প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
এক মাসের ব্যবধানেই আবারও উজানের পাহাড়ি ঢল ও আকস্মিক ভারী বৃষ্টিতে প্লাবিত হয়েছে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার নিম্নাঞ্চল। মাইনী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় মেরুং, কবাখালী ও বোয়ালখালী ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন আমন চাষিরা। পানিতে ডুবে গেছে সদ্য রোপণ করা ও বেড়ে ওঠা আমনের ক্ষেত।
শুক্রবার রাত সাড়ে ১২টা থেকে সাড়ে ৩টা পর্যন্ত মাত্র তিন ঘণ্টায় ১০৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন দীঘিনালা আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের বেলুন মেকার সুভূধি চাকমা। তাঁর দাবি, চলতি মৌসুমে এত অল্প সময়ে এর আগে এত বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়নি।
অস্বাভাবিক স্বল্পসময়ের এই ভারী বৃষ্টিতে পাহাড়ি ছড়া ও নদীর পানি দ্রুত বাড়তে শুরু করে। মাইনী নদীর পাশাপাশি বিভিন্ন পাহাড়ি ছড়ায় হঠাৎ পানির স্রোত বেড়ে গিয়ে অনেকটা ‘ফ্ল্যাশ ফ্লাড’ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। বোয়ালখালী ছড়ার পানি বেড়ে জামতলীসহ আশপাশের নিচু এলাকা প্লাবিত হয়েছে।
পানি উঠে গেছে বসতঘর ও স্থানীয় সড়কেও। দীঘিনালা-মেরুং সড়কের বিভিন্ন অংশে পানি প্রবাহিত হওয়ায় যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে পাহাড় ধসের কারণে খাগড়াছড়ি-দীঘিনালা সড়কেও যান চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে মাইনী ও সাজেকের সঙ্গে দীঘিনালার যোগাযোগ ব্যবস্থায়।
তবে যোগাযোগ সংকটের চেয়েও বড় দুশ্চিন্তা এখন কৃষকদের ঘিরে। গত বন্যার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই ফের পানির নিচে আমনের ক্ষেত। অনেক কৃষক ধারদেনা ও কষ্টের জমানো টাকা দিয়ে জমিতে আমন আবাদ করেছিলেন। কয়েক ঘণ্টার পানিতেই সেই স্বপ্ন এখন ভেসে যাওয়ার উপক্রম।
এক কৃষক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “গত বন্যায় যে ক্ষতি হয়েছিল, তা এখনো পুষিয়ে উঠতে পারিনি। এবার ভেবেছিলাম আমনের ধান দিয়ে সেই ক্ষতি কিছুটা কাটিয়ে উঠব। কিন্তু আবারও পানি এসে ক্ষেত ডুবিয়ে দিল। এখন সংসার চালানোই কঠিন হয়ে যাবে।”
চৌমুহনী এলাকার বাসিন্দা মিথুন দাস বলেন, “সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি ঘরের ভেতর পানি। দীঘিনালায় অনেক বন্যা দেখেছি, কিন্তু আগে আমাদের ঘরে পানি ঢোকেনি। মাত্র তিন-চার ঘণ্টার বৃষ্টিতে এবার ঘরে পানি উঠে গেছে। আশপাশের পাহাড়ি ছড়াগুলোতেও প্রচণ্ড স্রোত।”
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেক কৃষক আমন ধানের পাশাপাশি সবজি ও অন্যান্য ফসলের আবাদও করেছেন। হঠাৎ ঢলে এসব ফসলেরও ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একদিকে ক্ষেতের ফসল নষ্ট হওয়ার শঙ্কা, অন্যদিকে নতুন করে জমি প্রস্তুত ও চাষাবাদের খরচ জোগাড়ের চিন্তায় দিশেহারা তারা।
স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, পানি চলাচলের প্রাকৃতিক পথ দখল করে বসতি স্থাপন, অপরিকল্পিতভাবে ড্রেন ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং ছড়া-খালের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার কারণে সামান্য ভারী বৃষ্টিতেই দীঘিনালার নিম্নাঞ্চলে দ্রুত পানি জমে যাচ্ছে।
তাদের মতে, প্রতিবার বন্যার পর ত্রাণ বিতরণ করে সাময়িকভাবে মানুষের পাশে দাঁড়ানো হলেও দীর্ঘমেয়াদি পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হচ্ছে না। এতে কৃষকের ক্ষতি ক্রমেই বাড়ছে।
একাধিক কৃষক বলেন, বারবার বন্যায় ফসল নষ্ট হলে শুধু ত্রাণ দিয়ে কৃষকের ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব নয়। কৃষিজমি রক্ষায় স্থায়ী পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ও পাহাড়ি ছড়ার স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করা জরুরি।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত পানি নেমে গেলেও কৃষকের ক্ষতি সহজে কাটবে না। গত বন্যার ক্ষত শুকানোর আগেই নতুন করে ফসলহানি হওয়ায় অনেক কৃষক এবার ঋণের বোঝায় পড়ার শঙ্কা করছেন। তাই ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত হিসাব করে কৃষকদের জন্য দ্রুত কৃষি সহায়তা ও পুনর্বাসন কার্যক্রম নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন