১০:১৪ পি.এম
নীল জলরাশি, প্রবাল এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে প্রতিবছর সেন্টমার্টিনে হাজার হাজার পর্যটক আসেন। পর্যটন মৌসুমের প্রস্তুতির জন্য দ্বীপের হোটেল, রিসোর্ট এবং কটেজগুলো অতিথিদের স্বাগত জানাতে প্রস্তুত হচ্ছে। আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন করে সাজানো হচ্ছে। কিন্তু পর্যটকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ কাটছে না। দ্বীপের তিন শতাধিক হোটেল, রিসোর্ট, কটেজ এবং রেস্তোরাঁর মধ্যে একটি হোটেলও ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র পায়নি। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম নেই। এমনকি আগুন নিয়ন্ত্রণের জন্য দ্বীপে কোনো ফায়ার সার্ভিসের স্টেশনও নেই।
অতীতে একাধিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলেও পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি। কাঠ, বাঁশ এবং ছনের মতো দাহ্য উপকরণে তৈরি স্থাপনায় আগুন লাগলে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে পর্যটন মৌসুমে দ্বীপে আসা পর্যটকদের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
২০২৫ সালের ১৫ জানুয়ারি সেন্টমার্টিনের পশ্চিম সৈকতের গলাচিপা এলাকায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ফলে সাইরী, বিচ ভ্যালি এবং কিংশুক নামের তিনটি রিসোর্টের ২৬টি কক্ষ পুড়ে যায়। কাঠ, বাঁশ এবং ছনে তৈরি রিসোর্টগুলো মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি, তবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৬ কোটি টাকা দাঁড়ায়।
আরও পড়ুন: সাভার-আশুলিয়ার গার্মেন্টস শ্রমিকরা শান্তিপূর্ণভাবে কাজে যোগ দিয়েছেন
আগুনে পুড়ে যাওয়া তিনটি রিসোর্টের মধ্যে কিছু আবার নতুন করে নির্মাণ করা হয়েছে। পর্যটকদের স্বাগত জানাতে প্রস্তুত সেগুলো। তবে নতুন করে গড়ে ওঠা স্থাপনাগুলোতে অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র নেই এবং অনেক ক্ষেত্রেই পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম নেই।
বিচ ভ্যালি রিসোর্টের ব্যবস্থাপক মো. রাফিউল আলম বলেন, "কোনো স্থাপনা আগুনে পুড়ে গেলে তা শুধু মালিকের জন্য নয়, সবার জন্যই কষ্টের।" একই সময়ে তিনটি রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা তাঁদের উদ্বিগ্ন করেছে।
রাফিউল আলম সময় সংবাদকে বলেন, "সামর্থ্য অনুযায়ী আমরা অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করছি।" তবে এ ক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগও জরুরি। পর্যটন এলাকায় একটি ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপন এখন সময়ের দাবি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, "রিসোর্টের অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জায় কাঠ ও বাঁশের মতো দাহ্য উপকরণ ব্যবহার করা হয়।" সমুদ্রের কাছাকাছি হলেও এসব শুকনো উপকরণে আগুন লাগলে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদারের পাশাপাশি দ্বীপে জরুরি ভিত্তিতে ফায়ার সার্ভিসের উপস্থিতি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
আরও পড়ুন: জাপানি কনসোর্টিয়ামকে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ শর্তে ছাড় প্রদান
বিচ ভ্যালি রিসোর্টের পাশেই দক্ষিণ হাওয়া রিসোর্ট। এ রিসোর্টের ১০টি কক্ষ কাঠ, বাঁশ ও ছন দিয়ে তৈরি। রিসোর্টটির ব্যবস্থাপক মাকসুদ বলেন, "আমাদের রিসোর্টের অধিকাংশ স্থাপনাই কাঠ ও বাঁশের তৈরি।" অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি মোকাবিলায় পর্যাপ্ত ও কার্যকর অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম থাকা জরুরি। প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম যথাযথভাবে স্থাপন ও সচল রাখা গেলে আগুনের প্রাথমিক পর্যায়েই তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
দ্বীপের অধিকাংশ আবাসন প্রতিষ্ঠানের অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থার চিত্র আরও উদ্বেগজনক। ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, তিন শতাধিক হোটেল, রিসোর্ট, কটেজ এবং রেস্তোরাঁর কোনোটি অগ্নিনিরাপত্তার ছাড়পত্র নেয়নি। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, ফায়ার অ্যালার্ম, হোস পাইপ কিংবা জরুরি নির্গমনপথ নেই।
কোরাল মুন বিচ রিসোর্টের কেয়ারটেকার মো. আতাউর বলেন, "আমাদের রিসোর্টে আগুন নেভানোর পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই।" আগুন লাগলে পানি ব্যবহার করেই তা নেভানোর চেষ্টা করতে হয়। কিন্তু এভাবে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। শুধু তাঁদের রিসোর্ট নয়, পর্যটন এলাকার অধিকাংশ রিসোর্টেই অগ্নিনির্বাপণের পর্যাপ্ত সরঞ্জাম ও কার্যকর ব্যবস্থা নেই। তাই প্রতিটি রিসোর্টে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিশ্চিত করার পাশাপাশি দ্বীপে ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপন করা জরুরি।
সেন্টমার্টিন বাজারসংলগ্ন তারকা হোটেল ব্লু মেরিনে ৪১টি কক্ষ রয়েছে। হোটেলটিতে ফায়ার অ্যালার্ম, এ, বি এবং সি শ্রেণির অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র এবং পানির হোস পাইপ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মীরা জানিয়েছেন। তবে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রগুলোর মেয়াদ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
আরও পড়ুন: রূপগঞ্জের টেক্সটাইল মিলে এয়ার কম্প্রেসার বিস্ফোরণে ৪ দগ্ধ
হোটেলটির কর্মী মোহাম্মদ রবি হোসেন বলেন, "কর্মীদের অগ্নিনিরাপত্তা বিষয়ে সচেতন ও দক্ষ করতে প্রতি মাসে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে।" হোটেলে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র ও হোস পাইপের পাশাপাশি ওপরের অংশে দুটি হোস পাইপ স্থাপন করা হয়েছে। অগ্নিনির্বাপক সরঞ্জাম পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সেগুলো কক্সবাজারে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কিছু রিসোর্টে নিজস্ব উদ্যোগে অগ্নিনিরাপত্তার ব্যবস্থা রাখার কথাও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। লুইপাজ রিসোর্টের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ মিঠু মিয়া বলেন, "আমাদের রিসোর্টে মোট নয়টি কক্ষ রয়েছে।" সম্পূর্ণ কাঠের তৈরি হওয়ায় এটি প্রচলিত ভবন নির্মাণপদ্ধতিতে নয়, ইউপি সিস্টেমে নির্মাণ করা হয়েছে।
মিঠু মিয়ার ভাষ্য, "অগ্নিনিরাপত্তার জন্য আমাদের রিসোর্টে ফায়ার এক্সটিংগুইশার, ফায়ার বাকেট, বালতি, বালু এবং পানির ব্যবস্থা রয়েছে।" শুরু থেকেই এসব সরঞ্জাম রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছে। তবে তাঁর মতে, সেন্টমার্টিনের অধিকাংশ রিসোর্ট ইকো-ট্যুরিজমের আদলে কাঠসহ বিভিন্ন দাহ্য উপকরণ দিয়ে তৈরি। তাই পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তায় দ্বীপে একটি ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপন অত্যন্ত জরুরি।
ফায়ার সার্ভিস স্টেশন চান স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও।
আরও পড়ুন: গুরুদাসপুরে জনবসতি ও কৃষিজমিতে ১১টি অবৈধ ইটভাটা
গত ১৭ অক্টোবর ইনানীর টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ১১ পর্যটকের মৃত্যুর পর সেন্টমার্টিনের অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মতে, পর্যটক ও বাসিন্দাদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্বীপে দ্রুত ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপন করা প্রয়োজন। অন্তত পর্যটন মৌসুমে প্রশিক্ষিত কর্মী ও প্রয়োজনীয় অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম মোতায়েন করা উচিত।
সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম সময় সংবাদকে বলেন, "দ্বীপের হোটেল, রিসোর্টসহ বিভিন্ন আবাসিক প্রতিষ্ঠানে প্রায় ছয় হাজার মানুষের থাকার সক্ষমতা রয়েছে।" এত বিপুলসংখ্যক মানুষের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে এখানে একটি ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপন জরুরি।
ফয়েজুল ইসলাম আরও বলেন, "কয়েক দিন আগে টেকনাফে অনুষ্ঠিত একটি সভায় আমি বিষয়টি তুলে ধরে সেন্টমার্টিনে ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপনের আবেদন জানিয়েছি।" দ্বীপের বাসিন্দাদের পাশাপাশি পর্যটকদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত এ উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
পরিদর্শনে যাওয়ার কথা ফায়ার সার্ভিসের
আরও পড়ুন: তিস্তার ভবিষ্যৎ আবারও প্রতিশ্রুতির মধ্যে আটকে থাকবে?
প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, পর্যটকদের নিরাপত্তায় অগ্নিনিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। এ জন্য হোটেল-রিসোর্টের মালিক, ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. শাহিদুল আলম বলেন, "বাসাবাড়ির মতো হোটেল ও রিসোর্টেও অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।" বরং হোটেল-রিসোর্টের ক্ষেত্রে বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। কারণ, সেখানে অসংখ্য পর্যটক ও অতিথির নিরাপত্তার বিষয়টি জড়িত।
তিনি বলেন, "হোটেল ও রিসোর্টের মালিকদের প্রথম দায়িত্ব অতিথিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।" এ ক্ষেত্রে শুধু অগ্নিনিরাপত্তা নয়, অন্যান্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থাও যথাযথভাবে নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য মালিকপক্ষ, ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, ফায়ার সার্ভিসসহ তদারকি সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের লাইসেন্স শাখার পরিদর্শক শফিকুল ইসলাম সময় সংবাদকে বলেন, "সেন্টমার্টিনের পরিস্থিতি নিয়ে তাঁরা উদ্বিগ্ন।" দ্বীপের কোনো হোটেল-রিসোর্টেরই ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র নেই। অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থাও সন্তোষজনক নয়। শিগগিরই ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের একটি দল দ্বীপটি পরিদর্শনে যাবে। এরপর পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে।
আরও পড়ুন: কুষ্টিয়া মিরপুরে গোল্ডেন বেঙ্গল টোব্যাকো কোম্পানিতে প্রশাসন ও কাস্টমসের অভিযান
কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন বলেন, "সমুদ্রের তীব্র বাতাসে কাঠ ও বাঁশের তৈরি রিসোর্টে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।" এ ধরনের স্থাপনায় বহনযোগ্য অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, অগ্নিসংকেতব্যবস্থা, হোস পাইপ এবং অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। কিন্তু সেন্টমার্টিনে এসব ব্যবস্থার ঘাটতি রয়েছে।
দ্বীপে স্থানীয় বাসিন্দাদের দুই হাজারের বেশি বসতবাড়ি রয়েছে। এর পাশাপাশি গড়ে উঠেছে তিন শতাধিক হোটেল, রিসোর্ট এবং অন্যান্য আবাসিক প্রতিষ্ঠান। ফলে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিতে শুধু পর্যটকেরা নন, রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারাও।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে সেন্টমার্টিন পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় হলেও অগ্নিনিরাপত্তার এমন দুর্বলতা বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি করছে। অতীতের অগ্নিকাণ্ড থেকে শিক্ষা নিয়ে পর্যটন মৌসুম শুরুর আগেই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে যেকোনো সময় বড় ধরনের প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি ঘটতে পারে। পর্যটকদের নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করতে তাই শুধু হোটেল-রিসোর্ট সাজানো নয়, অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করাও এখন জরুরি।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন