০৯:২৭ পি.এম
সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র কিউবার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধ মূলত আদর্শিক। কিন্তু সেই আদর্শিক লড়াইয়ে জিততে যুক্তরাষ্ট্র এখন কিউবার অর্থনীতিকে গলা টিপে মেরে ফেলতে চায়। কেবল সরকার নয়, কিউবার এক কোটি ৮ লাখ সাধারণ মানুষও যেন এখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ। অর্থনীতিকে ধ্বংস করে কিউবার জনগণকে ভাতে মারতে চায় যুক্তরাষ্ট্র।
ষাটের দশক থেকেই যুক্তরাষ্ট্র নানা অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞায় কিউবাকে কাবু করতে মরিয়া। বৃহৎ এই প্রতিবেশীর সাথে লড়াই করেই টিকে আছে কিউবা। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন এখন কিউবাকে বাগে আনতে অবরোধ যুদ্ধে নেমেছে।
যেকোনও অর্থনীতির চালিকাশক্তি হলো জ্বালানি। যুক্তরাষ্ট্র এবার জ্বালানি সরবরাহ থেকে কিউবাকে বিচ্ছিন্ন করার কৌশল নিয়েছে। চলতি বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি অবরোধের পর থেকে দেশটির বিদ্যুত ও জ্বালানি খাতে বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে।
আরও পড়ুন: মিরপুরে বিহঙ্গ পরিবহনের যাত্রীবাহী বাসে আগুনের ঘটনা
কিউবার অর্থনীতির প্রধান খাত হলো পর্যটন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সর্বাত্মক অবরোধের কারণে সেই পর্যটন খাতে রীতিমত ধস নেমেছে। সাদা বালুর সৈকত থেকে শুরু করে স্প্যানিশ ঔপনিবেশিক দুর্গ, সবই আছে; তবে নেই পর্যটকদের ভিড়। একসময়ের ব্যস্ত পর্যটন কেন্দ্রগুলো এখন ভূতুড়ে শহরে পরিণত হয়ে গেছে, ফাঁকা পড়ে আছে হোটেল রুমগুলো।
কিউবায় পর্যটকদের জন্য জনপ্রিয় গন্তব্য হলো রাজধানীর পুরোনো হাভানা এলাকা। ষোড়শ শতাব্দীতে প্রতিষ্ঠিত পুরোনো হাভানাকে স্প্যানিশ ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের অন্যতম সেরা সংরক্ষিত নিদর্শন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পুরোনো হাভানার একটি ঐতিহাসিক চত্বরের কাছে প্রায় ৩০ বছর ধরে গিটার বাজিয়ে পর্যটকদের ঐতিহ্যবাহী কিউবান গান শোনাচ্ছিলেন এক ব্যক্তি। এটি ছিল তার পেশা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই শিল্পী বললেন, “কোনও পর্যটক নেই। হয়তো তারা ঘরেই আছেন। আধ ঘণ্টা বা এক ঘণ্টা পর পর এক দু’জন আসেন।”
কিউবান সরকারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসে মাত্র ৩ লাখ ৬০ হাজার পর্যটক দ্বীপটি পরিদর্শন করেছেন, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫৮ শতাংশ কম। অথচ প্রতিবেশী ডোমিনিকান রিপাবলিকে একই সময়ে এর চেয়ে ১০ গুণেরও বেশি পর্যটক ভ্রমণ করেছেন। সঙ্কট যেভাবে ঘনীভূত হচ্ছে, তাতে কিউবায় পর্যটকের সংখ্যা আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। অনেক পর্যটন প্রতিষ্ঠান তাদের আগাম বুকিং বাতিল করছে। হাভানায় রিফুয়েলিংয়ের ব্যবস্থা না থাকায় বহু বিমান সংস্থা তাদের সমস্ত ফ্লাইট বাতিল করে দিয়েছে।
কোভিডের সময় বিশ্বের অনেক দেশের মতো কিউবারও পর্যটন খাত অচল হয়ে পড়েছিল। এরপর সরকার নানা বিনিয়োগ করলেও মার্কিন অবরোধের মুখে পর্যটন খাত আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। বরং দিন দিন অবস্থা আরও খারাপ হচ্ছে। মানুষ ভয়ে কিউবায় যেতে চাইছেন না। যেখানে দিনে ২০/২২ ঘণ্টা লোডশেডিং থাকে সেখানে মানুষ বেড়াতে যাবে কোন দুঃখে।
আরও পড়ুন: মাদারীপুরে কৃষককে কুপিয়ে জখম, প্রধান আসামি জাকির গ্রেফতার
যুক্তরাজ্যভিত্তিক ‘কিউবানিয়া ট্রাভেলস’-এর পরিচালক লুসি ডেভিস বলেন, “এমন এক ভয়াবহ সঙ্কটে থাকা দেশে কে ভ্রমণ করতে চাইবে? মানুষ তাদের ছুটিতে স্বস্তিতে থাকতে চায়। এই মুহূর্তে কিউবার মতো কোনও স্থানে যাওয়া এক ধরণের ডার্ক ট্যুরিজম হয়ে দাঁড়াচ্ছে।”
নানামुखী অবরোধ ও অর্থনৈতিক সঙ্কটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশটির সাধারণ মানুষের ওপর। গিটার বাজিয়ে গান গাওয়া সেই শিল্পীর মতো সাধারণ মানুষের পেটে টান পড়েছে। কিউবায় একটি মানবিক সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে।
লুসি ডেভিস জানান, সঙ্কটে থাকা মানুষদের খাবারের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নিয়েছে তার প্রতিষ্ঠান। তবে সঙ্কটের ভয়াবহতায় এই ছোট উদ্যোগ তেমন কাজে আসবে না।
লুসি ডেভিস বলেন, “আমি ক্রমাগত শুনছিলাম যে, মানুষ খাবার জোগাড় করতে হিমশিম খাচ্ছে। আমরা সবাইকে সাহায্য করতে পারব না। আমরা যা করছি তা সাগরে এক ফোটা শিশিরের মত। আমাদের চেষ্টা মাত্র এটুকুই।”
আরও পড়ুন: সারজিস আলম: গণহত্যাকারী হাসিনার অলীক ডিসেম্বর বাংলাদেশে আসবে না
অথচ অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে পর্যটন খাতকেই ভরসা মনে করেছিল কিউবান সরকার। নতুন নতুন হোটেল তৈরিতে বিপুল ব্যয়ও করা হয়েছিল। সেই দামী হোটেলগুলো এখন ফাঁকা পড়ে আছে। হোটেল অবকাঠামোয় বিনিয়োগ কিউবার অর্থনীতির পতনকে আরও ত্বরান্বিত করছে। কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল দিয়াজ-কানেল জুনে প্রথমবারের মতো বলেছিলেন, কিউবার নাগরিকরা, এমনকি প্রবাসী কিউবানরাও চাইলে সরকারের পক্ষে হোটেলগুলো পরিচালনার দায়িত্ব নিতে পারেন। তবে সে ডাকে কোনও সাড়া মেলেনি। একদিকে পর্যটক নেই, অন্যদিকে দামী হোটেল পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় বিপুল পুঁজি, সুপ্রতিষ্ঠিত সাপ্লাই-চেইন অথবা প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান কিউবার ভেতরে বা বাইরের বেসরকারি খাতের নেই।
তাহলে যে পর্যটন খাত ছিল কিউবার সম্ভাবনার প্রতীক, সেটাই এখন তাদের ধ্বংসপ্রায় অর্থনীতির চিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
সূত্র: সিএনএন
আরও পড়ুন: জিয়া সেদিন তাহেরের সাথে ক্যান্টনমেন্টের বাইরে গেলে ফিরে আসতেন না: ব্রি. সাখাওয়াত
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন