প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ওয়াশিংটনের হোয়াইট হাউসের প্রবেশপথে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাক্ষাৎ হলো।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্ভাব্য কূটনৈতিক সমঝোতা নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে বিশ্লেষক সামি আল-আরিয়ান মনে করেন, এমন কোনো সমঝোতা বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্য স্বস্তিদায়ক নাও হতে পারে।
তিনি বলেন, নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা দৃষ্টিভঙ্গি এলোমেলো হলেও, তিনি ইরানকে আঞ্চলিকভাবে দুর্বল না করে কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান কার্যকর মনে করবেন না।
আরিয়ানের মতে নেতানিয়াহু বিশ্বাস করেন যে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটগুলোর পেছনে মূল ভূমিকা রয়েছে ইরান ও তার মিত্র গোষ্ঠীগুলোর। পাশাপাশি গাজায় হামাস, লেবাননে হিজবুল্লাহ কিংবা অন্যান্য ইরানঘনিষ্ঠ শক্তিকে দুর্বল না করে এ অঞ্চলে স্থায়ী স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। বিশ্লেষকের ভাষ্য, নেতানিয়াহু এমন একটি আঞ্চলিক পরিস্থিতি দেখতে চান যেখানে ইসরাইলকে প্রধান প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে এবং যুক্তরাষ্ট্র তার কৌশলগত নিরাপত্তা সহযোগী হিসেবে পাশে থাকবে।
মিডল ইস্ট আইয়ের নিবন্ধে বলা হয়েছে, গাজা, পশ্চিম তীর, লেবানন, সিরিয়া, ইরাক, ইয়েমেন ও ইরানকে ঘিরে যে সংঘাত চলছে, সেগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখা সম্ভব নয়। বরং এগুলো বৃহত্তর আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার ও ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার অংশ। লেখকের মতে, দীর্ঘ সামরিক অভিযানের পরেও ইসরাইল তার প্রত্যাশিত রাজনৈতিক লক্ষ্য পুরোপুরি অর্জন করতে পারেনি। তবে নেতানিয়াহু এটিকে ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন না বরং আরও কঠোর কৌশল গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা হিসেবে মনস্থ করেছেন।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিস্থিতিও আগের তুলনায় অনেক পরিবর্তিত হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন, যেখানে দীর্ঘমেয়াদি বিদেশি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার বিরোধিতা দেশের ভেতর ক্রমশ বাড়ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সামরিক সম্পৃক্ততার বিষয়ে জনসমর্থন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—উভয় দলের ভোটাররা বিদেশে ব্যয়বহুল সামরিক অভিযান নিয়ে আগ্রহ হারিয়েছেন।
বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলছেন—কেন মার্কিন জনগণকে অন্য দেশের নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থ রক্ষার জন্য অর্থনৈতিক ও সামরিক মূল্য দিতে হবে। তাদের মতে, বিদেশি সংঘাতের কারণে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পায়, অর্থনৈতিক চাপ বাড়ে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে।
এ ছাড়া সামনে থাকা মধ্যবর্তী নির্বাচনও ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র যদি নতুন কোনো বড় সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে এবং এর নেতিবাচক প্রভাব অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পড়ে, তাহলে কংগ্রেসে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে যেতে পারে। এতে ট্রাম্পের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিস্থিতি অত্যন্ত সংবেদনশীল, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্বের বড় অংশের তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস এই নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হবে বলে, সেখানে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
লেখক আরও উল্লেখ করেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরান ও তার মিত্র গোষ্ঠীগুলোর বিভিন্ন হামলার কারণে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এই পরিস্থিতি অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘকালীন সামরিক উপস্থিতি ও নিরাপত্তা কাঠামোর কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করছে। একই সঙ্গে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জামের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় মার্কিন সামরিক সক্ষমতার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।
সামি আল-আরিয়ানের মতে, এসব বাস্তবতা ওয়াশিংটনকে বোঝার সুযোগ দিচ্ছে যে, শুধু সামরিক শক্তির মাধ্যমে সব রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব নয়। অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য কূটনৈতিক পথই বেশি কার্যকর হতে পারে।
নিবন্ধে আরও বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল ইরানকে এমন অবস্থায় নিয়ে যাওয়া, যাতে দেশটি তার পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করতে বাধ্য হয় এবং আঞ্চলিক প্রভাব কমিয়ে আনে। কিন্তু লেখকের মতে, সেই লক্ষ্য পুরোপুরি অর্জিত হয়নি। একইভাবে ইরানও যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিকভাবে পরাজিত করতে পারেনি বা অঞ্চল থেকে তাদের প্রভাব সম্পূর্ণ সরিয়ে দিতে সক্ষম হয়নি। ফলে উভয় পক্ষ এমন এক বাস্তবতায় পৌঁছেছে, যেখানে কেউই পূর্ণ বিজয় নিশ্চিত করছে না।
এই প্রেক্ষাপটে ইরানের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকা এবং নিজস্ব নीतিগত স্বাধীনতা বজায় রাখা। লেখকের মতে, যদি কোনো যুদ্ধবিরতি বা রাজনৈতিক সমঝোতা ইরানকে ধ্বংসের মুখে না ঠেলে সংঘাত থেকে বের হয়ে আসার সুযোগ দেয়, তাহলে সেটিকে তেহরানের জন্য কৌশলগত সাফল্য হিসেবেই দেখা হবে। আর এজন্যই এই ধরনের একটি সমঝোতা নেতানিয়াহুর জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, পাকিস্তানসহ কয়েকটি আঞ্চলিক দেশ ও কূটনৈতিক পক্ষের মাধ্যমে সম্ভাব্য একটি সমঝোতা কাঠামো নিয়ে আলোচনা চলছে। এতে অন্তত ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি, হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করা, ইরানের ওপর আরোপিত কিছু অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আংশিক শিথিল করা এবং ভবিষ্যৎ আলোচনার ভিত্তি তৈরির মতো বিষয় থাকতে পারে। তবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ভবিষ্যৎ আলোচনার জন্য রেখে দেওয়ার প্রস্তাবও আলোচনায় রয়েছে।
লেখকের মূল্যায়নে, এমন কোনো সমঝোতা কার্যকর হলে ইরান অর্থনৈতিকভাবে কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে। তবে তার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বা আঞ্চলিক মিত্রদের প্রভাব পুরোপুরি শেষ হবে না। ফলে এই ধরনের সমঝোতা ইসরাইলের বর্তমান নেতৃত্বের প্রত্যাশার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।
সবশেষে সামি আল-আরিয়ান মন্তব্য করেন, মধ্যপ্রাচ্য এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা রয়েছে, অন্যদিকে আরও বড় ও বিধ্বংসী আঞ্চলিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও বাড়ছে। তার মতে, সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদে কোনো রাষ্ট্র আঞ্চলিক আধিপত্য ধরে রাখতে পারে না। তাই সংঘাতের পরিবর্তে আলোচনার পথ বেছে নেওয়া হলে তা অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য ইতিবাচক হতে পারে। তবে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলে মধ্যপ্রাচ্য নতুন করে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তা সংকটে পড়ে যেতে পারে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন