প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কার্যত ব্যাহত হওয়ার পর এবার ইরান লোহিত সাগরের প্রবেশপথ বাব আল-মান্দেব প্রণালিকেও কৌশলগত চাপের অংশ হিসেবে ব্যবহারের ইঙ্গিত দিয়েছে। তেহরান থেকে বার্তা দেওয়া হয়েছে যে, প্রয়োজন হলে ইয়েমেনের মিত্র হুতি গোষ্ঠীর মাধ্যমে এ গুরুত্বপূর্ণ জলপথেও জাহাজ চলাচল ব্যাহত করা হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, তবে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নতুন করে বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়ে যাবে। এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনাও অনেক বেশি তীব্র হতে পারে। পর্যবেক্ষকদের ভাষ্য, একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ভেতরে সামরিক অভিযানের মাত্রা বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে ইয়েমেনে হুতিদের বিরুদ্ধেও হামলার সংখ্যা বৃদ্ধি করেছে। এর পাল্টা জবাব হিসেবে সংঘাতের পরিধি বিস্তৃত করার কৌশল গ্রহণ করেছে তেহরান।
বিশ্লেষকরা বলেন, ইরান শুধু পার্সি উপসাগর নয়, বরং লোহিত সাগরকেও সংঘাতের আওতায় এনে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে চাপ সৃষ্টি করতে চায় ওয়াশিংটনের উপর। ইতোমধ্যে হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের প্রভাব দেখানোর পর, বাব আল-মান্দেবকে দ্বিতীয় চাপের কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। লোহিত সাগর একটি গুরুত্বপূর্ণ জলপথ, যা এডেন উপসাগরের সঙ্গে সংযুক্ত। এই মাধ্যমে সৌদি আরব বৃহৎ পরিমাণে তেল রপ্তানি করে এবং বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল করে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম প্রেস টিভির বরাতে জানা যায়, সোমবার ইয়েমেনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সতর্কবাণী দেন যে, যদি সৌদি আরব ইয়েমেনে হামলা অব্যাহত রাখে, তবে দেশটির সশস্ত্র বাহিনী বাব আল-মান্দেব প্রণালি বন্ধ করতে বাধ্য হবে। তার মতে, এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ২০০ ডলারে পৌঁছাতে পারে।
একই ধরনের সতর্কবার্তা দিয়েছেন হুতি আন্দোলন আনসারুল্লাহর রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য মোহাম্মদ আল-ফারাহ। তিনি অভিযোগ করেছেন যে, ইয়েমেনে সামরিক অভিযান চালাতে সৌদি আরবকে উৎসাহিত করছে যুক্তরাষ্ট্র। তিনি বলেন, পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে হরমুজ এবং বাব আল-মান্দেব—দুই প্রণালিতেই সমন্বিত সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। তারও দাবি, এতে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলারে পৌঁছাতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক গবেষক ফাওয়াজ গেরগেস রয়টার্সকে জানিয়েছেন, যদি প্রয়োজন হয় তবে ইরান সর্বোচ্চ পর্যায়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত। তার মতে, তেহরান যুক্তরাষ্ট্রকে বোঝাতে চায় যে, বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি সামুদ্রিক পথকেই একই সাথে ঝুঁকির মুখে ফেলতে তারা সক্ষম। এমন পরিস্থিতিতে সংঘাত শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক নৌপরিবহনও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।
বিশ্লেষকরা অভিমত প্রকাশ করেন যে, এখনই সবচেয়ে বড় আশঙ্কা পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ নয়; বরং এমন একটি পরিস্থিতির দিকে ইঙ্গিত করছে, যেখানে সরাসরি যুদ্ধ ছাড়া পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপের মাধ্যমে সংঘাত ক্রমাগত বিস্তৃত হতে থাকবে। যদি উপসাগর থেকে লোহিত সাগর পর্যন্ত উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে, তবে তা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা আরও বাড়াবে। বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি তেল পরিবহন পথ দীর্ঘ সময় ঝুঁকির মধ্যে থাকলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। এমন প্রেক্ষাপটে ওয়াশিংটন ও তেহরানের উপর আবারও আলোচনায় ফেরার আন্তর্জাতিক চাপ বাড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক মধ্যপ্রাচ্য শান্তি আলোচক ডেনিস রস বলেন, ওয়াশিংটনের মূল লক্ষ্য হল ইরানকে আবার আলোচনার টেবিলে ফেরানো। তার মতে, শুধু আলোচনা শুরু করাই নয়, বরং উভয় পক্ষের জন্য গ্রহণযোগ্য একটি সমঝোতায় পৌঁছানোও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
লন্ডনের কিংস কলেজের নিরাপত্তা গবেষণা বিভাগের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ জানান, বাব আল-মান্দেব নিয়ে হুতিদের সাম্প্রতিক হুমকি ইরানের একটি চূড়ান্ত কৌশলের অংশ হতে পারে। তিনি বলেন, যদি ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী মনে করে পূর্ণমাত্রার সংঘাত এড়ানো সম্ভব নয়, তবে তারা এ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে। একই সাথে তিনি সতর্ক করেন যে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলা বাড়ায়, তবে তেহরান হুতি মিত্রদের ব্যবহার করে বাব আল-মান্দেবে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করার চেষ্টা করতে পারে।
সৌদি আরবভিত্তিক গালফ রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান আবদুল আজিজ সাগের বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলো মনে করছে, ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক প্রচেষ্টার সুযোগ ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। কিন্তু তারা এটা বুঝছেও যে, পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ পুরো অঞ্চলের জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল হবে। তার ভাষ্য, ইরান জিতুক বা হারুক—উভয় পরিস্থিতিতেই মধ্যপ্রাচ্যকে বড় মূল্য দিতে হবে। তিনি আরও বলেন, বাব আল-মান্দেবে বড় ধরনের উত্তেজনা সৃষ্টির সক্ষমতা হুতিদের থাকলেও, তেহরানের সরাসরি নির্দেশনা ছাড়া তারা এমন পদক্ষেপ নেবে বলে মনে হয় না। যদি তারা আবার আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলে বড় হুমকি তৈরি করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্ররা আরও বড় সামরিক অভিযান চালাতে পারে।
এছাড়া, ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজা যুদ্ধ শুরুর পর হুতি গোষ্ঠী লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়ে দেখিয়েছে, তারা বাব আল-মান্দেব প্রণালির মাধ্যমে বৈশ্বিক বাণিজ্যে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে সক্ষম। ওই সময় হামলার কারণে বিশ্বের শীর্ষ জাহাজ পরিবহন কোম্পানিগুলোকে লোহিত সাগরের পরিবর্তে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে চলাচল করতে হয়, ফলে পরিবহন ব্যয় ও সময়—দুটিই বেড়ে যায়। পরে যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্য হুতিদের অবস্থানে বিমান হামলা চালায় এবং বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তায় বহুজাতিক নৌ অভিযান শুরু করে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন