প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
উত্তর আফ্রিকার দেশ লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলিতে অপহরণের শিকার ১৩ বাংলাদেশি অভিবাসীকে উদ্ধার করেছে দেশটির অবৈধ অভিবাসনবিরোধী সংস্থা অ্যান্টি-ইলিগ্যাল মাইগ্রেশন এজেন্সির (Anti-Illegal Migration Agency) ইস্ট ত্রিপোলি শাখা। ঘটনার সাথে এক সিরীয় নাগরিককে গ্রেফতার করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে যে, তিনি একটি সংঘবদ্ধ আন্তর্জাতিক অপহরণচক্রের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশি অভিবাসীদের জিম্মি করে তাদের পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায়ের কাজে জড়িত ছিলেন। অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আদালতের নির্দেশে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিচারপূর্ব হেফাজতে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার (০৬ আগস্ট) লিবিয়ার সংবাদমাধ্যম লিবিয়া অবজারভার এবং অ্যান্টি-ইলিগ্যাল মাইগ্রেশন এজেন্সির ইস্ট ত্রিপোলি শাখার আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়।
সংস্থাটি জানায়, আগের কিছুদিনের মধ্যে তাদের তদন্ত ও গ্রেপ্তার ইউনিটের কাছে নিশ্চিত তথ্য আসে যে, লিবিয়াতে সদ্য পৌঁছানো বিদেশি অভিবাসীদের টার্গেট করে একটি সুসংগঠিত অপরাধী চক্র অপহরণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। পরে জিম্মিদের পরিবারের সদস্যদের সাথে যোগাযোগ করে ভয়ভীতি দেখিয়ে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ আদায়ের চেষ্টা করা হচ্ছে।
তথ্য পাওয়ার পরই তদন্ত কর্মকর্তারা বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে অনুসন্ধান শুরু করেন। গোয়েন্দা নজরদারি, তথ্য সংগ্রহ, এবং বিভিন্ন সূত্র যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে অপহৃত বাংলাদেশিদের গোপন আস্তানার অবস্থান শনাক্ত করা হয়। একই সঙ্গে অপহরণ কাণ্ডের সাথে জড়িত প্রধান সন্দেহভাজনের পরিচয়ও নিশ্চিত করা হয়। পাবলিক প্রসিকিউশনের অনুমতি নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা নির্দিষ্ট স্থানে অভিযান চালিয়ে অবরুদ্ধ অবস্থায় থাকা ১৩ বাংলাদেশি নাগরিককে নিরাপদে উদ্ধার করেন। অভিযানের সময় ঘটনাস্থল থেকেই এক সিরীয় নাগরিককে গ্রেফতার করা হয়েছে।
সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অভিযুক্ত ব্যক্তি অপহরণ, অবৈধভাবে আটকে রাখা এবং মুক্তিপণের উদ্দেশ্যে জিম্মি করার অভিযোগ স্বীকার করেছেন। তার জবানবন্দি আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে তাকে পাবলিক প্রসিকিউশনের কাছে হস্তান্তর করা হলে আদালত তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে কারাগারে রাখার নির্দেশ দেন। একই সাথে অপহরণচক্রের অন্য সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
তবে উদ্ধার হওয়া ১৩ বাংলাদেশির পরিচয়, তারা কোন জেলার বাসিন্দা, কীভাবে লিবিয়ায় পৌঁছেছিলেন কিংবা কতদিন ধরে তারা অপহরণকারীদের হাতে জিম্মি ছিলেন এই বিষয়গুলো সম্পর্কে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি লিবিয়ার কর্তৃপক্ষ। অভিযানের তারিখ সম্বন্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি।
বাংলাদেশি অভিবাসীদের জন্য লিবিয়া দীর্ঘদিন ধরে একটি ঝুঁকিপূর্ণ গন্তব্য হিসেবে পরিচিত। উন্নত জীবনের আশায় অথবা মানবপাচারকারীদের প্রলোভনে অনেক বাংলাদেশি বৈধ ও অবৈধ উভয় পথেই দেশটিতে প্রবেশ করেন। এরপর তাদের একটি বড় অংশ মানবপাচারকারী ও সশস্ত্র চক্রের হাতে অপহরণ, নির্যাতন, জিম্মি এবং অর্থ আদায়ের শিকার হন। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের কাছে মোবাইল ফোনে নির্যাতনের ভিডিও পাঠিয়ে মুক্তিপণের জন্য চাপ সৃষ্টি করা হয়। অর্থ না পেলে শারীরিক নির্যাতন, দীর্ঘদিন আটকে রাখা কিংবা আরও ভয়াবহ পরিণতি ঘটার ঘটনা অতীতে অনেকবার হয়েছে।
বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (IOM)-এর তথ্য অনুযায়ী, লিবিয়া বর্তমানে ইউরোপগামী অনিয়মিত অভিবাসনের অন্যতম প্রধান ট্রানজিট রুট। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে মানবপাচারকারী চক্র বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের বিপজ্জনক সমুদ্রপথে ইউরোপ পাঠানোর প্রলোভন দেয়। বাস্তবে অনেকেই লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর অপহরণের শিকার হয়ে জোরপূর্বক শ্রম, নির্যাতন ও মুক্তিপণ আদায়ের শিকার হন।
সর্বশেষ গত মে মাসে লিবিয়ার বেনগাজি থেকে ১৭০ বাংলাদেশিকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। প্রত্যাবাসনের পর অনেকেই জানিয়েছেন, ইউরোপে নিয়ে যাওয়ার আশ্বাস দিয়ে দালালচক্র তাদের লিবিয়ায় নিয়ে যায়। সেখানে পৌঁছানোর পর তাদের আটক রেখে নির্যাতন চালানো হয় এবং তাদের পরিবার থেকে বিপুল অর্থ আদায় করা হয়। অর্থ পরিশোধ করার পরও অনেককে দীর্ঘ সময় বন্দি অবস্থায় থাকতে হয়েছে বলেও অভিযোগ জানান তারা।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, লিবিয়ার রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, দুর্বল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং মানবপাচারকারী নেটওয়ার্কের বিস্তৃত কার্যক্রমের কারণে দেশটিতে বিদেশি অভিবাসীরা এখনও বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। এ কারণে বাংলাদেশ সরকার বারবার বৈধ প্রক্রিয়া ছাড়া লিবিয়াসহ ঝুঁকিপূর্ণ রুটে বিদেশে যেতে নিষেধ করেছে। এই সাথে মানবপাচারকারী ও দালালচক্রের প্রলোভনে পা না দিতে সতর্কও করছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন