প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
সোহেল রানা। তিনি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক।
কখনো নিজের বিয়ে, কখনো ঈদুল আজহা, মায়ের চিকিৎসা আবার কখনো নিজের চিকিৎসার জন্য দফায় দফায় মেয়রের ঐচ্ছিক তহবিল থেকে (বর্তমানে প্রশাসকের ঐচ্ছিক তহবিল) নিয়েছেন আর্থিক সাহায্য। এর পরিমাণ মোট ৪ লাখ ৫ হাজার টাকা। শুরুতে নামের সঙ্গে পদবি উল্লেখ করে টাকা নিলেও শেষ দিকে তাকে ঐচ্ছিক তহবিলের টাকা নেওয়ার ক্ষেত্রে চাকরির তথ্য গোপন করতে হয়েছে। সোহেল রানার এই অর্থপ্রাপ্তির পেছনে প্রধান কারিগর হিসেবে রয়েছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রাক্তন প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ।
শুধু সোহেল রানাই নন, এমনভাবে করপোরেশনের আরো বহু কর্মীকে ঐচ্ছিক তহবিল থেকে ইচ্ছামতো অর্থ বরাদ্দ দেন এজাজ।
নামে-বেনামে এ খাতের অর্থ বরাদ্দ দিয়ে এজাজ হাতের মুঠোয় রেখেছিলেন ডিএনসিসির ওইসব কর্মীকে। নিজের স্বার্থ ও স্বার্থান্বেষী বলয় তৈরির উদ্দেশ্যে এজাজ করপোরেশনে বসিয়েছিলেন নিজের লোক। নানা অনিয়ম ও দুর্নীতিতে সহায়তাকারী এসব ব্যক্তিরা মেয়রের ঐচ্ছিক তহবিলের অর্থ বিভিন্ন সময়ে পেতেন উপহার হিসেবে।
ডিএনসিসির বহু কর্মকর্তার বরাত দিয়ে এরকম খবর প্রকাশ করেছে আগামীর সময়।
আগামীর সময়ের প্রতিবেদনে উল্লিখিত হয় যে, প্রশাসক হিসেবে ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেন মোহাম্মদ এজাজ। এক বছরেরও কম সময়ের পরে, পরের বছরের ৯ ফেব্রুয়ারিতে উত্তর সিটির প্রশাসক পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় তাকে। গুঞ্জন রয়েছে, তার এ দায়িত্ব পাওয়ার পেছনে মূল ভূমিকা ছিল তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের। এজাজের দায়িত্ব গ্রহণের সময় মেয়রের ঐচ্ছিক তহবিলে মোট অর্থ ছিল ৮ কোটি ৪৪ লাখ ৬৭ হাজার টাকা।
তিনি প্রশাসকের চেয়ারে বসার আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম সাড়ে ৮ মাসে ঐচ্ছিক তহবিল থেকে যেটুকু অর্থ খরচ হয়েছিল, তার পরিমাণ ছিল ৫৫ লাখ ৩৩ হাজার। কিন্তু এজাজ দায়িত্ব নেওয়ার পর বাকি সাড়ে ৩ মাসে ঐ তহবিল থেকে অস্বাভাবিকভাবে বড় অঙ্কের টাকা খরচ করা হয়েছে। যার পরিমাণে ছিল ২ কোটি ১১ লাখ ৪০ হাজার।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে ডিএনসিসির নগরপিতার দায়িত্ব পালন করেছেন তিনজন। এর মধ্যে জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারির শুরু পর্যন্ত ছিলেন যথাক্রমে মেয়র আতিকুল ইসলাম এবং প্রশাসক মাহমুদুল হাসান। তাদের দুজনের সময় সাড়ে ৮ মাসে ঐচ্ছিক তহবিলের গড় মাসিক খরচ ছিল ৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
অন্যদিকে, প্রশাসক এজাজের সময় মাসিক খরচ হয়েছে ৬০ লাখ ৪০ হাজার টাকার বেশি। অর্থাৎ আগের তুলনায় প্রতি মাসে তিনি প্রায় ১০ গুণ বেশি টাকা খরচ করেছেন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তিনি প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন ৮ মাস ১২ দিন। এই সময়ের মধ্যে ঐচ্ছিক তহবিল থেকে ৭ কোটি ২২ লাখ টাকা খরচ করেছেন এজাজ, যা পূর্ববর্তী যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।
ঐচ্ছিক তহবিল থেকে অর্থ বরাদ্দের চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ডিএনসিসির ৭১ জন চালককে ঐচ্ছিক তহবিলের অর্থ সহায়তা প্রদান করেছেন এজাজ। এর মধ্যে প্রশাসকের দপ্তরের গাড়িচালক মো. আবদুল হালিমকে মেয়ের চিকিৎসা বাবদ ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছিল। ২১ চালককে ২০ হাজার টাকা করে, এবং বাকি ৪৯ জনকে ৩০ হাজার টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। মেয়রের দপ্তরের ৩২ জনকে ২৫ হাজার করে, এবং বিভিন্ন বিভাগের ৮৪ কর্মচারীকে ১৫ থেকে ২৫ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে ঐচ্ছিক তহবিল থেকে। অথচ তারা সবাই নিয়মিতভাবে ডিএনসিসি থেকে বেতন ও বোনাস পান। বাদ যায়নি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মচারীরাও। ঈদ সালামির নামে ঐচ্ছিক তহবিল ফাঁকা করেছেন মোহাম্মদ এজাজ।
২০২৫ সালের ৬ মার্চের একটি নথিতে দেখা যায়, আব্দুস সামাদ নামে একজনকে ক্যানসারের চিকিৎসার জন্য ঐচ্ছিক তহবিল থেকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১০ হাজার টাকা। সামাদের পক্ষে ওই টাকা নিয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে ‘ছেলে’। কিন্তু ছেলের নাম বা পরিচয়সহ কিছুই উল্লেখ নেই। পরে আবারও সেই আব্দুস সামাদের নামে কিডনি রোগের চিকিৎসার জন্য অর্থ সহায়তা নেওয়া হয় ১০ হাজার টাকা। এবার লেখা হয়েছে যে, মো. আব্দুস সামাদ পক্ষে ‘মামা’। এর পাশাপাশি, জুলাইয়ের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী মো. রিফাত হাওলাদার নামে একজনকে ২০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছিল। যেখানে প্রদত্ত দুটি মোবাইল ফোন নম্বরের একটি খুঁজে পাওয়া যায়নি এবং অন্যটি ১২ সংখ্যার ভুল ডিজিট। সেখানেও টাকা তোলা হয়েছে বেনামে।
নিউ মুসলিম ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মাওলানা খান মোহাম্মদ আবুবকর সিদ্দিককে ১ লাখ টাকা দিয়েছেন এজাজ। জুলাই মাসে মৃত্যুজনিত কারণে মৌলভিরটেকের আব্দুস সাত্তারকে ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এই বিষয়ক নথিতে প্রদত্ত ফোন নম্বরটিতে কল করলে কাউকেই পাওয়া যায়নি। একই ধরনের বেনামে বহু ব্যক্তিকে অর্থ সহায়তা দিয়েছেন এজাজ। অথচ মেয়রের ঐচ্ছিক তহবিল থেকে আপৎকালীন অর্থ ব্য্যয়ের কথা রয়েছে। কিন্তু প্রশাসকের পদে থাকতে এই তহবিলের অর্থ দিয়ে বিভিন্নজনকে সাহায্য করা হয়েছে। নিয়ম হচ্ছে, মেয়রের ঐচ্ছিক তহবিল থেকে কাউকে সাহায্য দেওয়া হলে তার পূর্ণাঙ্গ তথ্য নথিভুক্ত করতে হবে। এজাজ নিয়মের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছেন মনে হচ্ছে।
শুধুমাত্র ঐচ্ছিক তহবিলের অর্থ নয়ছয় নয়, বনানী কাঁচাবাজারের পাশে অবৈধভাবে ৩৩টি দোকান বরাদ্দ দিয়েছেন তিনি। প্রতি দোকান থেকে নিয়েছেন ৫ থেকে ৭ লাখ করে টাকা। এই বিষয়ে অভিযোগ করেছেন স্বয়ং ওই দোকান মালিকরাও। যদিও এজাজের দাবি হল, দোকানগুলি থেকে ভাড়ার টাকা সিটি করপোরেশন নিয়েছে, দোকান বরাদ্দের কাজ আগেই হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এসব দোকানের বরাদ্দ মেয়র আতিকুল ইসলামের সময়েই বাতিল করে অবৈধ ঘোষণার কাজ হয়েছিল।
অনিয়মের এখানেই শেষ নয়। প্রশাসকের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার আগে ৪৭টি টেন্ডার দিয়ে যান এজাজ। ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এসব টেন্ডার দেওয়া হয়েছিল।
তড়িঘড়ি এসব টেন্ডার দেওয়ার সপক্ষে নিজেদের আত্মপক্ষ সমর্থনে গাইলেন এজাজ। তিনি মন্তব্য করেন, ‘উন্নয়নের জন্য টেন্ডার দিয়েছি। এর আগে এক বছরেও তো আমি শত শত টেন্ডার দিয়েছি।’
ডিএনসিসির বর্তমান প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান দায়িত্ব নেওয়ার পর সমস্ত খাতে মিলিয়ে করপোরেশনের তহবিলে মাত্র ২৫ কোটি টাকা পেয়েছেন। অথচ দায়িত্ব ছাড়ার আগে এজাজের দাবি, তিনি ডিএনসিসির তহবিলে ১২০০ কোটি টাকা রেখে এসেছেন।
ঐচ্ছিক তহবিলের টাকা ইচ্ছামতো খরচ প্রসঙ্গে এজাজ বলেন, ‘অডিট ছাড়া কোনো টাকা খরচের সুযোগ নেই। আবেদনের ভিত্তিতে যাচাই-বাছাই করে টাকা দেওয়া হয়েছে।’ নাগরিক সেবার জন্য বরাদ্দ শূন্য টাকা খরচ, তাড়াহুড়ো করে শত শত দরপত্র আহ্বান, বা দোকান বরাদ্দে অনিয়মের মতো বহুবিধ বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়েছে ডিএনসিসির সাবেক প্রশাসক এজাজ। যদিও তিনি এ পদে ছিলেন এক বছরেরও কম সময়। এর মধ্যে মোহাম্মদ এজাজকে অনেকেই এখন বলেন, ‘নগরখেকো নগরপিতা’ হিসেবে। ডিএনসিসিতে কিভাবে এজাজের উত্থান হয়েছিল তা খুঁজে বের করার চেষ্টা হচ্ছে।
অতিরিক্ত তথ্য অনুসন্ধানের পর জানা যায়, এজাজ ছিলেন রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টার নামে একটি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান। আওয়ামী লীগের সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে অন্তর্বর্তী সরকার। আর সেই সরকারের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের ছত্রছায়ায় প্রসারিত হয় এজাজের বলয়। তার পছন্দের ভিত্তিতে এজাজকে ডিএনসিসির প্রশাসক পদে বসানো হয়। তার দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই এজাজের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং দুর্নীতির অভিযোগ উঠতে শুরু করে। বিশেষ করে, মিরপুর-গাবতলী গবাদি পশুর হাটের ইজারায় বড় ধরনের আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ বেড়ে যায়। তার বিরুদ্ধে আনা হয় আরো অভিযোগ, ই-রিকশা প্রকল্পে ক্ষমতার অপব্যবহার, ফুটপাতে অস্থায়ী দোকান বরাদ্দ করে অর্থ লেনদেন করা, খিলগাঁওয়ের তালতলা সুপার মার্কেটের পার্কিংয়ের জায়গায় নিয়মবহির্ভূতভাবে দোকান নির্মাণ এবং বরাদ্দসহ। গত বছরের ২৭ নভেম্বর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এজাজকে নিয়ে আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান শুরু করে। চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি আদালত এজাজের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেয়। এর সপ্তাহখানেক পর ৯ ফেব্রুয়ারি তাকে উত্তর সিটির প্রশাসক পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
নাগরিকের সেবার জন্য বরাদ্দের টাকা নগরপিতার হাত দিয়ে এভাবে তছরুপের এই বিষয় নিয়ে কথা হয় নগর-পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খানের সঙ্গে। তিনি মন্তব্য করেন, ‘পদে থাকা অবস্থায় মোহাম্মদ এজাজের বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। এটা বিরল। ফলে নিশ্চয়ই ওনার সঙ্গে দুর্নীতির কোনো যোগ আছে—এই সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।’
ঐচ্ছিক তহবিলের অর্থ ইচ্ছামতো খরচ করার বিষয়ে এই নগর-পরিকল্পনাবিদ বলছিলেন, ‘কখনোই এ তহবিলের পুরো অর্থ ব্যয় হওয়ার কথা নয়। যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নিই যে তিনি এই অর্থ দুঃস্থ মানুষদের দিয়েছেন, তাহলেও তাদের পূর্ণাঙ্গ তথ্য, বিশেষ করে জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি রাখতে হবে। যদি তা না করা হয়, তাহলে এখানে দুর্নীতির একটা গন্ধ থেকেই যায়।’
আদিল মোহাম্মদ খান মনে করেন, মোহাম্মদ এজাজের বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান শেষ করা উচিত দ্রুত। যাতে তদন্তকাজকে কেউ প্রভাবিত করতে না পারে। পাশাপাশি দুদকের এই তদন্ত যেন নির্মোহভাবে এগোবে, সেই দাবি রাখেন তিনি।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন