১০:৪৭ এম
রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার পাশাপাশি উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন উপজেলার গ্রামাঞ্চলে খাল, বিল, পুকুর, নালা, ডোবা ও উন্মুক্ত জলাশয়গুলো এখন আর তেমনভাবে দেখা যাচ্ছে না। গ্রামবাংলার ঐতিহ্য ও জাতীয় ফুল শাপলা ও ঢ্যাপের অস্তিত্ব সংকটে রয়েছে। লাল শাপলা তো দূরের কথা।
জাতীয় ফুল শাপলা বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতীক। শাপলা ফুল বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে। একটি নতুন রাজনৈতিক দল দলীয় প্রতীক হিসেবে শাপলা ফুল পেতে চেয়েও পাননি। সকল বয়সের মানুষের কাছে এই ফুলটি সমাদৃত। যেকোনো পুকুর, বিল, ডোবা নালায় জন্ম নিয়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। কিন্তু প্রকৃতির বিরূপ প্রভাব, জলবায়ুর পরিবর্তন এবং মানবসৃষ্ট প্রতিবন্ধকতার কারণে মুক্ত জলাশয় বিলুপ্ত হচ্ছে এবং শাপলা ফুল হারিয়ে যাচ্ছে। শাপলা ফুলের সেই সমারোহ আর চোখে পড়ে না। দিনে দিনে শাপলা-শালুক যেন একেবারেই বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। অথচ ১৫-২০ বছর আগে বড় বড় পুকুর, ডোবা ও বিলের বুক জুড়ে শাপলা ফুলের দৃষ্টি নন্দন সৌন্দর্য ছিল। শরৎকালে দীঘি ও বিলের বুক জুড়ে প্রকৃতি অন্যরকম সাজে সেজে উঠত। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখা যেত চারদিকে ফুটন্ত সাদা ও লাল শাপলার সমারোহ। মনে হতো, এ যেন শাপলা ফুলের জগৎ।
এক সময় গ্রাম-গঞ্জে ডোবা-নালায় এবং খালেবিলে আমাদের জাতীয় ফুল শাপলার সমারোহ ছিল দেখার মতো। বর্ষা থেকে শরতের শেষ পর্যন্ত নদী-নালা, খাল-বিল, জলাশয়ের নিচু জমিতে প্রচুর পরিমাণে শাপলা, শালুক ও ঢ্যাপ ফুল জন্মাত। লাল কিংবা সাদা শাপলা দেখে মুগ্ধ হন না, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। কিন্তু কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে শাপলা ফুল এবং বিপন্নের পথে জলাভূমির ফল ঢ্যাপ।
আরও পড়ুন: অনেক শিক্ষার্থীর প্রাণের বিনিময়ে নতুন বাংলাদেশ পেয়েছি - মো. তমিজ উদ্দিন এমপি
শাপলা ফুল শুধু পরিবেশ ও প্রকৃতির সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে না, এর রয়েছে অনেক পুষ্টিগুণ। এছাড়া এ ফুলের গাছের শিকড় ও মাথা ফেলে দেওয়ার মতো নয়। শাপলার নরম ডাঁটা, মাথা ও গোড়ায় জন্ম নেওয়া ড্যাপ এবং শালুক সবই মুখরোচক পুষ্টি সমৃদ্ধ খাদ্য উপাদান। শাপলার গাছ বা ডাঁটা পানির গভীরতায় ১৫ থেকে ২০ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়। মাছ-মাংস রান্নায় উৎকৃষ্ট তরকারি হিসেবে এর ডাঁটা জনপ্রিয়। শালুক আগুনে পুড়িয়ে কিংবা সেদ্ধ করে খাওয়া হয়। আগের দিনে শরতের শেষে বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিলজুড়ে শালুক তোলার ধুম পড়ে যেত। শালুক পোড়া গন্ধ এখনো প্রবীণদের শৈশবের কথা মনে করিয়ে দেয়। শাপলা ও পদ্ম সাধারণত দিঘী বা বিলে ফুটে থাকে। তখন গ্রামের ছেলে-মেয়েরা সাঁতার কেটে এই ফুল তুলে আনত। শাপলাকে দুভাবে কেটে মালার মতো করে একজন অপরজনের গলায় পড়িয়ে দিত। রসবোধ ও সৌন্দর্য হারিয়ে যাচ্ছে মহাকালের অতল গহ্বরে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ুর ব্যাপক পরিবর্তনের কারণে আগের মতো সঠিক সময়ে বন্যা হচ্ছে না। এছাড়া আবাদি জমিতে অপরিমিত কীটনাশক ও রাসায়নিক সার প্রয়োগের ফলে অনেক শাপলা বীজ বা মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা মা শালুক বিনষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফলে নতুন করে শাপলার গাছ জন্ম হচ্ছে না। এখন শরৎকাল শেষ হলেও বড় বড় দীঘি ও জলাশয়ে দেশের কোথাও সেই আগের মতো শাপলা-শালুকের দেখা মেলেনা। এ জলজ উদ্ভিদ আজ বিলুপ্তির পথে।
এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে আগামী ২০ বছরে শাপলার অস্তিত্ব কতটুকু টিকে থাকবে, তা দেখার বিষয়। এলাকাবাসী বলছেন, বর্তমানে গ্রাম-বাংলায় বিভিন্ন খালেবিলে অতিরিক্ত পুকুর খনন, কৃষি জমিতে ও রাস্তার ধারের নয়নজুলিত ভরাট করে স্থাপনা নির্মাণ, অতি মাত্রায় নিচু জমিতে কীটনাশক ব্যবহার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দিন দিন বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে শাপলা ফুল ও ঢ্যাপ। শাপলার ফলকেই 'ঢ্যাপ' বলা হয়। কিছু আঞ্চলিক নামে 'ভেট' বলা হয়। এক সময় গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর একটি বিরাট অংশ শাপলা ফুলের ডাঁটা তরকারি হিসেবে খেতেন। শুধু তাই নয়, এই ঢ্যাপ আমাশয়, বদ হজম এবং রক্ত আমাশয় নিরাময়ের জন্য কার্যকরী বলেও প্রচলিত রয়েছে গ্রামে।
দেশের বিভিন্ন বিলে অপরিকল্পিতভাবে অতিরিক্ত পুকুর খনন, কৃষি জমিতে স্থাপনা নির্মাণের ফলে শাপলা ফুল আজ বিলুপ্তির পথে। বিভিন্ন বিল ও জলাশয়, যেখানে প্রাকৃতিকভাবে মাছ চাষ হতো, সেগুলো এখন পরিকল্পিতভাবে মাছ চাষের আওতায় নিয়ে আসার কারণে সেখানে আর শাপলা ফুল জন্মাতে পারে না। প্রাচীনকাল থেকেই শাপলার ফল (ঢ্যাপ) দিয়ে চমৎকার সুস্বাদু খৈ তৈরি হয়। অনেকে শাপলা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য হওয়ায় এলাকার লোকজন শাপলা তুলে খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করে বিক্রি করতো।
বর্তমান সভ্যতায় বাড়তি জনগণের চাপের কারণে আবাদি জমি ভরাট করে বাড়ি, পুকুর, মাছের ঘের বানানোর ফলে বিলের পরিমাণ কমে গেছে। যার কারণে শাপলা জন্মানোর জায়গাও কমে আসছে। গ্রাম বাংলার আনাচে-কানাচে অহরহ দেখা যেত জলে ভাসা ফুলটি। তবে এখন অযত্ন আর অবহেলায় জাতীয় ফুল শাপলা হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। সকালে অথবা চাঁদনি রাতে বিলে-ঝিলে বা জলাশয়ে ফুলটি যখন অনেক ফুটে থাকে, তখন সেখানে এক অপরূপ সৌন্দর্যের সৃষ্টি হয়। বর্ষা মৌসুমে বিভিন্ন এলাকায় খাল-বিল, জলাশয় ও নিচু জায়গায় পানি জমা থাকলে সেখানেই প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেয় আমাদের জাতীয় ফুল শাপলা। দিন দিন দেশের বিল, ঝিল, খাল, নদী দখল, ভরাট, জমিতে অতি মাত্রায় কীটনাশক ব্যবহার, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দিন দিন বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে শাপলাফুল।
আরও পড়ুন: ‘১৬ বছর রাজপথে ছিলেন না, এখন ত্যাগ নিয়ে প্রশ্ন’: খালিদুজ্জামানকে রাশেদ
কিন্তু শাপলা ফল' বা 'ঢ্যাপ প্রকৃতি থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে। এক সময় গোদাগাড়ীর বিল পাতিকলা, দুর্গাদহ, সিধনা বিল, ঝিকড়া বিলসহ পুকুর, ডোবা, মুক্ত জলাশয়ে এবং তানোর উপজেলার কুমারী বিল ও পুকুর, খাল ও জলাশয়ে শাপলা ফুল ফুটত। এসব খাল জলাশয়, পুকুর ও বিল থেকে শাপলা ফুল ও ঢ্যাপ তুলে উপজেলার হাট বাজারে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন অনেকেই। কিন্তু আস্তে আস্তে ভরাট হয়ে যাচ্ছে জলাশয়, খাল, বিল। অপর দিকে দুই উপজেলা সরকারি খাস পুকুরগুলো সরকারিভাবে লিজ দেয়ার কারণে বানিজ্যিকভাবে মাছ চাষ করা হচ্ছে, গোবর, মরা মুরগি, হাঁসমুরগির নাড়িভুঁড়ি পানিকে আরও বিষাক্ত করে পচা দুগন্ধে পরিণত করছে। আবার অনেক পুকুর ভরাট করা হচ্ছে। ফলে দিনে দিনে হারিয়ে যাচ্ছে শাপলা ফুল ও ঢ্যাপ। শাপলার ফল বা ঢ্যাপ দিয়ে চমৎকার সুস্বাদু খই ভাজা হয়। যেটি গ্রাম-গঞ্জের মানুষের কাছে 'ঢ্যাপের খই' নামে পরিচিত।
এ ঢ্যাপের মধ্যে অসংখ্য বীজদানা থাকে। এসব বীজদানা রোদে শুকিয়ে চাল তৈরি করা হয়। ঢ্যাপের পুষ্টিকর চাল থেকে তৈরি করা হয় খই ও নাড়ু। খালবিল ও জমিতে অতিমাত্রায় কীটনাশক ব্যবহার, জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক জলাভূমিগুলো ধ্বংসের কারণে সুস্বাদু ঢ্যাপ বিলুপ্ত হচ্ছে বলে অনেকেই মনে করেন। গোদাগাড়ী পৌরসভার সাবেক কমিশনার মুকুল বলেন, আগে বাড়ির আশেপাশের পুকুর, ধানী জমির জলাশয়ে ফুটে থাকা শাপলার (লাইল) কাঁচা ও রান্না করে খাওয়ার পাশাপাশি ভ্যাট নামে পরিচিত ফল দিয়ে খই বানিয়ে খেতাম। কিন্তু এখন তো এগুলো দেখাই যায় না। যুবকেরা শাপলার ফল, ফুল সংগ্রহ করতে পানিতে নামতো ঝোঁক কামড় দিয়ে রক্তবের করে দিত। ঝোঁক মারতে সবাই লবন (নুন) ব্যবহার করতো।
দিগরাম উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক মোঃ ইফতিখার হোসেন বলেন, দেশে বাড়তি জনগণের চাপের কারণে পুকুর, জলাশয় ও আবাদী জমি ভরাট করে বাড়িসহ নানা স্থাপনা নির্মাণ, পুকুরে বানিজ্যিকভাবে মাছ করার ফলে এখন পুকুর, জলাশয়ও নাই, তাই শাপলা ফুল আর দেখা যাচ্ছে না বলে জানান তিনি।
মুন্ডুমালা পৌর এলাকার সহকারী শিক্ষিকা আসিফা খাতুন বলেন, এক সময় তানোর বিল কুমারী বিলে প্রচুর পরিমাণে শাপলা ফুল ফুটত। কিন্তু এখন আর দেখা যাচ্ছে না। তারা বলেন, তানোর বিল কুমারী বিল থেকে হারিয়ে গেছে, জাতীয় ফুল শাপলা, শালুক, লিঘাড়, সিঙ্গার, পদ্ম ফুলসহ বিভিন্ন প্রজাতির জলজ ফুল ও ফল।
আরও পড়ুন: ফায়ার সার্ভিস: জুনে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করেছিল টুপটুপ রিসোর্টটি
গোদাগাড়ী উপজেলার সাবেক নির্বাহী অফিসার ফয়সাল আহমেদ বলেন, বাসার সামনে একটি বড় পুকুর আছে সেখানে শাপলা আছে বেশকিছু ফুলও ফুটে থাকে, দেখতে সুন্দর লাগে। কেউ না উঠালে, এগুলি এমনি বৃদ্ধি পেতে থাকে। জনপ্রতিনিধি, সাধারণ মানুষ, শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন কাজে এসে এ শাপলা ফুলের ছবি তুলে ফেসবুকে আপলোড করে আনন্দ উপভোগ করতো। উপজেলার বিভিন্ন বিল, পুকুরে প্রচুর শাপলা ফুটতো, এখন আর এগুলি দেখা যায় না। খই, নাড়ুসহ বিভিন্ন সুস্বাদু খাবার তৈরী হত। তিনি আরও জানান, শাপলা আমাদের জাতীয় ফুল। এই জাতীয় ফুলকে রক্ষা করা আমাদের সকলের দায়িত্ব। এলাকার মানুষ ইচ্ছা করলে বাসাবাড়ীর পাশের পুকুর সুন্দর দৃশ্যের জন্য করতে পারেন।
শীব নদীর উপশাখা বিল কুমারী বিল ও ট্যাংরা বিলে আমাদের বাপ-দাদা এক সময় মাছ ধরার পাশাপাশি শাপলা ফুল ও বিভিন্ন জলীয় ফল তুলে বাজারে বিক্রি করতো। কিন্তু এখন আর ফুটে না, তাই দেখা যায় না জাতীয় ফুল শাপলা, পদ্ম ফুল ও শালুকসহ জলীয় ফুল ও ফল। তিনি বলেন, এক সময় বিভিন্ন পুকুর ও জলাশয়েও জাতীয় ফুল শাপলা হরহামেশা দেখা যেত। কিন্তু এখন আর পুকুর, খাল, জলাশয়েও দেখা যায় না জাতীয় ফুল শাপলা।
উপজেলা কৃষি কর্মকতা মরিয়ম আহমেদ এ প্রতিবেদককে জানান, জলবায়ু ব্যাপক পরিবর্তনের ফলে সঠিক সময়ে বৃষ্টিপাত হচ্ছে না। বর্ষা শেষ না হতেই খাল-বিল ও জলাশয়গুলো শুকিয়ে যাচ্ছে এবং লবণাক্ততা বেশি হওয়ার ফলে এলাকায় শাপলা জন্মানোর ক্ষেত্র বিনষ্ট হচ্ছে। এছাড়া আবাদি জমিতে অনিয়ন্ত্রিত কীটনাশক ও রাসায়নিক সার প্রয়োগের ফলে অনেক শাপলা বীজ বা মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা মা-শালুক বিনষ্ট হয়ে যাচ্ছে। যার ফলে নতুন করে শাপলার গাছ জন্মাচ্ছে না। ফলে দিনে দিনে আমাদের জাতীয় ফুল শাপলার বিলুপ্তি ঘটছে।
আরও পড়ুন: এসআই পরিচয়ে প্রতারণা, নিখোঁজ সন্তানের খোঁজ মেলেনি পাঁচ দিনেও
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন