০১:৫৫ এম
একটি ইন্টারনেট মিম এবং কয়েক সেকেন্ডের রসিকতা—এটি ইউরোপের ফুটবল ও বাণিজ্যজগতে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। কিলিয়ান এমবাপ্পের একটি মন্তব্যের কারণে চীন ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে। এর ফলস্বরূপ, দেশটির তিনটি প্রতিষ্ঠান ফরাসি তারকার সঙ্গে তাদের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম লা লিগার ম্যাচ সম্প্রচার বন্ধ করে দিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য এমবাপ্পে, লা লিগা এবং রিয়াল মাদ্রিদ ক্ষমা চেয়েছেন। তবে চীন এখনও সন্তুষ্ট নয়।
প্রশ্ন উঠছে, ইউরোপের অন্যতম প্রভাবশালী ফুটবল লিগ এবং বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ক্লাবগুলোর একটি রিয়াল মাদ্রিদ কেন চীনের কাছে এতটা নমনীয়? এর উত্তর ফুটবলের বাইরের বিশাল বাণিজ্যিক জগতে নিহিত।
বিতর্কের শুরু হয় ফরাসি অনুষ্ঠান ‘দ্য ব্রিজ’-এ এমবাপ্পের একটি সাক্ষাৎকার থেকে। সেখানে তিনি চীনের সাবেক নেতা মাও সে তুংয়ের অবয়ব ব্যবহার করে তৈরি একটি ভিডিও সম্পর্কে মন্তব্য করেন। মাওকে নিয়ে এমন রসিকতা চীনে অত্যন্ত সংবেদনশীল। মন্তব্যটি প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। ২৭ অক্টোবর ডংপেং, মেংনিউ ও মিল্কগ্রাউন্ড নামের তিনটি চীনা প্রতিষ্ঠান এমবাপ্পের সঙ্গে তাদের চুক্তি বাতিল করে। একই সময়ে চায়না মিডিয়া গ্রুপ (সিএমজি) লা লিগার সম্প্রচার স্থগিত করে।
আরও পড়ুন: আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নিয়ে চবি উপাচার্যের সঙ্গে ব্রিটিশ কাউন্সিলের মতবিনিময়
এমবাপ্পে দুঃখ প্রকাশ করার পর লা লিগা ও রিয়াল মাদ্রিদও ক্ষমা চেয়েছে। তবে সিএমজির দাবি, রিয়াল মাদ্রিদকে যথাযথভাবে ক্ষমা চাইতে হবে। সংকট সমাধানের জন্য লা লিগা সভাপতি হাভিয়ের তেবাস চীনা রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। তাঁর চীন সফরের পরিকল্পনাও রয়েছে।
লা লিগার জন্য চীনের গুরুত্বের একটি বড় অংশ হলো সম্প্রচারস্বত্ব। এএফপির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ মৌসুমে লিগটির আন্তর্জাতিক সম্প্রচারস্বত্বের মূল্য ছিল ৭৪৮ মিলিয়ন ইউরো। চীন ও যুক্তরাষ্ট্র এই আয়ের বেশিরভাগ অংশ জোগায়। যদিও দুই দেশের মধ্যে চীনের অবদান আলাদাভাবে প্রকাশ করা হয়নি, তবে বিশ্বের বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশটির দর্শকবাজার সম্প্রচারস্বত্বের মূল্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, তা স্পষ্ট।
এশিয়ার দর্শকদের কাছে পৌঁছানোর জন্য ২০১৬ সাল থেকে লা লিগা ম্যাচের সূচি এই অঞ্চলের সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার উদ্যোগ নিয়েছে। চীনে দুটি কার্যালয়সহ আটটি দেশে নয়টি অফিস খুলেছে তারা। ২০১৫ সালে চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভির সঙ্গে পাঁচ বছরের চুক্তি হয়েছিল, যার মূল্য ছিল ৩৭৫ মিলিয়ন ইউরোর বেশি।
সম্প্রতি চায়না মোবাইলের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম মিগুর সঙ্গে ২০২৬–২৭ থেকে ২০২৯–৩০ মৌসুম পর্যন্ত চুক্তি করেছে লা লিগা। ফলে চীনের দর্শকেরা প্রতি মৌসুমে লিগের ৩৮০টি ম্যাচ দেখতে পারবেন। চুক্তির আর্থিক অঙ্ক প্রকাশ করা হয়নি। এর আগে ২০২৪ সালে সিএমজির সঙ্গে ফ্রি-টু-এয়ার সম্প্রচারের চুক্তি করেছিল লিগটি।
আরও পড়ুন: হুথিদের ড্রোন হামলা দাম্মাম বিমানবন্দর ও জিজান রাডার স্টেশনে
রিয়াল মাদ্রিদের কাছে চীনের গুরুত্ব আরও বিস্তৃত। সম্প্রচার ছাড়াও, জার্সি ও অন্যান্য পণ্য বিক্রি, স্পনসরশিপ এবং ব্র্যান্ডের বাজারে দেশটির প্রভাব রয়েছে। স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম মার্কার তথ্য অনুযায়ী, রিয়ালের জার্সি ও মার্চেন্ডাইজ বিক্রির ১০ থেকে ১৫ শতাংশ চীন থেকে আসে।
ডেলয়েটের ফুটবল মানি লিগ অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ মৌসুমে রিয়ালের রাজস্ব ছিল ১ হাজার ১৬১ মিলিয়ন ইউরো। ক্লাবটির বাণিজ্যিক অংশীদারদের মধ্যে চীনা প্রতিষ্ঠান হাইসেন্স ও লিংলং টায়ারও রয়েছে। ফলে চীনের বাজারে সুনাম নষ্ট হলে ক্লাবটির ব্যবসায় প্রভাব পড়তে পারে।
চীনের ক্রীড়াবাজার ক্রমবর্ধমান। দেশটির সরকারি সংবাদমাধ্যম সিনহুয়ার তথ্য অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে ক্রীড়াশিল্পের আকার ৭ ট্রিলিয়ন ইউয়ানের বেশি করার লক্ষ্য রয়েছে। ২০২৪ সালে এই শিল্পের উৎপাদনমূল্য ছিল ৩.৮৪ ট্রিলিয়ন ইউয়ান।
অর্থাৎ, চীন শুধু বর্তমানের বড় বাজার নয়, ভবিষ্যতেরও বিশাল বাণিজ্যিক সম্ভাবনা। সেই বাজারে প্রবেশাধিকার এবং দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক বজায় রাখা এখন লা লিগা ও রিয়ালের প্রধান চিন্তা।
আরও পড়ুন: যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কূটনীতি ও সামরিক সংঘাতের জন্য প্রস্তুত ইরান
মাঠের ফুটবলে রিয়াল মাদ্রিদ যতই শক্তিশালী হোক, বৈশ্বিক বাণিজ্যের খেলায় চীনের বাজারকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। এমবাপ্পের একটি মন্তব্যের ফলে সৃষ্ট সংকট ফুটবলের চেয়ে অনেক বড় এক অর্থনৈতিক বাস্তবতা সামনে এনেছে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন