প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
রাজধানীর ডেমরা পুলিশ লাইন্সের বহুতল ভবন থেকে একটি ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। মরদেহটি সাইদুল ইসলাম (২১) নামে এক পুলিশ কনস্টেবলের। আত্মহত্যার আগে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে স্ত্রীর উদ্দেশ্যে একটি আবেগঘন দীর্ঘ পোস্ট দিয়েছিলেন। অন্যদিকে, সাইদুলের এভাবে আকস্মিক মৃত্যু সংবাদে তার গ্রামের বাড়ি ফেনীতে শোকের মাতম চলছে। একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে ভেঙে পড়েছেন তার মা, তার কান্না কিছুতেই থামছে না।
নিহত সাইদুল ইসলাম ফেনী সদর উপজেলার লেমুয়া ইউনিয়নের উত্তর চাঁদপুর গ্রামের মো. সাদেকের একমাত্র ছেলে ছিল। তিনি বাংলাদেশ পুলিশে কনস্টেবল হিসেবে প্রায় ৯ মাস আগে যোগদান করেছিলেন। কর্মসূত্রে তিনি ডেমরা পুলিশ লাইন্সের ২০ তলা ভবনের ৭ম তলায় অবস্থান করতেন।
সাইদুলের মৃত্যুর খবর যখন ফেনীর গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায়, তখন একটি হৃদয়বিদারক পরিস্থিতি তৈরি হয়। পরিবারের একমাত্র ছেলে হারিয়ে মাতম চলছে তার মায়ের। প্রতিবেশীরা তাকে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করলেও, তার কান্নায় পুরো এলাকা ভারী হয়ে ওঠে। কাঁদতে কাঁদতে সাইদুলের মা বলছিলেন, মাগরিবের নামাজের পরেও তার ছেলের সাথে কথা হয়েছিল। ভালোবাসা এবং পরিবারের অমতের বিরুদ্ধে গিয়েও করা বিয়েটিই যেন তার ছেলের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে, এমনটাই শোকাতুর মা বিলাপ করে জানাচ্ছেন।
সাইদুল ইসলামের চাচা মো. সোহাগ জানান, কিছুদিন আগে প্রেমের সম্পর্কের সূত্র ধরে ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার এক তরুণীর সাথে তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। কিন্তু বিয়ের পর থেকেই তাদের মধ্যে পারিবারিক কলহ শুরু হয়। এরই ধারাবাহিকতায়, গত সপ্তাহে তাদের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। মাত্র দেড় মাসের মাথায় এই বিচ্ছেদ সাইদুলের কাছে কোনোভাবেই সহ্য করার মতো ছিল না। বিচ্ছেদের পর সুস্থভাবে মন ঠিক রাখতে পারেননি তিনি এবং শেষ পর্যন্ত বিরহ সহ্য করতে না পেরে এই বেদনাদায়ক অবস্থায় পৌঁছান।
লেমুয়ার উত্তর চাঁদপুর গ্রামের বাসিন্দা এম. এমরান পাটোয়ারী জানান, পুলিশ লাইন্স থেকে ফোন করে মরদেহের খবর পরিবারকে জানানো হয়। ময়নাতদন্ত শেষে বিকালে ডেমরায় প্রথম নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে এবং মরদেহ রাতে বাড়িতে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। লাশ যখন বাড়িতে আসবে, তখন দ্বিতীয় জানাজার পর পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে। শুক্রবার বিকালে নিহতের বাবা মো. সাদেক ডেমরা থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করেছেন।
ফেনী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গাজী মুহাম্মদ ফৌজুল আজিম বলেন, ডেমরাতে সাইদুল ইসলাম নামের এক পুলিশ সদস্য আত্মহত্যা করেছে বলে শুনেছি। তার বাড়ি ফেনীতে। এ বিষয়ে তদন্ত চলছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে ডেমরা পুলিশ লাইন্সের নিজ কক্ষে গলায় ফাঁস দেন সাইদুল। পরে সহযোগীরা তাকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে, উন্নত চিকিৎসার জন্য দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। কিন্তু হাসপাতালে পৌঁছানোর পর, কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ পরিদর্শক মোহাম্মদ ফারুক জানান, মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট থানাকে জানানো হয়েছে।
আত্মহত্যার প্রায় ১৬ ঘণ্টা আগে সাইদুল নিজের ফেসবুক আইডিতে স্ত্রীর সঙ্গে কিছু পুরোনো ছবি এবং ভিডিও সংযুক্ত করে একটি দীর্ঘ পোস্ট দেন। সেখানে বৈবাহিক জীবনের মানসিক কষ্ট, হতাশা এবং স্ত্রীর প্রতি ক্ষোভের কথা তুলে ধরেন।
ফেসবুক পোস্টে সাইদুল লিখেছিলেন, 'তোমায় কেন্দ্র করে আমি যে জগৎ সাজিয়ে গুছিয়ে গড়ে তুলেছিলাম, হঠাৎ যেন সে জগৎটাকে দুদিনে চোখের সামনে ভেঙেচুরে চুরমার করে দিলে... সমুদ্রের মাঝখানে তরী ডোবা মানুষ, অনেকক্ষণ সাঁতার কাটার পর যেমন কূলের দেখা না পেয়ে শেষমেশ নিয়তিকে মেনে নেয়, সাদরে গ্রহণ করে মৃত্যুকে, তেমনি আমারও যেন কিছুই করার নেই।'
সম্পর্কের ইতি টানা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি আরও লেখেন, 'তোমারে ভালোবাসাটা অপরাধ? নাকি সব কিছু উপেক্ষা করে তোমাকে বিয়ে করাটা অপরাধ? তুমি না বলছিলা, মৃত্যু ছাড়া তুমি কখনোই আমাকে ছেড়ে যাবে না? এখন কই তুমি?' স্ত্রীর জন্য বারবার সুযোগ দেওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি লিখেন, 'মানুষকে এতটাও বিশ্বাস করতে হয় না যে বিশ্বাস করলে নিজেই আর বাঁচার সুযোগ থাকে না।'
পোস্টের শেষ অংশে তিনি নিজের বাবা-মায়ের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে লেখেন, 'দুঃখিত আম্মু-আব্বু, আপনাদের ছেলে আর নিতে পারতেছে না আম্মু, আর পারতেছি না। আর তিলে তিলে মরার শক্তি আমার নাই। মাপ করবেন আপনাদের অযোগ্য ছেলেকে।' একমাত্র সন্তান হারিয়ে সাইদুলের পরিবারে এখন শুধুই শূন্যতা। ঘটনার পেছনে আরও গভীর কারণ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি স্থানীয়দের।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন