প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ইরান তার সামরিক কৌশলে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত প্রদান করেছে। দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) এক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা জানিয়েছেন, যুদ্ধকে শুধু ইরানের ভূখণ্ডে প্রতিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চাইছে না। বরং প্রয়োজনে শত্রুর ভূখণ্ডেও যুদ্ধ নিতে চাওয়ার সক্ষমতা যেন তাদের মধ্যে থাকে।
সম্প্রতি, আইআরজিসির একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ রেজা নাঘদি বলেন, ইরানের নতুন সামরিক নীতির অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এমন সক্ষমতা তৈরি করা, যা দ্বারা প্রয়োজন হলে দেশের বাইরে শত্রুর বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক অভিযান চালানো সম্ভব হবে।
তিনি দাবি করেছেন, ইরান বর্তমানে যে গতিতে ড্রোন এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে, তা এখনকার গতির তুলনায় অগ্রগতি লাভ করছে। ফলে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত শুরু হলে দেশের হাতে পর্যাপ্ত অস্ত্রের মজুত ও উৎপাদন সক্ষমতা থাকবে।
নাঘদির বক্তৃতা অনুযায়ী, ইরানের সামরিক শিল্প এখন শুধুমাত্র তাৎক্ষণিক যুদ্ধের প্রয়োজন মেটানোর জন্য অস্ত্র তৈরি করছে না। বরং দীর্ঘ সময় ধরে চলতে পারে এমন সংঘাতের জন্যও প্রযুক্তি ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে। এর মাধ্যমে ইরান নিজেদের প্রতিরক্ষা শক্তিকে একদিকে শক্তিশালী এবং অন্যদিকে সম্ভাব্য শত্রুকে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করতে চাইছে।
ইরান দীর্ঘ দিন ধরে ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি অর্জনের একটি প্রমাণিত রেকর্ড রেখেছে। তাই বর্তমানে দেশের কাছে যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানতে সক্ষম একটি পূর্ণাঙ্গ কার্যকর আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (আইসিবিএম) থাকা অত্যাশ্চর্য বলা চলে না।
বর্তমানে ইরানের সবচেয়ে দীর্ঘপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হলো খোররামশাহর, যার পাল্লা ৪ হাজার কিলোমিটার। এখন দেশটির শীর্ষ নেতৃত্ব ১২ হাজার কিমি পাল্লার একটি ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির পরিকল্পনা করছে।
১২ হাজার কিমি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে আঘাত হানার বিষয়টি যুক্ত করে দেখা হচ্ছে। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ইরানের ভূখণ্ড থেকে বিশ্বের যেকোন জায়গায় আঘাত করায় সক্ষম।
ইরানের সামরিক নীতিতে ‘শত্রুর ভূখণ্ডে যুদ্ধ নিয়ে যাওয়ার’ বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। এতদিন ইরানের সামরিক বক্তব্যে মূলত দেশের ভূখণ্ডে আগে আক্রমণ প্রতিহত করা এবং সম্ভাব্য হামলার জবাব দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। নতুন বক্তব্যে, ইরান এখন আক্রমণাত্মক সক্ষমতার বিষয়টিও সামনে এনেছে।
নাঘদির মন্তব্য থেকে প্রতিভাত হচ্ছে যে, ইরান ভবিষ্যতের সংঘাতে শুধু ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা আটকানোর ওপর নির্ভর করতে চায় না। বরং প্রয়োজনে শত্রুর সামরিক স্থাপনা, অবকাঠামো বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা আঘাত হানা ও তা প্রতিহত করার সক্ষমতাকেও নিশ্চিত রাখতে চায় তেহরান।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, এ ধরনের বক্তব্য একই সঙ্গে সামরিক সক্ষমতার প্রদর্শন এবং সম্ভাব্য প্রতিপক্ষের জন্য কৌশলগত বার্তা। ইরান বোঝাতে চাইছে যে, যদি তার বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান হয়, তবে সংঘাত কেবল ইরানের ভূখণ্ডেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।
ইরানের সামরিক সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। নাঘদি দাবি করেছেন, এসব অস্ত্র উৎপাদনের গতি বর্তমানে ব্যবহৃত গতিকে ছাড়িয়ে গেছে।
এতে ইঙ্গিত করা হচ্ছে যে, সংঘাত চলাকালীন ইরান নতুন অস্ত্র তৈরি করে মজুত পুনরায় পূরণ করতে সক্ষম হবে। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে এই ধরনের উৎপাদন সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষ করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ইরানের প্রতিরক্ষা কৌশলের একটি মূল উপাদান। একই সঙ্গে তুলনামূলকভাবে কম খরচে তৈরি করা যায় এমন ড্রোনকে দীর্ঘপাল্লার হামলা এবং নজরদারির ক্ষেত্রে কার্যকর অস্ত্র হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
নাঘদির বক্তব্যে যে বিষয়গুলো উঠে এসেছে, তা হলো শুধু অস্ত্রের সংখ্যা নয়, যুদ্ধ চলাকালে দ্রুত অস্ত্র উৎপাদন ও সরবরাহ অব্যাহত রাখা।
আইআরজিসির এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা আবারও বেড়েছে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘকাল ধরে বিরোধ চলছে।
সাম্প্রতিক সংঘাত ও পাল্টাপাল্টি সামরিক পদক্ষেপের পর তেহরান তার প্রতিরোধ সক্ষমতার ওপর একাধিকবার কঠোর বার্তা দিয়েছে। এবার আইআরজিসির পক্ষ থেকে যুদ্ধকে শত্রুর ভূখণ্ডে নিয়ে যাওয়ার সক্ষমতার কথা বলা হয়েছে।
ইরানের দৃষ্টিতে, সম্ভাব্য মার্কিন বা মিত্র বাহিনীর হামলা প্রতিহত করার পাশাপাশি পাল্টা আক্রমণ করার সক্ষমতা থাকলে প্রতিপক্ষের জন্য সামরিক অভিযান চালানোর ঝুঁকি অনেক বেড়ে যাবে।
নাঘদি আরও বলেছেন, প্রয়োজন হলে ইরান দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত চালিয়ে যেতে পারবে। তার বক্তব্যে স্পষ্ট যে, তেহরান স্বল্পমেয়াদি সংঘাতের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের সম্ভাবনাকেও বিবেচনায় রাখছে।
এ ধরনের প্রস্তুতির মধ্যে অস্ত্র উৎপাদন বাড়ানো, সামরিক অবকাঠামো শক্তিশালী করা এবং ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ধরে রাখার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত। তবে ইরানের এই দাবিগুলোর বাস্তব সক্ষমতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
তবে আইআরজিসির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বক্তব্য থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট, ইরান ভবিষ্যতে সম্ভাব্য সংঘাতে কেবল প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে থাকতে চাইছে না। বরং প্রয়োজনে আক্রমণাত্মক পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতাকে সামরিক কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
ফলে, ইরানের নতুন সামরিক মতবাদ সম্পর্কিত এই বক্তব্য যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনার মধ্যে নতুনভাবে তাৎপর্য তৈরি করেছে। বিশেষভাবে যদি ইরান সত্যিই যুদ্ধকে শত্রুর ভূখণ্ডে নিয়ে যাওয়ার মতো সক্ষমতা তৈরি করতে চায়, তাহলে ভবিষ্যতে যদি কোনো সরাসরি সংঘাত ঘটে, তার পরিধি মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন