প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক বিমান হামলার পর দেশটির কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপগুলো দখলের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ বিষয়ে সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে না দেওয়ায় এ জল্পনা আরও জোরালো হয়ে উঠেছে।
তবে সামরিক বিশ্লেষকদের অধিকাংশের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এমন সক্ষমতা থাকলেও বাস্তবে সেই ধরনের অভিযান অত্যন্ত ব্যয়বহুল, ঝুঁকিপূর্ণ এবং রাজনৈতিকভাবে কঠিন হবে।
সাম্প্রতিক কয়েক দিনে মার্কিন বাহিনী ইরানের কেশম, কিশ ও আবু মুসা দ্বীপে হামলা চালিয়েছে। পাশাপাশি দক্ষিণ উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী বন্দর আব্বাসেও একাধিক হামলার খবর পাওয়া গেছে। এরপর থেকেই প্রশ্ন উঠেছে, ওয়াশিংটন কি কেবল সামরিক চাপ সৃষ্টি করছে, নাকি ইরানের ভূখণ্ড দখলের পরিকল্পনাও রয়েছে?
গত মার্চে যুদ্ধ শুরুর কিছুদিন পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগ খার্গ দ্বীপে বিশেষ অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে কয়েকজন মার্কিন কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন। উল্লেখ্য, ইরানের মোট অপরিশোধিত তেল রফতানির প্রায় ৯০ শতাংশ এই দ্বীপের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। যদিও পরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর সেই আলোচনা অনেকটা স্তিমিত হয়ে যায়।
তবে সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পকে ইরানের দ্বীপ দখলের সম্ভাবনা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি সরাসরি 'না' বলেননি। বরং তিনি বলেন, এ বিষয়ে মন্তব্য করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। তার এই বক্তব্যকে ঘিরেই নতুন করে জল্পনা তৈরি হয়েছে।
সামরিক সক্ষমতা আছে, কিন্তু মূল্য অনেক বেশি। যুক্তরাজ্যের কিংস কলেজ লন্ডনের নিরাপত্তা বিশ্লেষক আন্দ্রেয়াস ক্রিগের মতে, সীমিত পরিসরে যুক্তরাষ্ট্র চাইলে ইরানের কোনও ছোট দ্বীপ সামরিকভাবে দখল করতে পারে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, কোনও দ্বীপ দখল করা এবং সেটি দীর্ঘ সময় ধরে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৫০ হাজার সেনা মোতায়েন রয়েছে। শক্তিশালী নৌবাহিনী, বিমান শক্তি এবং উভচর অভিযানের সক্ষমতা থাকায় এমন অভিযান চালানো তাদের পক্ষে সম্ভব।
বিশ্লেষকদের মতে, একাধিক দ্বীপ দখলের চেষ্টা করা হলে সেটি আর সীমিত অভিযান থাকবে না; বরং পূর্ণাঙ্গ উভচর যুদ্ধ অভিযানে রূপ নেবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের দ্বীপগুলো দখল করা হলেও হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়ার সক্ষমতা পুরোপুরি শেষ হবে না। কারণ, ইরান মূল ভূখণ্ড থেকেই ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে নৌপথে হামলা চালাতে পারে। এছাড়া দখল করা দ্বীপগুলোতে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের নিয়মিত রসদ, আকাশ প্রতিরক্ষা এবং নৌ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় ধরনের সামরিক ও আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালীতে ইরানের সামরিক হুমকি পুরোপুরি দূর করতে হলে শুধু দ্বীপ নয়, ইরানের দক্ষিণ উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকায় দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযান চালানো আবশ্যক। সেক্ষেত্রে তা একটি পূর্ণাঙ্গ স্থলযুদ্ধে রূপ নিতে পারে।
রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক সংকট মোকাবেলা করতে হলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ইরানের কোনও দ্বীপ দখল করা হলে তেহরান সেটিকে সরাসরি আগ্রাসন হিসেবে বিবেচনা করবে। এর ফলে হরমুজ প্রণালীতে মাইন পেতে রাখা, বাণিজ্যিক জাহাজ, উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটি এবং জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলা বাড়তে পারে।
একই সঙ্গে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর সঙ্গেও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক জটিল হয়ে উঠতে পারে। কারণ, এসব দেশ হরমুজ প্রণালী সচল রাখতে চাইলেও নিজেদের ভূখণ্ডকে সম্ভাব্য যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করতে আগ্রহী নয়।
মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের মতে, তাত্ত্বিকভাবে ইরানের কোনও দ্বীপ দখলের সামরিক সক্ষমতা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। কিন্তু বাস্তবে এমন পদক্ষেপের সামরিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং কূটনৈতিক ব্যয় এতটাই বেশি যে, সেটি কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। তাদের মতে, এমন কোনও অভিযান শুরু হলে তা শুধু কয়েকটি দ্বীপ দখলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং মধ্যপ্রাচ্যে আরও বড় ধরনের স্থলযুদ্ধের সূচনা ঘটাতে পারে এবং এর প্রভাব পড়বে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার ওপর।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন