প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
সম্প্রতি ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার প্রতিক্রিয়ায় রাশিয়া ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার তীব্রতা বৃদ্ধি করেছে। মস্কোর এসব উচ্চ প্রযুক্তির ক্ষেপণাস্ত্র সামাল দিতে ভীষণভাবে ব্যর্থ কিয়েভের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
এতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জেলেনেস্কির প্রশাসন। এর ফলে প্রাণহানি ও অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি বেড়েই চলেছে। চাঞ্চল্যকর একটি তথ্য প্রকাশ করেছে ইউক্রেনের প্রধান সামরিক গোয়েন্দা অধিদপ্তর (এইচইউআর)। তাদের দাবি, রাশিয়া তাদের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করে চলেছে। সামনের দিনগুলিতে ইউক্রেনের জন্য এটি সুসংবাদ বয়ে আনবে না।
কিয়েভ পোস্টের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, এইচইউআর-এর তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়া এপ্রিল, মে এবং জুনে মোট ৩০২টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। এ বিষয়ে আরবিসি-ইউক্রেনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে, ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনীর প্রধান গোয়েন্দা অধিদপ্তরের উপপ্রধান মেজর জেনারেল ভাদিম স্কিবিতস্কি জানিয়েছেন, রেকর্ড পরিমাণ ব্যালিস্টিক হামলা সত্ত্বেও রাশিয়া ইউক্রেনের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বন্ধ করবে না। কারণ মস্কো উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম খাতেই রয়েছে।
এছাড়া, তারা আরো কার্যকর অস্ত্রের পরীক্ষাও অব্যাহত রেখেছে। রাশিয়া নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে নিক্ষেপ করা ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা কমাতে পারে, তবে হামলা বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে জানান এই সামরিক গোয়েন্দা উপপ্রধান।
এর আগে কিয়েভ পোস্টের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছিল, জুলাই মাসে রাশিয়া ভয়াবহ ৩৭৭টি ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে, যার ফলে এই সতর্কতা সৃষ্টি হয়। এই সংখ্যা অন্তর্ভুক্ত ছিল ইস্কান্দার এম ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, এস৪০০ সিস্টেম থেকে নিক্ষেপ করা ক্ষেপণাস্ত্র এবং জিরকন হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র।
বর্তমানে, রাশিয়ার ছোড়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে মাত্র ৩৬টি প্রতিহত বা ধ্বংস করা সম্ভব হয়েছে, যেখানে প্রায় ২৯ শতাংশ সফল হয়েছে। প্রতিটি চারটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের বিপরীতে তিনটি ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিতে সক্ষম হয়েছে, যা রাশিয়ার হামলার তীব্রতার প্রতিফলন।
রাশিয়া চলতি মাসে ১৫৩টি খ-১০১, কালিব্র এবং খ-৩২ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রও নিক্ষেপ করেছে। পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে এইচইউআরের উপপ্রধান জানান, 'আপনাদের মনে আছে, আগে তারা প্রতি ১০ দিনে একবার হামলা চালাত। এরপর তা সপ্তাহে একবার হয়েছিল। এখন হামলার ঘটনা আরো ঘনঘন ঘটছে।'
গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়া তাদের বেশ কয়েকটি প্রধান ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। স্কিবিটস্কির তথ্যমতে, মস্কো বর্তমানে তাদের প্রধান ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনে নির্ধারিত মাসিক পরিকল্পনার চেয়ে ১১০% থেকে ১২০% বেশি উৎপাদন করছে। এমনকি চলতি বছরের ৩ আগস্টের মধ্যে জিরকন এবং আধুনিকায়িত ওনিক্স ক্ষেপণাস্ত্রের বার্ষিক উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা তারা পূরণ করেছে।
মস্কো এখন নির্দিষ্ট কিছু কার্যকর অস্ত্র উৎপাদনে অধিক মনোযোগ দিচ্ছে এবং সেদিকেই সম্পূর্ণ অর্থ খরচ করছে। কার্যকারিতা ও নির্ভরযোগ্যতার ওপর ভিত্তি করে, রাশিয়া তাদের সামরিক সম্পদের পুনর্বিন্যাস করছে। স্কিবিটস্কি জানান, গত এপ্রিল মাস থেকে কিনঝাল ও খ-৩২ ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদন স্থগিত রাখা হয়েছে। রাশিয়া মূলত খ-৩২ ক্ষেপণাস্ত্রের নির্ভুলতা বাড়ানোর চেষ্টা করছিল, কিন্তু পরীক্ষামূলকভাবে ইউক্রেনে ছোঁড়া ক্ষেপণাস্ত্র কাঙ্ক্ষিত ফলাফল দিতে পারেনি। রুশ বাহিনী সেই ক্ষেপণাস্ত্রগুলোকে উন্নয়নের জন্য ফেরত পাঠিয়েছিল এবং উৎপাদন পরিকল্পনা স্থগিত হয়েছে।
একইভাবে কিনঝাল ক্ষেপণাস্ত্রের নির্ভুলতায়ও মস্কো সংকটে পড়েছে। স্কিবিটস্কি আরও বলেন, 'একটি কার্যকর ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ার ব্যবধান ৫-৭ মিটারের বেশী হওয়া উচিত নয়, অথচ তাদের ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর ক্ষেত্রে এই ব্যবধান ৩০ মিটার বা তারও বেশী। ফলে কিনঝাল ও খ-৩২ প্রোগ্রামে বরাদ্দকৃত তহবিল অন্য ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদনে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।'
রাশিয়া তাদের ড্রোন উৎপাদনে ব্যাপক পরিবর্তন আনছে। চলতি আগস্ট মাসে, মস্কো প্রায় ১১ হাজার অ্যাটাক ইউএভি ড্রোন তৈরির পরিকল্পনা করছে। তাদের মূল ফোকাস টার্বোজেট ইঞ্জিনচালিত ‘গেরান-৪’ ও ‘গেরান-৫’ ড্রোনের দিকে। সাম্প্রতিক একটি রুশ হামলায় ব্যবহার হওয়া ড্রোনগুলোর প্রায় অর্ধেক টার্বোজেট চালিত ইউএভি ছিল।
স্কিবিটস্কি আরো বলেন, 'সাম্প্রতিক একটি হামলায় ৫০% ড্রোনই ছিল টার্বোজেট চালিত।' এই দ্রুতগতির ড্রোনগুলো প্রতিহত করার জন্য ভিন্ন ধরনের ইন্টারসেপ্টর বা স্বল্পপাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়ে পড়েছে, ফলে ইউক্রেনের বিমান প্রতিরক্ষা বাহিনীর জন্য পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠছে।
মহাকাশ প্রযুক্তিতে রাশিয়া নিজেদের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। ইলন মাস্কের স্টারলিংকের বিকল্প হিসেবে রাশিয়া 'রাসভিয়েত' নামে নিজস্ব স্যাটেলাইট যোগাযোগ নেটওয়ার্কের উন্নয়ন দ্রুততর করছে। গত মার্চ মাসে তারা পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে ১৬টি স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করেছে। ২০২৭ সালের মধ্যে ২৯২টি এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে ৯২৪টি স্যাটেলাইটের এক বিশাল নেটওয়ার্ক তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে এই ব্যবস্থা ইউক্রেনীয় ভূখণ্ডের উপরে মাঝে মাঝে কাজ করছে, তবে এটি সম্পূর্ণরূপে চালু হলে তা স্টারলিংকের মতো কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে ইউক্রেন সতর্ক করেছে।
ইউক্রেনীয় গোয়েন্দা সংস্থার মতে, রাশিয়ার সাম্প্রতিক হামলাগুলো মূলত ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা শিল্প, লজিস্টিকস, বন্দর, রেলপথ এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সহায়তাকারী জ্বালানি কেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্য করে চালানো হচ্ছে। এইচইউআরের তথ্য অনুযায়ী, মস্কো আগামী শরৎ ও শীতকালীন অভিযানের জন্য ক্ষেপণাস্ত্রের একটি বড় মজুদ গড়ে তুলছে। এর ফলে, রাশিয়া যদি একক কোনো হামলায় অস্ত্রের সংখ্যা কমিয়ে দেয়, তাহলেও ইউক্রেনকে দীর্ঘকাল ধরে ধারাবাহিক ও অবিরাম হামলার মুখোমুখি হতে হবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন