প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
নেত্রকোণার কেন্দুয়ায় প্যাকেটজাত ভেজাল কীটনাশক ও নকল সার তৈরির কারখানায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চালিয়ে জরিমানা ও কারখানার তালা ভেঙে মালামাল ধ্বংসের ঘোষণার পরও থামেনি অসাধু চক্রের প্রতারণা। উল্টো অভিযোগ উঠেছে, অভিযানের সময় উদ্ধার করা বিপুল পরিমাণ ক্ষতিকর কাঁচামাল ও সরঞ্জামাদি আগুনে পুড়িয়ে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস না করে জনসমক্ষে লোক দেখানো নাটক করা হয়েছে। অভিযান শেষে পাশের একটি ঈদগাহ মাঠে এসব কাঁচামাল অবহেলা ও অরক্ষিত অবস্থায় স্তূপ করে রাখা হয়। পরবর্তীতে অসাধু ডিলার কৌশলে সেই মালামাল সেখান থেকে সরিয়ে নিয়ে পুনরায় অন্য স্থানে গোপন কারখানা বানিয়ে বিষাক্ত ও নকল সার-কীটনাশক তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
গত বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) বিকেলে উপজেলার পাইকুরা ইউনিয়নের মিয়া হোসেন মার্কেট এলাকায় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে নেত্রকোণার কেন্দুয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. নাঈম-উল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে বিশেষ এই তদারকি অভিযান পরিচালিত হয়।
১. অনুমোদিত ডিলারশিপের আড়ালে নকল সারের সাম্রাজ্য:
ভ্রাম্যমাণ আদালত ও স্থানীয় অনুসন্ধানে জানা যায়, ডিলারশিপের সুবাদে সাজানো ব্যাবসায়িক আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে ভেজাল কৃষি উপকরণ তৈরি করে আসছিলেন উপজেলার পেচুন্দুরী গ্রামের আবুল হোসাইনের ছেলে মো. আকাইদ হোসাইন। তিনি জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে নেত্রকোণার একজন অনুমোদিত বালাইনাশক ডিলারশিপ বাগিয়ে নিয়েছিলেন। তবে এই বৈধ ডিলারশিপের আড়ালে তিনি পাইকুরা ইউনিয়নের মিয়া হোসেন মার্কেটের দুটি গুদাম ভাড়া নিয়ে গোপনে একটি অবৈধ ভেজাল কারখানা গড়ে তোলেন।
ওই গুদামে অত্যন্ত নিম্নমানের রাসায়নিক, সাধারণ মাটি ও কৃত্রিম রং মিশিয়ে নামীদামি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের কৃষি কোম্পানির নাম ও লোগো নকল করে সার ও কীটনাশক প্যাকেটজাত করতেন তিনি। পরবর্তীতে কম দামে এসব ভেজাল ও ভুয়া ওষুধ প্রান্তিক কৃষকদের হাতে তুলে দিয়ে বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছিলেন। এর ফলে স্থানীয় কৃষকেরা সস্তা ও নকল সার-কীটনাশক কিনে জমিতে প্রয়োগ করে চরম প্রতারিত হচ্ছিলেন এবং এক একরের পর এক একর জমির ফসল মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছিল।
২. ঝটিকা অভিযান ও আলামত জব্দ:
অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত হয়ে বৃহস্পতিবার বিকেলে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. নাঈম-উল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি আভিযানিক দল মিয়া হোসেন মার্কেটে ঝটিকা অভিযান চালায়। অভিযানকালে আকাইদ হোসাইনের মালিকানাধীন দুটি গোডাউনের তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করা হলে প্রস্তুতকৃত নকল কীটনাশকের সারি সারি প্যাকেট ও কেমিক্যাল দেখতে পাওয়া যায়। তল্লাশি চালিয়ে দুটি গুদাম থেকে প্রায় ২০০ বস্তা সার তৈরির কাঁচামাল, কীটনাশক মেশানোর ক্ষতিকর রাসায়নিক, বিভিন্ন স্বনামধন্য কোম্পানির নকল প্যাকেট, লেবেল এবং ১০ বস্তা প্রস্তুতকৃত বিষাক্ত ও নকল কীটনাশক উদ্ধার করা হয়।
ঘটনা সত্য প্রমাণিত হওয়ায় ও বালাইনাশক আইন, ২০১৮-এর ২৯(২) ধারায় অভিযুক্ত ব্যবসায়ী মো. আকাইদ হোসাইনকে নগদ ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। আকাইদ হোসাইন তাৎক্ষণিকভাবে জরিমানার টাকা পরিশোধ করেন। এ মামলায় প্রসিকিউটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ উজ্জ্বল সাহা।
৩. ধ্বংসের নামে ‘নাটক’, ঈদগাহ থেকে মালামাল গায়েব!
অভিযানের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও কৃষি কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল যে উদ্ধারকৃত সব ভেজাল পণ্য ও সরঞ্জামাদি আগুনে পুড়িয়ে ভস্মীভূত করা হয়েছে। তবে স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী ও সংক্ষুব্ধ কৃষকদের অভিযোগ, বাস্তবে অধিকাংশ কাঁচামাল ও বস্তা পোড়ানোই হয়নি!
অভিযান শেষ হওয়ার পর উদ্ধার করা বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক কাঁচামাল ও সরঞ্জাম ধ্বংসের নামে পাশের একটি ঈদগাহ মাঠে খোলা অবস্থায় স্তূপ করে রেখে প্রস্থান করে আভিযানিক দল। অভিযোগ উঠেছে, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনুপস্থিতির সুযোগে (কিংবা অভ্যন্তরীণ অদৃশ্য সমঝোতায়) অসাধু ব্যবসায়ী আকাইদ হোসাইন ওই রাতের আঁধারেই ঈদগাহ মাঠ থেকে যাবতীয় কাঁচামাল ও সরঞ্জাম নতুন একটি নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেন। বর্তমানে সেই একই কাঁচামাল ও মোড়ক ব্যবহার করে তিনি পুনরায় বিপুল উদ্যমে ভেজাল সার ও বালাইনাশক তৈরি ও বাজারজাত শুরু করেছেন।
৪. চরম ক্ষুব্ধ কৃষক ও স্থানীয়রা:
অভিযানের পরও রহস্যজনক কারণে অসাধু ব্যবসায়ী আকাইদের কর্মকাণ্ড সচল থাকায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক প্রবীণ কৃষক আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, "ডিলার আকাইদের ১ লাখ টাকা জরিমানা তো সাধারণ বিষয়, একদিন নকল ওষুধ বেচলেই তাঁর এই টাকা উঠে যাবে! কথা ছিল জব্দ মালামাল আগুনে পুড়িয়ে ছাই করা হবে, তা না করে পাশে ঈদগাহে ফেলে রাখা হলো কেন? রাতেই তো মালামাল সব গায়েব হয়ে গেছে। এই ভুয়া অভিযানে কৃষকের কী লাভ হলো? আমাদের তো জমি ও ফসলের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েই যাচ্ছে।"
৫. কর্মকর্তা ও প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া:
অভিযান পরিচালনা শেষে সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. নাঈম-উল ইসলাম চৌধুরী বলেন, "কৃষি ও কৃষক আমাদের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। কতিপয় অসাধু ব্যবসায়ী নিজেদের পকেট ভারী করতে ভেজাল কৃষি উপকরণ দিয়ে কৃষকদের সর্বশান্ত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। ভেজাল কাঁচামাল ও বাজারজাতকরণের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান জিরো টলারেন্স (শূন্য সহনশীলতা)। কৃষক রক্ষায় এ ধরনের অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।"
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ উজ্জ্বল সাহা জানান, "নকল সারের প্রভাবে জমির উর্বরতা মারাত্মকভাবে নষ্ট হয়। কৃষকদের প্রতি অনুরোধ, যেকোনো সার বা বালাইনাশক ক্রয়ের সময় সঠিক পাকা রসিদ সংগ্রহ করুন এবং কোথাও কোনো ভেজাল কারখানার তথ্য থাকলে সরাসরি উপজেলা কৃষি অফিসকে অবহিত করুন।"
তবে ঈদগাহ মাঠ থেকে জব্দকৃত কাঁচামাল গায়েব এবং পুনরায় কারখানা চালুর সুনির্দিষ্ট অভিযোগ প্রসঙ্গে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে উক্ত ডিলারের বিরুদ্ধে এবার সরাসরি নিয়মিত ফৌজদারি মামলা দায়েরসহ কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন