। উনি না থাকলে হয়তো আমরা থাকতাম না।’
আরও পড়ুন: আদাবরে যুবদল নেতাকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে জখম
তবে এই উদযাপনের ভিন্ন মতও রয়েছে। ইতিহাসবিদ ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সুগত বসু জানান, মাউন্টব্যাটেন পরিকল্পনায় আগেই দেশভাগ নিশ্চিত হয়েছিল এবং ২০ জুনের ভোটে শুধু সিলমোহর পড়েছিল। তার মতে, ‘এটি কোনো গৌরবের দিন নয়, এটি আত্মঘাতী বাঙালীর লজ্জার দিন।’
সূত্র: বিবিসি বাংলা
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন